শাহিনুর রহমান শাহিন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

তিস্তার বানভাসী মানুষের পাশে জাবির ‘স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন’

   
প্রকাশিত: ৭:৩৯ অপরাহ্ণ, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছবি: প্রতিনিধি

‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নামে দেশের স্বনামধন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হামার পাশে দাঁড়াইছে। হামরা আজ দু’টা ভাত খেয়ে বাচমো বাহে। হামরা প্রায় না খায়া আছি আজ কয়দিন থাকি। কয়দিন থাকি যা পাছি তা প্রায় শ্যাষ। তোমরা আসি আজ বাঁচাইলেন হামাক বাহে। আল্লাহ্ তোমাক মেলাদিন বাঁচি রাখুক। দুই হাতে ছলছল চোখে ত্রাণের বস্তাটি হাতে নিয়ে এমনি করে বিড়বিড় গলায় বলে যাচ্ছিলেন গড্ডিমারী ইউনিয়নের তিস্তার চরের বিধবা নছিরন মাওয়া। লাঠির ওপর ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে মুখের কোণে হাসি নিয়ে ছুটলেন বাড়ির পানে।

পাশেই দাঁড়িয়ে চুল দাড়িতে পাক ধরা বৃদ্ধ জোবেদ মিয়া। ত্রাণ পেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,হামার বারো মাস কপালত দু:খ। দেখার কেউ নাই বাহে। জাহাঙ্গীরগর বিশ্ববিদ্যালয় থাকি কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী সামাজিক সংগঠন থাকি হামার জন্য খাবার দিছে। হামরা আজ খুব খুশি হইছি।

নৌকার হাল ধরে নদীর কিনারে বসা ত্রিশ বছরের যুবক আব্দুল জলিল বলেন, ‘প্রত্যেক বৎসর হামার দু:খ। বন্যার পানি আসি ঘড়-বাড়ি, গরু ছাগল, ক্ষেতের খামার সব নিয়া যায়। প্রায় অর্ধহারে, অনাহারে থাকি। ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন যা সহায়তা দেয় তা দিয়া কয়দিন যায় তারপর কষ্টে দিনাতিপাত করি। তবে প্রায় তোমরার মতো অনেকজন আসি কিছু খাবার দিয়া যায়। তাতেই হামরা খুশি।’

শুধু বিধবা নছিরন মাওয়া কিংবা বৃদ্ধ জোবেদ মিয়া ত্রাণ পেয়ে তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলেন নি। খুশি হয়েছেন অত্র তিস্তার পাড়ের কয়েক‘শ মানুষ। তিস্তার পাড়ের বসতভিটে ছাড়া এসব মানুষের মুখে দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন‘ JU Solidarity ও Inspire Care & Cultivate Human Aid-ICCHA/ইচ্ছা এর কয়েকজন নিবেদিত মানবসেবক।

সংগঠনটির উদ্যোগে মঙ্গলবার (৮/০৯/২০) লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, সানিয়াজান ও সিংগীমারী ইউনিয়েনের বন্যার্ত পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এদিন সকালে নৌকাযোগে তিস্তার নদী পেড়িয়ে চরের বানভাসী মানুষের ঘরে ঘরে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেন সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবকরা। ত্রাণ বিতরণকালে স্থানীয় বাসিন্দারা এরকম স্বেচ্ছাসেবী কর্মকান্ডকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

JU Solidarity সংগঠনের আকবর উদ্দিন আহমেদ মিলন (জাবি-৯ম ব্যাচ) বলেন, ‘গত ২৯ জুলাই থেকে শুরু করে এ যাবৎ ২৫ টিরও বেশি বন্যা দুর্গত এলাকায় ১৪০০ শ পরিবারের মাঝে ত্রান সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে এই কঠিন কাজটি সহজ করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯ থেকে ৪৮ ব্যাচের কয়েকজন নিবেদিত প্রাণ স্বেচ্ছাসেবক ছেলে-মেয়ে। অত্যন্ত আগ্রহের সাথে বড় ভাইদের সমন্বয়ে সুষ্ঠ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে এই ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচী চলছে। আর এই দাতব্য কাজে আস্থা রেখে সহায়তা ও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন প্রাক্তন জাবিয়ানরা। ননজাবিয়ান মহৎ প্রাণ কিছু লোকও সদা জাবিয়ানদের সাথে থেকে প্রতিনিয়ত সহয়তা করে যাচ্ছেন। বিদেশ থেকেও পাঠিয়েছেন কেউ কেউ। আমাদের এই মানবকল্যাণ কর্মকান্ড অব্যাহত থাকবে। যারা জাবির এই মানবতার সেবকদের পাশে থেকে সহায়তা করছেন ও কর্মকে সাফল্যমন্ডিত করছেন তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা।’

জাবির সামাজিক সংগঠন Inspire Care & Cultivate Human AID-ICCHA/ইচ্ছা এর সভাপতি নুরুজাম্মান শুভ (ইতিহাস, ৪৫ ব্যাচ) বলেন, দেশের এই বন্যা সংকটকালে আমাদের জাবির সেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন ‘ইচ্ছা’ দেশের বন্যার্ত মানুষের পাশে দাড়ানোর কার্যক্রম চালু করেছে। ইতিমধ্যে আমরা বেশকিছু জেলায় কয়েকটি এলাকায় সহযোগিতা করেছি। আরও সামনে অনেক এলাকায় বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। আপনারা এগিয়ে আসুন। আমাদের সামান্য আর্থিক সহযোগিতা পারে এই কার্যক্রমকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির লালমনিরহাটের স্বেচ্ছাসেবক শাহিনুর রহমান শাহিন (জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, ৪৪ ব্যাচ) বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক সংগঠন ‘JU Solidarity I ICCHA’ বানভাসী মানুষের কল্যাণে যেভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে সেটা সত্যিই প্রশংসনীয়। বন্যার্তদেও কষ্ট দেখলে খারাপ লাগে, কীভাবে মানুষ এভাবে বেঁচে থাকতে পারে! তবুও সাহস দিয়ে আসি, আপনাদের সাহায্য পেয়ে, কয়েক দিনের জন্য হলেও দু’মুঠো ভাত তাদের মুখে দিতে পেরে মানসিক প্রশান্তি লাগছে। JU Solidarity এবং ইচ্ছা সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞা জানাচ্ছি।

কেএ/ডিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: