প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

এম. সুরুজ্জামান

শেরপুর প্রতিনিধি

করোনাকালীন জীবন সংগ্রামে ঢাবি শিক্ষার্থীর সবজি চাষ

   
প্রকাশিত: ৮:২৬ অপরাহ্ণ, ৭ জুলাই ২০২০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী মো. রাসেল মিয়া। দেশের করোনা সংকটময় সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পর তার গ্রামের বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ঘেষা সমেশ্চুরা আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাইভেট পড়িয়ে কোন রকমে পড়াশোনার খরচ জোগানোর পাশপাশি গ্রামের বাড়িতে তার বেকার বাবা-মা ও ভাই-বোনসহ ৫ সদস্যের পরিবারকে সামন্য কিছু সহযোগিতা করে আসছিল রাসেল। কিন্তু করোন সংকট ও লক ডাউনে পড়ে জীবিকার তাগিদে পিঠ যখন একেবারে দেয়ালে ঠেকে যায় তখন ঠিক করলো কিছু একটা করার। নিজেদেরতো কোন জমি নেই। থাকেন সরকারী খাস জমিতে। তাই কথা মতো কাজ, পাহাড়ের পতিত খাস জমিতে নিজেই কোদাল হাতে জমি তৈরী করে শুরু করে সবজি চাষ।

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি গারো পাহাড়ের পাদদেশ শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদ শমেশ্চুরা গ্রামে ওই মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্ম। চার ভাই-বোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। শিক্ষা জীবনে নানান প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ডপস এর সহায়তায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে তাক লাগিয়ে দেয় সবাইকে। এক পর্যায়ে রাসেল মেধার স্বাক্ষর রেখে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হয়। এসময় তার পাশে থাকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ডপস’।

করোনার ছুটির প্রথম দিকে ক্যাম্পাস থেকে বাড়িতে এসে কয়েকদিন ঘোরাফেরা করার পর চলে আসে শেরপুর শহরে অবস্থিত ডপস অফিসে। শুরু করে কলেজ পড়ুয়া ডপস সদস্যদের ক্লাস নেওয়া। এভাবেই কাঁটে কয়েকটা দিন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতায় লকডাউন ঘোষণা করা হলে পুনরায় তাকে ফিরে যেতে হয় গ্রামের বাড়িতে। একদিকে ঘরে অসুস্থ বাবার ওষুধ কেনা ও পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকতে অর্থের চাহিদা, অন্যদিকে এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় উদ্বুদ্ধকরণের চিন্তা। এসব চিন্তায় বসে থাকতে ভালো লাগেনা তার। কি করা যায় পরিবারের জন্য, মানুষের জন্য এবং কিভাবে অবসর সময়কে কাজে লাগানো যায় সেটাই ভাবতে থাকে।

করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে স্বাভাবিক মেলামেশা সংকোচিত করে ফেলে রাসেল। সময়কে কাজে লাগানোর চিন্তা করতে করতে মাথায় এক বুদ্ধি আসে। সে মনস্থির করে, পাহাড়ের ঢালে খাস পরিত্যক্ত জমিতে সবজি চাষ করবে। এ বিষয়ে ফোনে কথা বলে ডপস প্রতিষ্ঠাতা সেনা সদস্য শাহীন মিয়ার সাথে। এসময় শাহিন মিয়ার সু-পরামশ্যে শুরু করে সবজি চাষ। যে ছেলেটি সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে নামাজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয় হলের রিডিংরুমে বই নিয়ে পড়াশুনা করতো, সেই ছেলেটি এখন সাত সকালে উঠে কোমরে গামছা বেধে কাঁধে কোদাল নিয়ে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে ছুটে চলে উঁচুনিচু পাহাড়ের ঢালে। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি চলে তার জমি প্রস্তুতকরণের কাজ। দিনকে দিন চলতে থাকে তার নিরলস পরিশ্রম। রোপন করে বরবটি, করলা, কাকরোল, কুমড়া আর ঝিঙার বীজ। বর্তমানে তার সবজি বাগান থেকে বরবটি, কাররোল ও করলা বিক্রি শুরু করেছে। কুমড়া ও জিঙ্গা ফলবে কয়েকদিনের মধ্যেই। প্রতিদিনি রাসেল ভোর বেলা এসে তার বাগানের পরিচর্যার পাশাপাশি পরিপক্ক সবজি তুলে পাশ্ববর্তী হলদিগ্রাম চৌরাস্তা পাইকারি বাজারে বিক্র করে থাকে। ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ হাজার টাকার সবজি বিক্রি হয়েছে। আশা করছে এ সিজনে তার বাগান থেকে আরো প্রায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতে পারবে। এ বাগান করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৭ হাজার টাকা। রাসেলের সবজি বাগানে তার মাও প্রচুর সময় দিয়ে থাকে। সংসারে আর কেউ উপার্জনক্ষম না থাকায় তার মা দির্ঘদিন থেকেই সংসারের ঘানি টেনে আসছিল নানা কাজকর্ম করে। তার বাবা এক সময় রিক্সা চালালেও বর্তমনে অসুস্থ হওয়ার কারণে ঘরে বেকার হয়ে বসে আছে। এছাড়া তার এক বোন ও ভাইয়ের পড়া ও খাওয়ার খরচ চলে তাদের এ আয় থেকেই। কৃষি প্রধান দেশে কৃষি কাজে নেমে প্রকৃতির সাথে মিশে অনেকটা ভুলেই গিয়েছে, সে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের একজন শিক্ষার্থী। মা-মাটির টানে সে এখন ব্যস্ত সবজি বাগানের কাজে। সম্প্রতি তার সবজি গাছে সবজি ধরেতে শুরু করেছে। এদিকে রাসেলে চোখে আর দশজন কৃষকের চোখের সোনালী স্বপ্নের মতো ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি ফুটে উঠছে। যে রাসেলের এখন থাকার কথা পড়ার টেবিলে বসে পরীক্ষার প্রস্তুতির ব্যস্ততা নিয়ে। সেই রাসেল পরিস্থিতির শিকার হয়ে লাল মাটিতে নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় সবজি ফলাতে ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে। এই রাসেলের সাফল্যের কথা শুনে তৎকালের শেরপুর জেলা প্রশাসক বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ভর্তির ব্যাপারে পাঁচ হাজার টাকার সহযোগিতা করেন। সেই সাথে তার ভূমিহীন বাবার করুণ অবস্থার কথা শুনে তার পরিবারকে সহযোগিতা এবং বাবার জন্য এক খন্ড জমি বন্দোবস্ত করার আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারিভাবে ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের বিভিন্ন রকমের সুযোগ সুবিধা থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত রাসেল ও তার পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাই হয়নি আজও। এখনও তারা সেই ছনের ছাপড়া ঘরে বসবাস করছে অন্যের জমিতে। সর্বশেষ রাসেল ঢাকাতে টিউশনি, উপবৃত্তির টাকা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ডপস এর সামান্য সহযোগিতায় চলছিল তার পড়ালেখা। কিন্তু করোনা ভাইরাস তার সে জীবনের পথকে আপাতত বদলে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীকে করোনা করে দিয়েছে কৃষক।

এ বিষয়ে রাসেল মিয়া জানান, আমার এ সবজি চাষের সবজি বিক্রিকরে আপাতত কোন রকমে চলার ব্যবস্থা হলেও ভবিষ্যতে একটি ঠিকানার খুবই প্রয়োজন। পাহাড়ে রয়েছে অনেক পতিত ও অনাবাদি খাস জমি। স্থানীয় প্রশাসন যদি এসব জমি থেকে এক টুকরো জমি বন্দোবস্ত করে আমার পরিবারের জন্য সামান্য একটু মাথা গোঁজার ঠাই করে দিতো তবে আমাদের কষ্ট অনেকটা কমে আসতো।

এসএ/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: