জাহিদুল ইসলাম

কুবি প্রতিনিধি

ছাত্রলীগ পরিচয় দিয়ে হুমকি, নারী নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও কুপ্রস্তাব

   
প্রকাশিত: ৭:০৫ অপরাহ্ণ, ২২ ডিসেম্বর ২০১৯

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের(কুবি) ইংরেজী বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব পলিন এর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ পরিচয়ে বিভিন্ন জনকে হুমকি-ধামকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারী বিদ্বেষী আপত্তিকর ও উগ্রবাদী মন্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া নবীন ছাত্রীদের মেসেঞ্জারে কু-প্রস্তাব এবং ছাত্রীদেরকে আপত্তিকর মেসেজ পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে এসব অপকর্ম চালালেও ছাত্রলীগের সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করছেন শাখা ছাত্রলীগ নেতারা।

জানা যায়, আহসান হাবীব পলিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। পলিন বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নারীদের নিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ ও আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। এছাড়াও প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া ছাত্রীদের যৌন হয়রানি ও কু-প্রস্তাব দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। লাইব্রেরীতে বসে অশালীন ভিডিও দেখা, এবং সেখানে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ধর্ম নিয়েও বিভিন্ন সময় কটুক্তি করতে দেখা যায়। ছাত্রলীগ পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীকে মারধরের হুমকি ধামকি দেয়ার ঘটনা নিত্যদিনের। তবে শাখা ছাত্রলীগ এবং স্থানীয় ছাত্রলীগের কোন কার্যক্রমেই অংশগ্রহণ নেই বলে জানান ছাত্রলীগ নেতারা। তাদের অভিযোগ,‘ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে এসব অপকর্ম করছেন তিনি।’ এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

এদিকে গত ১৭ ডিসেম্বর ‘কালাচাঁন মিয়া’ নামক একটি ফেইসবুক পেইজের নারীর উচ্চশিক্ষা নিয়ে একটি পোস্ট করেন। সেখানে আহসান হাবীব পলিনের একটি কমেন্টে লিখেন, “বউ হিসাবে কে বেশি যোগ্য? উচ্চ শিক্ষিত চাকরিজীবী ৩০ বছরের আইবুড়ো মহিলা নাকি মাধ্যমিক পাস স্বল্প শিক্ষিত ১৬ বছরের সুন্দরী কচি মেয়ে? উচ্চ শিক্ষিত আইবুড়ো ৩০ বছরের মহিলা যখন বউ হিসাবে ঘরে আসে তখন তার বৈশিষ্ট্য হয় ২. ২৫ বছরের পর মেয়েদের যৌন চাহিদাও কমে যায়। এইসব আইবুড়ো মেয়েরা বিয়ের পর স্বামীর সাথে যৌন সম্পর্ক করতে আগ্রহী হয় না এবং স্বামী যৌন কর্ম করতে চাইলে সেটাকে বৈবাহিক ধর্ষণ বলে। এইসব হিজড়া টাইপের মেয়েদেরকে ছেলেরা কোন দুঃখে বিয়ে করবে? ৩. বিয়ের দুই মাস পর স্বামীকে বলে, তোমার বাবা মায়ের সাথে আমি থাকতে পারবো না। তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দাও। উচ্চ শিক্ষিত মেয়েরা শ্বশুর শ্বাশুড়িকে নিজের আপন বাবা মায়ের চোখে দেখে না। ৫. উচ্চ শিক্ষিত মেয়েরা পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়ে বিয়ের কিছুদিন পর। ক্যাম্পাস লাইফে চৌদ্দ পুরুষের কাছে শরীর বিলিয়ে দিয়ে বহুগামীতায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। বিয়ের এক বছরের মাথায় নিজের স্বামীকে আর ভালো লাগে না। তখন অন্য পুরুষ খোঁজে। এভাবেই পরিবার ভেঙে যায়। ৬. বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া উচ্চ শিক্ষিত অনেক মেয়ে তো আবার গাঁজা খেয়ে ধরা খায়। এইসব গাঁজাখোর উচ্চ শিক্ষিত আইবুড়ো মহিলা বিয়ে করলে আপনার বৈবাহিক জীবন নরকে পরিণত হবে আর আপনার বাবা মায়ের স্থান হবে বৃদ্ধাশ্রমে।”

পরে ১৮ ডিসেম্বর সামিয়া অরিন নামের একজন ফেসবুক ইউজার ‘Stand against rape’ এ পলিনের বিরুদ্ধে একটি পোস্ট দেন। নারীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ১১ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাকিব মাহমুদ এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিলে ব্যাক্তিগতভাবে মেসেজ দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং ছাত্রলীগ দিয়ে মারধরের হুমকি দেন পলিন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাকিব। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতেই আসে ছেলে-মেয়ে সবাই। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একজন ছাত্রের কোন অধিকার নেই সমস্ত উচ্চশিক্ষিত নারীদের উদ্দেশ্যে হেয় করে নোংরা কথা বলা। এদের কারণেই সমাজে নারীদের সম্মান নিশ্চিত হচ্ছে না। এই বিষয়টা বন্ধ হওয়া উচিত, এটা চলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিষয়টা ভালোভাবে দেখা উচিত।’

এছাড়াও তাকে বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীবিদ্বেষী স্ট্যাটাস দিতে দেখা যায়। তবে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া ছাত্রীদের মেসেঞ্জারে উত্ত্যক্ত করা, নাম্বার চাওয়া ও কু-প্রস্তাব দেয়ার অভিযোগ করেন অনেকেই। অন্তত ১০ জন ছাত্রীর সাথে কথা বলে জানা যায়, সানি লিওনের অশালীন ছবি থেকে শুরু করে যাচ্ছে তাই মেসেঞ্জারে পাঠাতো। প্রথম বর্ষ টার্গেট করে কু-প্রস্তাব দিতো। নাম্বার চাইতো, না দিলে অশালীন ব্যাবহার এবং গালাগাল দিতো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইংরেজী বিভাগের এক ছাত্রী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর তিনি নাম্বার খুজতেন, আর মেসেঞ্জারে খুবই জঘন্য অশ্লীল কথা বলতেন। আমি জুনিয়র ছিলাম তাই প্রতিবাদ করার সাহস পাইনি আমি চাই প্রকাশ্যে তার বিচার হোক।’

ইংরেজী বিভাগের আরেক ছাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি চাই,তার ছাত্রত্ব বাতিল করা হউক।অনেকবার সুযোগ দেওয়া হইছে তাকে। কিন্তু সে নিজেকে চ্যাঞ্জ করেনি। একজন ধর্ষক এর চেয়ে কোনো অংশে কম না সে। সুযোগ পেলে এরাই ধর্ষণ করে এবং করতে পারে আরো অনেককিছুই। তাই ছাত্রত্ব বাতিলসহ তার নামে থানায় জিডি করার জোর দাবী জানাচ্ছি।’

চতুর্থ বর্ষের আরেক ছাত্রী জানান, “মেসেজ এ সে (পলিন) আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। আমি রাজি না হওয়ায় সে আমাকে অশ্লীল ভাষায় মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করতে থাকে। আমি মেসেজ দেখতাম না দেখে কুপ্রস্তাব দিতে থাকে। পরে আমি তাকে ব্লক দিই। এতে সে রাগান্বিত হয়ে আমার বন্ধু বান্ধবীকে আমার সম্পর্কে বিভিন্ন খারাপ কথা রটাতে থাকে।

আইন বিভাগের ১২ তম ব্যাচের এক ছাত্রী বলেন, “আমাকে সে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। আমি রাজি না হওয়ায় সে আমাকে খারাপ খারাপ ছবি ও ভিডিও পাঠাতে থাকে। তার পর আমি তাকে ব্লক দিয়ে দিই।”

তার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ বলেন,‘সে শাখা ছাত্রলীগের কেউ না। ছাত্রলীগের কোন মিটিং-মিছিলে কখনোই সে ছিলো না। আগে সে ছাত্রসেনা করত। কেউ যদি ফেইসবুকে শাখা ছাত্রলীগ লিখে রাখে তাহলে তো তার দায়ভার শাখা ছাত্রলীগ নিবে না।’

আহসান হাবীব পলিনের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু তৈয়ব অপি বলেন,‘কুমিল্লা সদর দক্ষিণ ছাত্রলীগের কার্যক্রমে তার কোন অংশগ্রহণ নাই। আমরা নেতৃত্বস্থানীয় যারা আছি, এই নামে কাউকে চিনিনা। সে ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে এসব করছে। তার অপকর্মের দায়ভার ছাত্রলীগ নেবে না।’

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত আহসান হাবীব পলিন বলেন,‘আমি কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি পদপ্রার্থী তাই বিভিন্ন মহল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে। এছাড়া মেয়েদের বিভিন্ন মেসেজ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, কারো কাছে প্রমাণ থাকলে আমার কাছে অভিযোগ করুক।’

এমআর/এনই

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: