প্রচ্ছদ / সারাবিশ্ব / বিস্তারিত

করোনা ভাইরাস: তাবলিগ জামাতের ঘটনা নিয়ে ভারতে ইসলাম বিদ্বেষের বিস্তার

   
প্রকাশিত: ১০:৫৭ অপরাহ্ণ, ৩ এপ্রিল ২০২০

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে তাবলিগ জামাতের একটি সমাবেশে যোগ দেওয়া অন্তত তিনশ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ পাওয়ার পরে ওই ঘটনাটিকে ঘিরে সেদেশে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে বলে উদ্বেগ বাড়ছে। গণমাধ্যমের একটা অংশ এবং সামাজিক মাধ্যমে নানা মুসলিম বিদ্বেষী হ্যাশট্যাগ তৈরি হয়েছে, ছড়িয়ে পড়েছে নানা ভুয়া খবর। করোনাজিহাদ বা নিজামুদ্দিন ইডিয়টস নামে বিভিন্ন হ্যাশট্যাগও ছড়িয়ে পড়ছে। ভারতের মুসলমান নেতৃত্ব যদিও স্বীকার করছেন যে তাবলিগের ত্রুটি নিশ্চই হয়েছে, কিন্তু রাজধানীতে পুলিশ আর সরকারই বা কেন এই সময়ে ঐ সম্মেলন (মারকাজ) হতে দিল? দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলিগ জামাতের মারকাজে যোগ দিয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে যাওয়া কয়েকজনের শরীরে করোনা সংক্রমণ প্রমাণিত হওয়ার পরে ভারতের গণমাধ্যমে ওই ঘটনা খুবই গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

ওই ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সদস্য জাফরিয়াব জিলানি বলছিলেন, ‘ভুল দুই তরফেই হয়েছে। ওই সমাবেশে যারা গিয়েছিলেন, তাদের উচিত ছিল নিজের থেকেই পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া এবং চিকিৎসকদের আর সরকারের পরামর্শ নেওয়া। কিন্তু উল্টোদিকে, সরকারই বা ব্যবস্থা নেয় নি কেন! সমাবেশটা তো হয়েছে যখন দেশে কোনও লকডাউন ছিল না, সেই সময়ে। তারপরে যারা ফিরতে পারে নি, লকডাউনের ফলে তাদের জন্য তো সরকারের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল।’

‘এরকম একটা কঠিন সময়ে বিষয়টাকে যেভাবে উপস্থাপিত করা হচ্ছে, সেটা একেবারেই কাম্য নয়। মুসলমানদের প্রায় সবাই কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কথা মেনেই চলছে, উলেমারা নির্দেশ দিয়েছেন জমায়েত না করতে,’ বলছিলেন জাফরিয়াব জিলানি।

পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী এবং রাজ্যের মুসলমান সমাজের অতি পরিচিত নেতা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীও একই প্রশ্ন তুলছেন যে তাবলিগ জামাত যদি ভুল করে থাকে সমাবেশ করে, তাহলে সরকার কী করছিল?

‘মার্কাজে নিজামুদ্দিনের পাশেই থানা আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশ আছে দিল্লিতে। তারা কি সমাবেশে হাজির মানুষকে কোনওভাবে সচেনতন করেছিলেন? একবারও মাইকিং করেছিলেন এলাকায়? সেটা করলেই তো এরকম পর্যায়ে যেত না বিষয়টা! আবার মাওলানা সাদ সাহেবও কার সঙ্গে কী পরামর্শ করেছিলেন জানি না -ওদেরও একগুঁয়ে মনোভাব নেওয়াটা উচিত হয় নি। এ রকম একটা ঘটনার ফলে গোটা দেশের মুসলমান সমাজকে একটা পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছেন তারা,’ বলছিলেন মি. চৌধুরী।

পশ্চিমবঙ্গ থেকেও অনেকে গিয়েছিলেন ওই সমাবেশে। মি. চৌধুরী বলছিলেন, ‘কারা গিয়েছিলেন সেখানে, সেটা জানা গেছে। আমি বলব তারা নিজের থেকেই এগিয়ে এসে পরীক্ষা করিয়ে নিন। ডাক্তারি পরীক্ষা করানো ইসলাম বিরোধী কাজ তো নয়।’

হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো অবশ্য তাবলিগ জামাতের সমাবেশ নিয়ে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানোর তত্ত্ব খারিজ করে দিচ্ছে। উত্তর প্রদেশের একটি শহরে তাবলিগ জামাতে অংশ নেওয়া লোকদের খুঁজে বের করতে পুলিশের অভিযান।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের বাংলা পত্রিকা স্বস্তিকার সম্পাদক রন্তিদেব সেনগুপ্ত বিবিসিকে বলেন, “এটা মুসলমান বিদ্বেষ কখনই নয়। তবে যেটা হয়েছে, সেটা তো ভয়াবহ। তাবলিগ জামাত যে ঘটনা ঘটিয়েছে, এরকম একটা পরিস্থিতিতে বড় সমাবেশ করলেন তারা, সেখান থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেন। এরকম একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ কী করে করলেন তারা? ধর্মান্ধতা আর পশ্চাদপদতা যে মানুষকে কোথায় টেনে নিয়ে যায়, কীভাবে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলেন তারা, সেটাই প্রমাণ করল তাবলিগ জামাত।”

মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে হিন্দু আর মুসলমান পক্ষের মধ্যে বিতর্কের মধ্যেই ওই ঘটনার পর মুসলমানদের লক্ষ্য করে নানা ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে।

ভুয়া খবর যাচাই করে দেখে, এমন একটি ওয়েবসাইট অল্টনিউজের সম্পাদক প্রতীক সিনহা বলছিলেন, ‘নিজামুদ্দিনের ঘটনাটার পর থেকে এরকম অনেক ভিডিও আর পোস্ট ভাইরাল হয়েছে, যেগুলোর টার্গেট মুসলমানরা।’

‘আমরা একটা ভুয়া ভিডিও খুঁজে পেয়েছি, যেখানে একদল মুসলমানকে থালা-বাটি চাটতে দেখা যাচ্ছে। বলা হয়েছে এভাবেই মুসলমানরা করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা যাচাই করে দেখি যে ওটি আসলে বোহরা মুসলমানদের একটি রীতি – খাওয়ার পরে যাতে থালায় একটিও খাদ্যকণা অবশিষ্ট না থাকে, সেজন্য তারা চেটে পরিষ্কার করে দেন। দুদিন আগে আরেকটি ভিডিও আসে আমাদের কাছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একটি মসজিদের ভেতরে একদল মুসলমান কোনও একটা আওয়াজ বার করছেন। ভুয়ো পোস্টটিতে বলা হয় ওভাবেই হাঁচি দিয়ে নাকি মুসলমানরা করোনা ছড়াচ্ছে। অথচ এটি আসলে একটা সুফি আচার, যেখানে তারা শ্বাস-প্রশ্বাসের একটা অভ্যাস করেন – সেটাই তারা করছিলেন,’ বলছিলেন মি. সিনহা।

তার কথায়, ‘এইসব ভুয়া ভিডিওগুলো ছড়িয়ে দিয়ে ভারতে করোনা ছড়িয়ে পড়ার জন্য মুসলমানরাই দায়ী, এরকম একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে একটি মুসলমান অধ্যুষিত এলাকায় করোনা পরীক্ষা করতে গিয়ে স্থানীয়দের হাতে এক নারী চিকিৎসক ও এক স্বাস্থ্যকর্মীর ওপরে ইঁটবৃষ্টি ও তাদের তাড়া করে এলাকা ছাড়া করার ঘটনাটির যে ভিডিও সামনে এসেছে, সেটির সত্যতা বিবিসি যাচাই করে দেখেছে।বিবিসি বাংলা।

আবার হিন্দুদের বড়ো উৎসব রামনবমীর দিন বৃহস্পতিবার যে অনেক মানুষ লকডাউন উপেক্ষা করেই মন্দিরে মন্দিরে পুজো দিতে ভিড় জমিয়েছিলেন, সেই খবর আর ছবিও দিয়েছে পিটিআই সহ নানা সংবাদ এজেন্সি এবং গণমাধ্যম।

কেএ/ডিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: