কুরআনের অন্যতম মহাকাব্যিক আয়াত

   
প্রকাশিত: ৯:৫৭ অপরাহ্ণ, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯

আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। হে আমার পালনকর্তা, আমাকে মাফ করুন এবং আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন যা আমার পরে আর কারো জন্য শোভনীয় হবে না। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা। (৩৮;৩৫) সবাইকে “আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু”। কুরআনের প্রতি আমার এই ভ্রমণের শুরু থেকে অন্যতম যে ব্যপার কুরআন আমার জন্য করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে সেটা হল এটা ক্রমাগতভাবে বাস্তবতা সম্পর্কে আমার চিন্তাকে নতুন আকৃতি দিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর এমন অনেক কথা, আমি জানি বলে মনে করতাম এমন বিষয়ে আমার চিন্তা বদলে দিয়েছে। কুরআনের অন্যতম চমকপ্রদ একটি আয়াতে গভীরভাবে চিন্তা করার ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘আফালা ইয়া তাদাব্বারুনাল কুরাআনা আম আলা কুলুবিন আকফালুহা।’ (৪৭;২৪) অর্থাৎ ‘তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’ এটি খুব প্রগাঢ় একটা উক্তি। আল্লাহ কেন বলবেন যে তাদের চিন্তা না করার কারণ হল ‘তাদের অন্তর তালাবদ্ধ আছে।’ এই আয়াতের অনেক মানে আছে। একটা আপনাদের সাথে ভাগ করতে চাই।

অনেক সময় কোন বিষয়ে আপনার পূর্ব ধারণা থাকে। আয়াতের কী অর্থ তা আপনি আগে থেকেই ঠিক করে নিয়েছেন। বা আপনি মনে মনে ধরে নেন যে কি অনুমোদন যোগ্য আর কি অনুমোদন যোগ্য নয়। অথবা কোন বিষয়ে কীভাবে চিন্তা করা যাবে বা যাবে না তাও আপনি আগেই ঠিক করে রেখেছেন । হয়তো এটা আপনার সংস্কৃতি থেকে, বা আপনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে বা আপনি কোন লেকচার শুনেছেন সেটা থেকে এসেছে। আর এটা কিভাবে আপনি চিন্তা করেন তার একটা অংশ হয়ে গেছে। কুরআন আপনাকে জোর করছে চিন্তা করার সময় আপনার চিন্তার সব তালা খুলে দিতে। চিন্তা করে আপনার উপসংহার কি হবে সে ব্যাপারে আল্লাহকে নির্দেশ দিতে দিন। সেটা অন্য কিছু দ্বারা নির্দেশিত হতে পারে না। আমি এমনটা হতে দেখেছি যে, আপনি আল্লাহর কিতাব পড়তে চাচ্ছেন, আপনি আয়াতের মানে শিখতে চাচ্ছেন। তখন সেই ব্যক্তিরা বলে যে, ‘থাম! থাম! থাম! আমরা শিখেছে ‘এটার’ মানে হল ‘এটা’ বা আমরা শিখেছি যে এটা হল ‘এক্স’ “।

আপনি বলেন, “কিন্তু আয়াত বলছে ‘ওয়াই’, আয়াত “এক্স” বলছে না”। কিন্তু সেটা কোন ব্যাপার নয়। আমরা ইতিমধ্যে শিখেছি যে আয়াতে বলা হয়েছে “এক্স”। আপনি আর এটা নিয়ে কোন প্রশ্ন করতে পারবেন না। একদা আমার অন্যতম পরামর্শদাতা শেখ আকরাম নাদভী আমাকে এব্যাপারেই বলছিলেন। যাইহোক এটা আমরা কুরআনের সাথে করি, হাদীসের সাথেও করি। মানুষ যখন হাদীসের সাথে এমন করার জন্য প্রস্তুত থাকে, তখন কুরআনের সাথে করা তো আরো সহজ। তিনি বলছিলেন যে, একবার তিনি বেশ কিছু উলামাদের সাথে কথা বলছিলেন। তাঁরা কিছু সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, এমন সময় শেখ আকরাম নাদভী বললেন, “এই হাদীসের ব্যাপারে আপনারা কি বলবেন?” পণ্ডিত ব্যক্তিরা বললেন, “না, না, না! আমরা জানি যে এমন একটা হাদীস আছে, কিন্তু ফতোয়া আগেরটাই থাকবে”। তখন শেখ উল্লেখ করলেন এমন এক পণ্ডিতের যাকে সেই উলামারা অনুসরণ করে। আর সেটা বলার সাথে সাথে সবাই বললো, ” হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ! এখন বুঝতে পেরেছি”। শেখ বললেন, “থামুন ! আমি একই বিষয়ে যখন হাদিসটা বললাম আপনারা সবাই আমার বিরোধিতা করলেন।

আমি যখন বললাম সেই পণ্ডিত ব্যক্তি কী বলেছেন, আপনারা সাথে সাথেই সম্মত হয়ে গেলেন! কারো কোন সমস্যা নাই এখন”! আমাদের পণ্ডিত ব্যক্তিদের আমরা সম্মান করি। জানেন কেন আমরা পণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্মান করি? কারণ তারা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন আল্লাহ কিতাব, নবীর সুন্নাত বোঝার। আপনাদের একটা বিষয়ে বলি। ক্যালকুলাসের অংকে ৪ পাতা হিসাব করার পরে উত্তর পাওয়া যায়, তাইনা? অন্যরা সবাই শুধু সেই উত্তর নিয়েই চিন্তা করে। ছাত্ররা কি নিয়ে চিন্তা করে? উত্তরে কিভাবে, কি পদ্ধতিতে যাবে সেটা নিয়ে। আমাদের পদ্ধতিটা বুঝতে হবে। মুসলিমরা উত্তরের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী। আমরা পদ্ধতিতে আগ্রহ হারিয়েছি। “আমাকে বিস্তারিত বলতে হবে না, শুধু উত্তরটা বলুন”। অনেক সময় এটা কি সম্ভব যে শিক্ষকও অল্প কিছু মিস করে গেলেন। বা তারা সব কিছু বিবেচনা করলেন না। তাই তারা উত্তর দিলেন, কিন্তু উত্তরটা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পেরে। এমন কি হতে পারে? অবশ্যই পারে। ছাত্র হিসাবে আমাদের কর্তব্য হল শুধু উত্তর নয়, পদ্ধতিও বোঝা। উম্মতের মধ্যে এটা এত গুরুতর ভাবে ঢুকে গেছে যে, আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন যে, “তাদের পদ্ধতিটা কি ছিল এই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার সময়”? তারা অপমানিত হয়ে যান। ” তুমি কে পদ্ধতি জিজ্ঞেস করার। তুমি কি কোন পণ্ডিত? তোমার কোন অধিকার আছে”? না, না, না। এই উম্মত সবসময়ই পরিষ্কার ছিল।

আমাদের উলামারা নিজেদের মধ্যে সমসময়ই স্বচ্ছ ছিলেন। কেউ কখনো বলেনি,”তুমি কে আমাকে এটা জিজ্ঞেস করার। তোমার কি যোগ্যতা আছে”? যখন এই স্বচ্ছতা হারিয়ে যেতে শুরু করে, তখন পণ্ডিতদের জন্য সম্মানও হারিয়ে যেতে শুরু করে। বস্তুত আমাদের বিদ্বান ব্যক্তিরা অনেক বেশি সম্মান বজায় রাখতে পেরেছিলেন তাদের স্বচ্ছতার কারণে। এ কারণে না যে তাদের মনে হয়েছিল তাদেরকে জাতির কাছে কোন উত্তর দিতে হবে না। বরঞ্চ এর বিপরীতটাই সত্যি ছিল। এখন মানুষ ভাবে আমরা যদি তাদের কথা মেনে চলি আর তাদের কোন প্রশ্ন না করি, তবেই তাদের সম্মান করা হল। আসলে পুরো ব্যাপারটাই এর বিপরীত। সামগ্রিকভাবে পুরো জাতি এমন ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান হারাতে থাকে। তাদের সম্বন্ধে মানুষ বলে, ” তাঁরা ভাবে তারাই সব জানে। তাঁরা আমাদের কাছে কিছু ব্যাখ্যা করতে চায় না। তারা ভাবে আমরা সবাই নির্বোধ”। তখন সমাজের বেশিরভাগ অংশ উলামাদের থেকে দূরে চলে যায়। যাই হোক, এই সব কিছু সূচনা হিসাবে বললাম।

আমি একটি দোয়া নিয়ে কথা বলতে চাই যেটা অনেক কিছু সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমার মনে হয় এটা আমাকে যেমন প্রভাবিত করেছে, তেমন অনেক মানুষকেই করে। অনেক জায়গায় যেয়ে আমার যুবকদের সাথে দেখা হয়েছে যারা বলে, “উস্তাদ! আমার কাছে খুব খারাপ লাগে”। “কেন”? “কারণ আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি। এটা তো দুনিয়া। আমি দুনিয়ার ব্যাপারে পড়াশুনা করছি। দোয়া করেন যেন বাবা মা আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ায়, যেন আমি দ্বীনের ব্যাপারে পড়াশুনা করতে পারি। কারণ আমি দুনিয়া চাই না, আমি দ্বীন চাই”। অন্য আরেকজন এসে বলে, ” উস্তাদ! আমি চাকুরী করি। আমার এত খারাপ লাগে”! “কেন তোমার খারাপ লাগে”? কারণ আমি একজন একাউনটেন্ট”। “ও! তাহলে তোমার খারাপ লাগা ঠিকই আছে”! যাই হোক! (মজা করে বললেন)। “কারণ আমি এই কোম্পানির জন্য ট্যাক্স ফাইল করি, বই করি বা এটা সেটা। আমি ৯ ঘন্টা এটা করে কাটাই, কিন্তু মাত্র ১ ঘন্টা কুরআন পাঠ করি। আমি খুব কম সময় মসজিদে কাটাই। দিনের বেশির ভাগ সময় কাজ করি। আমার ভীষণ খারাপ লাগে”। “তোমার কী ধারণা কৃষকরা কী করে? তারা তো তোমার চেয়েও বেশি ঘন্টা কাজ করে”। আল্লাহ আমাদের কাছে থেকে কি চান?

আল্লাহ কি চান আমরা আমাদের পেশা ছেড়ে দেই, আর সারাদিন কুরআন পাঠ করি? অনেক মানুষেরই এই মনোভাব আছে। আমি যদি সারাদিন দ্বীন নিয়ে পড়াশুনা করি, তাহলে আমি ভালো মানুষ হতে পারব। আর আমি যদি অন্য কাজ করি, তাহলে আমি ভালো মানুষ নই। আমি যদি জীবিকা নির্বাহ করার জন্য উপার্জন করি, যদি আমি ব্যবসা করি, যদি কলেজে যাই, তাহলে আমি ভালো মানুষ নই। সুবহানাল্লাহ! এটা মূল বিষয় থেকে যে কত দূরে! কুরআনে আল্লাহ যে দৃশ্য চিত্রায়িত করেছেন সেটা থেকে যে এটা কত দূরে! বলে শেষ করা যাবে না। কেন এই কিতাব আপনাকে কোন লাইব্রেরী, ইউনিভার্সিটি বা মসজিদের মধ্যে রাখতে চাইবে দিন রাত, যখন কিনা এটা বলে আকাশের দিকে তাকাতে? “কুল সিরু ফিল আরদি”। “ভূমিতে পরিভ্রমন কর”। আপনি যদি “ভূমিতে পরিভ্রমন কর” এই আয়াতের তাফসীর জানতে চান সেটা ইবনে কাসীর, কুরতুবি বা ইবনে আশুর রাহিমাহুল্লাহ থেকে হবে না। কোথায় “ভূমিতে পরিভ্রমন কর” এই আয়াতের তাফসীর পাওয়া যাবে? দুনিয়ায় ভ্রমন করেই তো!

কোথায় এই আয়াতের তাফসীর পাওয়া যাবে? “أَوَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ فَوْقَهُمْ صَافَّاتٍ وَيَقْبِضْنَ” “তারা কি তাদের উপর দিকে পাখিগুলোর প্রতি লক্ষ্য করে না যারা ডানা মেলে দেয় আবার গুটিয়ে নেয়?” ব্যাকরণগত আলোচনার মাধ্যমে আপনি এই আয়াতের তাফসীর বুঝতে পারবেন না। কীভাবে বুঝবেন? আপনি বাহিরে যান এবং পাখা মেলা পাখি দেখে বিস্মিত হন। আল্লাহ চান আপনি জীবন থেকে অভিজ্ঞতা নেন। এই কিতাবে সেটাই বলা হয়েছে। এই কিতাবের কাছে আসলে সেটা আপনাকে ঠেলে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়। বাহিরের দুনিয়া আবার আপনাকে ঠেলে এই কিতাব এর কাছে পাঠিয়ে দেয়। আপনি সৃষ্টির আয়াত আর দৈববাণীর আয়াতের মধ্যে ঘুরতে থাকেন। কুরআনের পদ্ধতি এটাই।

কুরআনের অন্যতম একটা মহাকাব্যিক আয়াত হল সুলায়মান (আঃ)- এর দোয়া। আপনারা জানেন নবীরা দোয়া করলে দোয়া করেন আখিরাতের জন্য, ক্ষমা পাওয়ার জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, তাই না? এই দোয়াটা শুনুন। “قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي”- সুলায়মান বললঃ প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন। “وَهَبْ لِي مُلْكًا”- আমাকে এমন এক রাজত্ব দান করুন আমাকে উপহার দিন… কোন এক প্রকারের রাজত্বের। “لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّن بَعْدِي”- যা আমার পরে আর কারো জন্য শোভনীয় হবে না। আমাকে এত রাজত্ব দিন যেটা আমার পরে আর কারো পক্ষে পাওয়া সম্ভব না হয়। “ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব”- আপনিই নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে উপহার দিতে থাকেন। সুলায়মান (আঃ) কি চাচ্ছেন? প্রথমত, ক্ষমা করুন আমাকে। দ্বিতীয়ত যেটা চেয়েছেন সেটা আমাকে বিস্মিত করেছে। কী চেয়েছেন তিনি?

তিনি রাজত্ব চেয়েছেন! সেটা আমাদের মানদণ্ডে দ্বীন না দুনিয়া? শুনতে তো দুনিয়াই মনে হচ্ছে, তাই নয় কি? শুধু দুনিয়াই নয়। এমন নয় যে আমাকেও দিন এবং অন্যদেরকেও দিন। তিনি কী বলেছেন? আমাকে এত বেশী দিন আর এমন কিছু দিন যা অন্য কারো জন্য শোভনীয় না হয়। আমাকে যা দিবেন তাতে আমাকে অদ্বিতীয় করুন। কোথায়? দুনিয়াতে। কিভাবে এটা মানানসই হতে পারে? শুনে মনে হচ্ছে তিনি শুধু দুনিয়ার জন্যই চাচ্ছেন। এই দোয়ার সৌন্দর্য লক্ষ্য করুন- এটা অগ্রাধিকার দিয়েছে কোন বিষয়টাকে? “হে প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন”। আপনি যদি দোয়ার শুরুতে ” হে প্রভু আমাকে ক্ষমা করুন” বুঝতে পারেন, তাহলে বাকিটাও বুঝতে পারবেন। আর এই অংশটা বুঝতে না পারলে বাকিটাও বুঝতে পারবেন না।

আরএএস/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: