খায়রুল আলম রফিক

বিশেষ প্রতিনিধি

এসআই জলিলের পার্সেল, র’হস্যময় সব অ’বৈধ জিনিষ !

   
প্রকাশিত: ৮:১৭ পূর্বাহ্ণ, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পার্সেল ছিল দুটি। একটি ফাইল ক্যাবিনেট, অন্যটি ট্রাঙ্ক। দুই পার্সেলই সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ থেকে যাচ্ছিল গোপালগঞ্জ। বুকিং দিয়েছিলেন পুলিশের উপপরিদর্শক মো. আবদুল জলিল মাতব্বর। পার্সেলের কাস্টমার কপিতে লেখা ছিল-প্রেরক ও প্রাপকের নাম। উভয় ঠিকানায় জলিলের নাম ও একই মোবাইল নম্বর ০১৭১৩-৬২২২২৩। জলিল নারায়ণগঞ্জ জেলা গো’য়েন্দা সংস্থা ডিবি থেকে সম্প্রতি গোপালগঞ্জে বদলি হন। তবে গোপালঞ্জে পার্সেল হিসেবে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে যা যা জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছিলেন তার তালিকা দেখলে যে কারও চোখ কপালে ওঠার দশা হবে।

অ’স্ত্র, গু’লি, ই’য়াবা, গাঁ’জা, স্বর্ণালঙ্কারসহ অন্তত ৫০ ধরনের অ’বৈধ জিনিসপত্র নিজের নতুন কর্মস্থলে নিয়ে যাচ্ছিলেন জলিল। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য! নারায়ণগঞ্জ থেকে পার্সেলটি ঢাকা পর্যন্ত আসার পর সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের দারুস সালাম শাখায় জমা হয়। সেখানে পার্সেলটির ভেতর থেকে অ্যা’লকোহল বা ম’দের গ’ন্ধ বের হতে থাকে। তখন কুরিয়ার সার্ভিসের লোকজনের স’ন্দেহ হয়। তারা পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ দুটি পার্সেল খুলে যা পেলেন তা সবাইকে অবাক করবে। এদিকে খবর পেয়ে পার্সেলটির মালিক এসআই জলিল নিজেই দারুস সালামে ছুটে যান। পরে পুলিশ তাকে প্রথমে আটকে রাখে। পার্সেলে এত অবৈধ মালপত্র পাচারের ব্যাখা দিতে না পারায় শেষ পর্যন্ত জলিলের বিরুদ্ধে মা’মলা করে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার ওই মামলায় গ্রে’প্তার দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

কী ছিল ওই দুই পার্সেলে : দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, আবদুল জলিলের ওই পার্সেলে ছিল ৪ ড্রয়ারবিশিষ্ট স্টিলের ফাইল ক্যাবিনেট একটি। ক্যাবিনেটের দ্বিতীয় ড্রয়ারে মরচেপড়া কাঠের বাঁটযুক্ত একটি পি’স্তল। পি’স্তলটির ট্রিগার অকেজো ও ফায়ারিং পিন নেই। এছাড়া পাওয়া যায় একটি কালো রংয়ের খেলনা পি’স্তল। পি’স্তলের গুলি ১১টি। গু’লির পেছনে খোদাই করে বিভিন্ন ধরনের লেখা। রাইফেলের গু’লি ৮টি। যার ৪টি গু’লির পেছনে পিওএফ ৬ পয়েন্ট জিরো লেখা। অপর চারটিতে পিওএফ ৬ পয়েন্ট ফাইভ লেখা রয়েছে। রাইফেলের খোসা ১৩ পিস, শটগানের কার্তুজ ৪০টি, যার ১১টি সবুজ রংয়ের, ২টি খয়েরি, ৭টি কালো, ১১টি সাদা, ৭টি নীল, একটি লাল, একটি সিলভার কালারের। ২টি শট’গানের ফায়ার করা কা’র্তুজের খোসা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১০টি বি’য়ারের ক্যান।

একটি স্বর্ণের হারের ওজন ৩৬ দশমিক ৩০ গ্রাম। একটি স্বর্ণের গলার চিক; যার ওজন ১৩ দশমিক ৩৬ গ্রাম। একটি স্বর্ণের ব্রেসলেট, ২ জোড়া কানের ঝুমকা ও ২টি নাকফুল, ২টি স্বর্ণের চেইন, একটি রুপার নূপুর। এছাড়া সাদা পলিথিনে মোড়ানো ১১০ পুরিয়া গাঁজা; যার ওজন এক কেজি ৩০০ গ্রাম। সাদা কাগজে মোড়ানো ৩১০ পুরিয়া হেরোইন, সবুজ পলিথিনে মোড়ানো ১৩ পুরিয়া হেরোইন, সাদা পলিথিনে মোড়ানো আরও এক পুরিয়া হেরোইন; যার আনুমানিক দাম ৪০ হাজার টাকা। লালচে গোলাপি রংয়ের ২ হাজার ৯৮২ পিস ইয়াবা বড়ি। বিশেষভাবে মোড়ানো আরেকটি প্যাকেটে ২ হাজার ৩০৭ পিস ইয়াবা বড়িও পাওয়া যায়। পার্সেলে মোট ইয়াবা ছিল ৫ হাজার ২৮৯ পিস; যার আনুমানিক দাম ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ৭০০ টাকা। একটি চামড়ার তৈরি পিস্তলের কভার, ৮টি বাটন, তিনটি টাচসহ ১১টি পুরনো মোবাইল ফোন সেট। এছাড়া ২টি কাঁচি। তার মধ্যে একটি বাঁটযুক্ত। এছাড়া তার পার্সেলে রয়েছে মোজা, পুলিশের ইউনিফর্ম, দ-বিধির বই, একটি চামড়া, একটি কাপড় ও একটি স্টিলের তৈরি হ্যান্ডকাফ, চেক বই, ২টি চাকু। তার মধ্যে একটি চাকু গিয়ারওয়ালা স্টিলের।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আবদুল জলিল মাতব্বর জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে ছাড়পত্র নিয়ে তিনি এরই মধ্যে গোপালগঞ্জে যোগদান করেছেন। পার্সেলের অ’বৈধ, অ’স্ত্র, গু’লি ও মাদকদ্রব্য রাখার ব্যাপারে একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিচ্ছেন তিনি। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অ’বৈধ অ’স্ত্র ও গু’লি পাচারের মধ্য দিয়ে তিনি আ’র্মস অ্যাক্ট-১৯৭৮ ধারার অ’পরাধ করেন। অ’বৈধ মা’দক পরিবহন করে আবদুল জলিল মা’দকদ্রব্য নি’য়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর বিভিন্ন ধারার অ’পরাধে অভিযুক্ত। ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, অ’বৈধ জিনিসপত্র কুরিয়ারের মাধ্যমে স্থানান্তর করার অপরাধে এসআই আবদুল জলিলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় তিনি এখন কারাগারে।

এ ব্যাপারে জানতে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, এত ধরনের অ’বৈধ পণ্য পা’র্সেলে থাকার ব্যাপারে অভিযুক্ত এসআই কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারছেন না। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। দারুস সালাম থানার ওসি তোফায়েল আহমেদ বলেন, যে কোনো পার্সেল কুরিয়ারে পাঠানোর সময় তা ঢাকায় আসে। এরপর সেখান থেকে তা মূল গন্তব্যে পাঠানো হয়। ওই পার্সেল দুটিও বুধবার দুপুরে রাজধানীর দারুস সালামে কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে আসে। এরপর তা থেকে অ্যা’লকোহলের গ’ন্ধ ছড়াতে থাকে। ভেতরে নি’ষিদ্ধ সামগ্রী থাকতে পারে বলে সন্দেহ হওয়ায় কুরিয়ার কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুলিশকে জানায়। দারুস সালাম থানা পুলিশ গিয়ে পার্সেলে নানা ধরনের অ’বৈধ জিনিসপত্র পায়। সেগুলো জব্দ করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। খবর পেয়ে এসআই জলিল থানায় হাজির হন এবং পার্সেলটি তার বলে দাবিও করেন। এ সময় তাকে আটক করে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়।

গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ সাইদুর রহমান খান বলেন, গ্রেপ্তারের দিন থেকে ওই এসআইকে সাসপেন্ড করা হবে। ঢাকা থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পরই সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কয়েক দিন আগে ওই এসআই গোপালগঞ্জে যোগদান করেছিলেন। কেউ অন্যায় করলে শা’স্তি পেতে হবে। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রেপ্তার ওই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা হয়েছে। এ ধরনের পুলিশ সদস্যদের কারণে বাহিনীর সুনাম নষ্ট হয়। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল ইসলাম বলেন, চলতি মাসের শুরুর দিকে ওই এসআই নারায়ণগঞ্জ থেকে বদলি হয়ে গোপালগঞ্জে যোগদান করেছেন। তাকে সেই জেলার সদর থানায় পোস্টিং করা হয়। যেহেতু অ’বৈধ জিনিসপত্র তার পার্সেলে পাওয়া গেছে অবশ্যই তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এআইআ/এইচি

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: