চোখের যে নীরব রোগে মানুষ অন্ধ হয়

   
প্রকাশিত: ৪:৪৪ অপরাহ্ণ, ৪ মার্চ ২০২০

গ্লুকোমা সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা, দেরিতে বিশেষজ্ঞের কাছে আসা এবং এই রোগে সুস্থ থাকার অসচেতনতাই একজন গ্লুকোমা রোগীর অন্ধত্বের অন্যতম কারণ। গ্লুকোমা চোখের একটা জটিল ও মারাত্মক রোগ, যা একজন মানুষকে চিরতরে অন্ধ করে দিতে পারে– এটি অনেকেই জানে না। এটি সম্পর্কে যদি আমাদের স্বচ্ছ ধারণা থাকে, যেমন এটি কি ধরনের রোগ, কাদের বেশি হয়, কখন হয়, উপসর্গ কী, কখন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, ওষুধ ব্যবহারের চিঠি, চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিয়মানুবর্তিতা ইত্যাদি তা হলে এই রোগের উপসর্গ দেখলেই আমরা গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে পারি।

তিনিই বলে দিতে পারবেন আপনার গ্লুকোমা আছে কিনা? থাকলে কি ধরনের চিকিৎসা আপনার জন্য গ্রহণযোগ্য। কারণ সব ধরনের ব্যবস্থাপত্র সবার জন্য প্রযোজ্য নয়, সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই এর নীতিনির্ধারক।

একজন অন্ধ মানুষের জীবন যেমন দুর্বিষহ তেমনি অভিশাপ। একটি পরিবারের, একটি সমাজের কিংবা একটি জাতির। গ্লুকোমা মানুষের দৃষ্টিশক্তিকে কেড়ে নেয় ঠিক, কিন্তু সঠিক সময়ে যদি রোগ নির্ণয় করা যায় কিংবা চিকিৎসা করা যায়, তা হলে এই রোগকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। একজন সচেতন ব্যক্তিই পারবেন গ্লুকোমায় অন্ধত্ব থেকে নিজেকে রক্ষা করতে। তার এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তাকে সত্বর ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হতে এবং দ্রুত চিকিৎসা নিতে সাহায্য করবে।

আপনি কি জানেন গ্লুকোমা অন্ধত্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ? ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ সারা বিশ্বে গ্লুকোমাজনিত রোগে অন্ধ এবং ২০২০ সালে এর সংখ্যা হওয়ার কথা ১১.২ মিলিয়ন। ২০৪০ সালে গিয়ে দাঁড়াবে ১১১.৪ মিলিয়ন।

যেহেতু এই রোগ নীরব ঘাতক, যার উপসর্গ বোঝা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না, সেহেতু ৫০ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তিই বুঝতে পারে না তার গ্লুকোমা হয়েছে এবং ধীরে ধীরে তিনি অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য প্রতি বছর অন্তত একবার একজন ৪০ বছর ঊর্ধ্ব মানুষ যদি বিশেষজ্ঞের কাছে চোখ পরীক্ষা করান, তা হলে গ্লুকোমা রোগে চোখ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই তাকে প্রতিরোধ করতে পারবেন।

গণসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ওয়ার্ল্ড গ্লুকোমা অ্যাসোসিয়েশন এ বছরের ৮-১৪ মার্চকে বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গ্লুকোমা সোসাইটি এই সময় তাদের দেশে গ্লুকোমার বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে। গ্লুকোমা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, গ্লুকোমায় আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত করা, চিকিৎসা করাই এই সপ্তাহের উদ্দেশ্য।

অর্থাৎ, রাস্তার ট্রাফিক সিগন্যালের সবুজ বাতি এগিয়ে যাওয়ার সংকেত। মানুষকে বলা হচ্ছে– আপনি এগিয়ে যান, গ্লুকোমার জন্য চোখ পরীক্ষা করান এবং আপনার চোখকে রক্ষা করুন।

জেনে রাখুন গ্লুকোমা এক ধরনের চক্ষু রোগ যা চোখের অপটিক স্নায়ুকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে এবং চোখের দৃষ্টিকে কেড়ে নেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই স্নায়ু ধ্বংসের একমাত্র কারণ চোখের উচ্চচাপ। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চোখের স্বাভাবিক চাপ ও চোখের অপটিক স্নায়ুর ক্ষতি করতে পারে। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি রোগীর চোখের চাপকে আয়ত্তের মধ্যে আনা যাবে, তত তাড়াতাড়ি চোখকে গ্লুকোমার হাত থেকে বাঁচানো যাবে।

গ্লুকোমায় ভুগতে পারেন যারা-

যাদের বয়স ৩৫-৪০ এর ঊর্ধ্বে যাদের পরিবারে বাবা মা কিংবা নিকটতম আত্মীয় যেমন- নানা-নানি, দাদা-দাদি, খালা-ফুপু, মামা-চাচা গ্লুকোমায় ভুগছেন তাদের গ্লুকোমা হওয়ার সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ।

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, চোখের মাইনাস পাওয়ার যারা ব্যবহার করেন, মাইগ্রেন, চোখের ছানি দীর্ঘদিন অপারেশন না করা, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা। এই রোগের ক্ষেত্রে রোগী সচরাচর যেসব উপসর্গ বলে থাকেন, সেগুলো হচ্ছে– প্রায়শ মাথাব্যথা ও চোখব্যথা, অস্বস্তির ভাব, যেই চশমা উনি পড়ছেন তাতে স্বস্তি না পাওয়া, দৃষ্টির চারপাশে রঙধনুর মতো রঙ দেখা, স্বল্প আলোতে টিভি দেখা, পড়াশোনা বা সেলাই কাজ করতে গিয়ে মাথাব্যথা, চোখব্যথা করা ও চোখ লাল হয়ে যাওয়া অথবা স্বল্প আলো ছাড়াও চোখব্যথা, মাথাব্যথা ও চোখ লাল হওয়া। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে জন্মগত বড় চোখ কিংবা জন্মের পর আস্তে আস্তে চোখ বড় হয়ে যাওয়া, চোখের মণির চারপাশে চোখের সাদা অংশ দেখা বা মণি ঘোলাটে হয়ে যাওয়া।

সবচেয়ে বড় কথা– রোগী যদি অনুভব করেন তার চোখের ব্যপ্তি বা দৃষ্টির চারদিকের পরিসীমা আগের চাইতে অনেক ছোট হয়ে গেছে, তিনি হাঁটতে চলতে বারবার চারপাশের জিনিসের সঙ্গে লেগে হোঁচট খাচ্ছেন, তখন অবশ্য অবশ্যই আপনি গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ বা চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে দেখিয়ে জেনে নিন আপনি গ্লুকোমায় ভুগছেন কিনা।

গ্লুকোমার কারণে যেই দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায় তা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু যতটুকু দৃষ্টিশক্তি আছে তাকে যদি আমরা চিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক করতে পারি, তাতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যভাবে আপনার বাকি জীবন কাটিয়ে নিতে পারবেন। যার জন্য একজন বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা যেমন দরকার তেমনি একজন রোগীর নিয়মিত ওষুধ নেয়া, নিয়মিত ডাক্তারের কাছে চোখ দেখিয়ে নেয়া এই সহযোগিতা ও সদিচ্ছাও দরকার। আসুন আমরা গ্লুকোমাকে বরণ করে নয়, গ্লুকোমার সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজেদের জয় করে নেই।

কেএ/ডিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: