প্রচ্ছদ / খোলা কলাম / বিস্তারিত

আবরারের হত্যাকারীদের দ্রুত সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই

   
প্রকাশিত: ৯:৪৪ অপরাহ্ণ, ১০ অক্টোবর ২০১৯

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্তরা। ছাত্রলীগ পৈশাচিক এ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের ১১ নেতা-কর্মীকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে ‘ছাত্রলীগপনার’ যে ঘটনা প্রায়ই ঘটছে তার সর্বশেষ উদাহরণ হলো বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা। এ ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রবিবার ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীরা আবরার ফাহাদকে তার রুম থেকে ধরে নিয়ে যায় এবং তাকে নৃশংস নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। ফাহাদের বাবা ব্র্যাকের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, এলাকায় তাদের পরিবার আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে পরিচিত। ফাহাদ কোনো রাজনৈতিক দল বা ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। ফেসবুকে তিনি যে পোস্ট দিয়েছিলেন তাতে কোনো দলীয় রাজনীতির আভাস মেলেনি।

দেশের একজন নাগরিক হিসেবে তিনি তার মতামত রেখেছিলেন ফেসবুক পোস্টে। কিন্তু অসহিষ্ণুতার প্রতিভূ হিসেবে আবির্ভূত একটি বিশেষ ছাত্র সংগঠনের ক্যাডারদের তা পছন্দ হয়নি। মেধাবী আবরার ফাহাদ বুয়েটের পাশাপাশি মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। মা চেয়েছিলেন তার সন্তান মেডিকেলে ভর্তি হোক। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার উদগ্র আগ্রহ পোষণ করতেন তিনি। আর এ আগ্রহই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল। লজ্জা ও পরিতাপের বিষয়, তার হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সবাই বুয়েটেরই শিক্ষার্থী। যে শিক্ষাঙ্গনে কেবল মেধাবীদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ মেলে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে- মেধাবীরা সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় কীভাবে। এই মানবিক বিকৃতি নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র আবরার ফাহাদের বাবা তার সন্তানের হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করেছেন।

সন্দেহ নেই এ দাবিতে দেশের অধিকাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে। আমরাও চাই খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও খুনোখুনির চর্চা বন্ধে খুনিচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন সম্পর্কে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। ছাত্রলীগ এ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার দায়ে তাদের ১১ সদস্যকে বহিষ্কার করেছে। তাদের এ সুমতি প্রশংসার দাবিদার। আমরা আশা করব, নিজেদের পচনদশা থেকে রক্ষায় ছাত্রলীগ বিতর্কিতদের ব্যাপারে সতর্ক হবে। সোনালি ঐতিহ্যের অধিকারী এই ছাত্র সংগঠন সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে- এটি কোনোভাবে প্রত্যাশিত নয়।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে যদি একজন শিক্ষার্থীকে এমন নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার মতো অপরাধ সংঘটিত হয়, তবে তার ভয়াবহতা কতটা- সেটা আমলে নেয়া অপরিহার্য। যেভাবে আবরারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটলো তা ভয়াবহতা অনুধাবন করে হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করার যেমন বিকল্প নেই, তেমনি এই বিষয়টিও আমলে নেয়া জরুরি যে- দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভেতর যখন এমন হত্যাকান্ড ঘটানোর মতো ভয়ানক অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা তৈরি হচ্ছে এবং পিটিয়ে মুহূর্তেই একটা জীবন শেষ করে দেয়া হচ্ছে, তখন তা এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিকে ইঙ্গিত করে- যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের বিচারসহ ৭ দফা দাবিতে ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ হয়েছে।

বুয়েটসহ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত ও অশান্ত হয়ে উঠেছে, যে কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। আবরার হত্যার প্রতিবাদসহ দোষী ও দায়ীদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে নেমেছে বুয়েট, ঢাবিসহ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, আবরার হত্যাকারীদের শাস্তি পেতেই হবে। এর বাইরেও ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে অশান্ত হয়ে উঠছে দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এমনিতেই দেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। চলতি বছর এশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পায়নি বুয়েটসহ বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের উচ্চশিক্ষার এই মানগত অবস্থান কোনভাবেই স্বস্তিদায়ক হতে পারে না। অস্থির রাজনীতির কালো ছায়া পড়েছে দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই। শিক্ষক রাজনীতিও নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ভিসিদের নীতি-নৈতিকতা-দুর্নীতিসহ মান নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে শিক্ষা-বিরুদ্ধ এমন কর্মকা- অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ গড়ে তোলাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। দেশের ভবিষ্যত যারা, সেই শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয় এমন কর্মসূচী সব সময় পরিত্যাজ্য হওয়া অত্যাবশ্যক। শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্ভূত সমস্যার শীঘ্রই সমাধান হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন। আমরা তার কথায় আশা ও আস্থা রাখতে চাই। এর পাশাপাশি আবরার হত্যার দ্রুত বিচারসহ অপরাধীদের যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করাও অত্যাবশ্যক। নিহত আবরারের পরিবারের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।

পরিশেষে আমি মনে করি, হত্যাকারীদের দ্রম্নত শাস্তি যেমন নিশ্চিত করতে, হবে তেমনি সংশ্লিষ্টদের একই সঙ্গে এটাও আমলে নিতে হবে যে, কেন একের পর এক এমন নৃশংস ঘটনা ঘটছেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা রোধ করা না গেলে তা মানুষের বসবাসের স্বাভাবিকতাকেই বিপর্যস্ত করবে- যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলন এবং প্রধান সম্পাদক দৈনিক আজকের অগ্রবাণী।

(খোলা কলামে প্রকাশিত সব লেখা একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সাথে পত্রিকার কোন সম্পর্ক নেই)

এএস/ডিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: