প্রচ্ছদ / মানবজমিন / বিস্তারিত

উত্তর কোরিয়ার রহস্যনারী!

   
প্রকাশিত: ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ, ২৯ এপ্রিল ২০২০

মোহাম্মদ আবুল হোসেন: উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনকে নিয়ে নানা রহস্য। জট খুলছে না কিছুতেই। কেউ মনে করছেন নেতা কিম জং উন মারা গেছেন। আবার কোনো কোনো মাধ্যম থেকে বলা হচ্ছে, তিনি জীবিত আছেন। সুস্থ আছেন। করোনা সংক্রমণের ভয়ে তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন নি। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। তিনি ওই অনুষ্ঠানে মানুষের ভিড়ে না হয় উপস্থিত হতে পারেন নি, একাকী অবস্থানে থেকে কি তিনি কোনো বার্তা দিতে পারতেন না তার দেশবাসীকে, বিশ^বাসীকে? উল্টো এসব নিয়ে যখন জল্পনা, গুজব চারদিকে, তখনও রাষ্ট্রীয় কোনো মাধ্যম থেকে তার অবস্থান সম্পর্কে জানানো হয় নি।

ফলে অনেকেই ধরে নেন যে, তিনি মারা গেছেন। এমনটা ধরে নিয়ে বিশ্লেষণ চলতে থাকে- তিনি মারা গেলে বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর এই দেশটির নেতৃত্বে কে আসবেন। এক্ষেত্রে বিশ্লেষকদের চোখ গিয়ে পড়ে প্রথমেই তার ছোট বোন কিম ইয়ো জংয়ের ওপর। তাকে বলা হয় উত্তর কোরিয়ার এক রহস্যনারী। আকস্মিক তিনি ক্ষমতাসীনদের মধ্যে মাথা ফুঁড়ে উঠে দাঁড়ান। এক সময় নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার ছবি প্রকাশ পায়। অনেকেই সন্দেহ করেন, তিনি কিম জং উনের বান্ধবী। কিন্তু পরে জানা যায় তিনি তার বোন। ১৯৮৭ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর জন্ম তার। বড় পরিচয় তিনি বর্তমান নেতা কিম জং উনের ছোটবোন। পলিটব্যুরোর একজন বিকল্প সদস্য এবং ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়ার (ডব্লিউপিকে) প্রোপাগান্ডা অ্যান্ড এজিটেশন ডিপার্টমেন্টের ভাইস ডিরেক্টর। তার পিতা কিম জং-ইল। মা কো ইয়ং-হুই। বড়ভাই কিম জং-উনের সঙ্গে তার রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন তারা। এ সময়ে এবং উত্তর কোরিয়ায় থাকার সময়ে তাদেরকে অনেকটা সামাজিক ও ইমোশন থেকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল। এর কারণ, তাদের পিতা কিম জং-ইল চেয়েছিলেন তার সন্তানরা তারই পিতা কিম ইল-সাংয়ের প্রভাব থেকে দূরে থেকে বড় হোক। সুইজারল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে কিম ইল-সাং মিলিটারি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন কিম ইয়ো জং। সেখানে তিনি পড়াশোনা করেছেন কিম ইউন-গাইওয়ংয়ের সঙ্গে। কিম ইউন গাইওয়ং হলেন জাপানি অপহৃত মেগুমি ইয়োকোতার মেয়ে।

ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত কিম ইয়ো জং। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি বিয়ে করেন চোই সোং’কে। তিনি সরকারি কর্মকর্তা চোই রিওং-হাই এর দ্বিতীয় ছেলে। ২০১৫ সালের মে মাসে সন্তান সম্ভাবা হয়ে পড়েন কিম ইয়ো-জং। তবে এই অনাগত সন্তানের পিতা কে তা তখন শনাক্ত করা সম্ভব হয় নি। তবে ধারনা করা হয় কিম ইল সাং ইউনিভার্সিটির একজন ফেলো অথবা ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়ার ‘রুম ৩৯’ এ কর্মরত একজন সরকারি কর্মকতা অথবা একটি সামরিক ইউনিটে কর্মরত একজন কর্মকর্তা হতে পারেন তার এই সন্তানের পিতা।

উত্তর কোরিয়ার রাজনীতিতে কিম ইয়ো-জং ছিলেনএকেবারেই অপরিচিত। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে ডব্লিউপিকে’র তৃতীয় কনফারেন্সে ফটো সেশনে একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে তার প্রথম ছবি আসে জনসমক্ষে। ওই ছবিতে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন তার পিতা কিম জং-ইলের ব্যক্তিগত সচিবের পাশে এবং কিম ওকে’র কথিত মিস্ট্রেসের পাশে। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে পিতা কিম জং-ইলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় কিম ইয়ো-জংয়ের ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। এ সময় তার ভাই কিম জং-উনের পাশাপাশি তাকে বেশ কয়েকবার দেখা গেছে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানের মূল নেতৃত্বের মাঝে তাকে দেখা গিয়েছিল, অথচ তিনি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কমিটি সদস্য ছিলেন না। তবে এ সময়ও তার নাম প্রকাশ করা হয়নি।

২০১২ সালের শুরুতে কিম জং-উনের একজন ট্যুর ম্যানেজার হিসেবে তাকে ন্যাশনাল ডিফেন্স কমিশনে একটি পদ দেয়া হয়। ২০১২ সালের নভেম্বর ছাড়া অন্য কখনো তাকে কোনো খবরে দেখা যায় নি। ওই সময় তাকে কোরিয়ান সেন্ট্রাল টেলিভিশনে দেখা যায় কিম জং-উনের সঙ্গে একটি মিলিটারি রাইডিং গ্রাউন্ডে। ২০১৪ সালের ৯ই মার্চ প্রথমবারের মতো তাকে অফিসিয়ালি পরিচয় করানো হয়। এ সময় তিনি ভাই কিম জং-উনের সঙ্গে সুপ্রিম পিপলস এসেম্বলিতে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। কিম ইয়ো-জংকে ডব্লিউপিকে সেন্ট্রাল কমিটির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়।

ভাই কিম জং-উন অসুস্থ হয়ে পড়েন ২০১৪ সালে। এ সময় তিনি চিকিৎসা নিতে যান। ফলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব তিনি নেন ওই বছরের অক্টোবরে। ২০১৪ সালের নভেম্বরে তাকে বানানো হয় ওয়ার্কার্স পার্টির প্রোপাগান্ডা অ্যান্ড এজিটেশন ডিপার্টমেন্টের ভাইস ডিরেক্টর। এই বিভাগে নামমাত্র ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন কিম কি-নাম। তার আড়ালে তিনিই সেখানে মূল দায়িত্ব পালন করছিলেন বলে ২০১৫ সালের জুলাইতে দেখা যায়। এ ছাড়া তিনি একজন ভাইস মিনিস্ট্রিয়াল পদে আসীন ছিলেন। তবে কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিনি এই পদ ধারণ করছিলেন তা জানা যায় নি। ভাই কিম জং-উন কোনো ট্রিপে গেলে তার গাইডেন্স হিসেবে সঙ্গে থাকতেন বোন কিম ইয়ো-জং। ভাইয়ের ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার নেপথ্যে তিনিই ছিলেন মূল শক্তি এমনটা বলা হয়। এমন ব্যক্তিত্ব ধারণ করতেন তাদের দাদা কিম ইল-সাং।

২০১৮ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি কিম ইয়ো জং যোগ দেন দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ংচ্যাংয়ে ২০১৮ শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। এটাই ছিল প্রথম যে, কিম রাজবংশের একজন সদস্য কোরিয়া যুদ্ধের পর দক্ষিণ কোরিয়া সফর করলেন। তিনি ১০ই ফেব্রুয়ারি সাক্ষাত করেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইনের সঙ্গে এবং বলা হয়, তিনি কিম জং উনের একজন বিশেষ দূরের মতো কাজ করছেন। কিম জং উনের একটি ব্যক্তিগত চিঠি তিনি তুলে দেন মুন জায়ে-ইনের কাছে। পরে ২০১৮ সালে উত্তর কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হয় সামিট। এছাড়া পরের বছর ২০১৯ সালে হ্যানয়ে হয় দ্বিতীয় সামিট। এতে কিম জং উনের টিমের সদস্য হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর থেকে কূটনৈতিক অঙ্গনে তার সম্পৃক্ততা বাড়তেই থাকে।

২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত উত্তর কোরিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে সুপ্রিম পিপলস এসেম্বলিতে নির্বাচিত হন কিম ইয়ো জং। তিনি নির্বিাচিত হন কিল্লিমগিল থেকে। ওই বছরের এপ্রিলে তাকে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দলের পলিটব্যুরো থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর এই বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের এপ্রিলে আবার ওই পদে বসানো হয়। আর এ মাসেই কিম জং উনের অসুস্থতা নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তাকেই উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখতে থাকেন বিশ্লেষকরা।

লেখা এবং তথ্য সুত্র: মানবজমিন অনলাইন

এআইআ/এইচি

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: