প্রচ্ছদ / অন্যান্য... / বিস্তারিত

তৈমুর লং এর অভিশাপেই মরে ৩০ মিলিয়ন মানুষ! অজানা রহস্য উন্মোচন

   
প্রকাশিত: ৮:০৩ অপরাহ্ণ, ৩০ জুন ২০২০

তৈমুর লং ইতিহাসের অপরাজেয় সমর নায়ক। তিনি আলেকজান্ডার এবং চেঙ্গিস খানের মতো বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। চতুর্দশ শতাব্দীর এই তুর্কি-মঙ্গোল সেনাধ্যক্ষ পশ্চিম এবং মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করে তৈমুরীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশাল সাম্রাজ্য ১৩৭০ সাল থেকে ১৪০৫ সাল পর্যন্ত তার নেতৃত্বাধীন ছিল। তৈমুর লং এর প্রকৃত নাম ছিল তৈমুর বেগ। ফার্সি ভাষায় লং শব্দের অর্থ খোঁড়া। একটি যুদ্ধের সময় তিনি পায়ে আঘাত পান। পরে তার ওই পা অকেজো হয়ে যায়। এরপর থেকেই তার নাম তৈমুর লং হয়। ইতিহাসের বিখ্যাত সমরবিদ তৈমুর লং সম্পর্কে সবাই অনেক কিছুই শুনেছেন। তবে এই মঙ্গোল রাজা সম্পর্কে এখনো অজানা অনেক কিছুই আছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো তৈমুরের বিখ্যাত অভিশাপ।

তৈমুর পরিচিতি

তৈমুরের জন্ম ১৩৩৬ সালের ৯ এপ্রিল। সমরকন্দের প্রায় ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের কেশ শহরের নিকটবর্তী ট্রান্সঅক্সিয়ানায়। এই অঞ্চলটি বর্তমানে উজবেকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত। চাগতাই ভাষায় ‘তেমুর’ শব্দের অর্থ লোহা। তিনি মঙ্গোলিয়ান বার্লাস উপজাতিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা তারাঘাই এই গোত্রের প্রভাবশালী ও অভিজাত ব্যক্তি ছিলেন।

তৈমুর নিজেকে বিশ্ববিজেতা চেঙ্গিস খানের উত্তরাধিকারী মনে করতেন। তবে এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের মতে, তিনি চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন না। খুব ছোট বয়সেই তৈমুর একটি দস্যু দল গড়ে তুলেছিলেন। তারা ভ্রমণকারীদের উপর আক্রমণ চালিয়ে গবাদি পশু এবং পণ্যদ্রব্য ছিনিয়ে নিত।

প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, ১৩৬৩ সালের দিকে তৈমুর একটি মেষ ছিনিয়ে নিতে ব্যর্থ হন। এসময় মেষ পালক দুটি তীর ছুড়লে একটি ডান পায়ে এবং অন্যটি ডান হাতে বিদ্ধ হয়। এই আঘাতে তার একটি হাত কিংবা পা চিরতরে অকেজো হয়ে যায়। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন,

খরাসানের সিস্তানের খানের ভাড়াটে হিসেবে কাজ করার সময় তৈমুরের একটি পা পঙ্গু হয়ে যায়। তবে বেশিরভাগ সূত্র থেকে জানা যায়, যুদ্ধের সময় পাওয়া আঘাতে তার একটি পা অকেজো হয়ে যায়। তৈমুরের এই পঙ্গুত্বের জন্য ইউরোপিয়রা তাকে তৈমুর দ্য ল্যাম এবং টেমরল্যান নামে অভিহিত করত। তবে তৈমুরের পঙ্গুত্ব কখনো তার যুদ্ধ জয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি।

তৈমুরের নেতা হয়ে ওঠা

১৩৬০ সালের দিকে তৈমুর একজন সামরিক নেতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তার সৈন্যদের মধ্যে বেশিরভাগই তুর্কি উপজাতির ছিল। তিনি চাঘাতাইখানাতের খানের সঙ্গে ট্রান্সঅক্সিয়ানা অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তার দ্বিতীয় সামরিক অভিযান ছিল খোরাসানে। এক হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে খরাসানে আক্রমণ চালিয়ে সফলতা লাভ করেন।

এই সফলতা তাকে আরো অভিযান পরিচালনায় উৎসাহী করে তুলেছিল। তৈমুরের পিতার মৃত্যুর পর তিনি বার্লাসের প্রধান হয়েছিলেন। এসময় তিনি চাঘাতাই খানের প্রভাব ব্যবহার করে ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করতে থাকেন। প্রথম দিকে তৈমুর স্বয়ং আমিরের নাতি হুসেইনের সহায়তায় অনেক অভিযানে সফল হয়েছিলেন।

পরবর্তীতে তিনি মধ্য এশিয়ার একটি বড় অংশের আমির ছিলেন। তিনি হুসেইনের বোন অলজায় তুরখান আঘাকে বিয়ে করেন। তবে স্বার্থের দ্বন্দ্বে তাদের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। এর মধ্যে তৈমুরের স্ত্রী এবং আমির হুসেইনের বোন তুরখান আঘা মৃত্যুবরণ করেন। তদের পারিবারিক সম্পর্কটাও ছিন্ন হয়ে যায়।

তৈমুর আনুমানিক ১৩৭০ সালে আমির হুসেইনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে তাকে পরাজিত এবং হত্যা করেন। আমির হুসেইনের স্ত্রী সারা মুলক খানুম ছিলেন চেঙ্গিস খানের বংশধর। হুসেইনের মৃত্যুর পর তৈমুর সারা মুলক খানুমকে বিয়ে করেন। এরপরই তিনি মধ্য এশিয়ার চাঘাতাই গোষ্ঠীর একচ্ছত্র শাসক হয়ে ওঠেন।

মধ্য এশিয়ার একচ্ছত্র শাসক তৈমুর

মঙ্গোল এবং মুসলিম সাম্রাজ্যের শাসক হওয়ার পথে তৈমুরের সামনে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ দুটোই ছিল। তার তুর্কি-মঙ্গোলীয় উত্তারিধীকার এই সংকটের মূল কারণ ছিল। মঙ্গোলীয় প্রথা অনুযায়ী কখনো মঙ্গোলীয় সাম্রাজ্য কিংবা ‘খান’ পদবির দাবিদার ছিলেন না। কারণ তিনি চেঙ্গিস খানের উত্তরাধিকার ছিলেন না। এজন্যই তিনি বালখের সরাসরি শাসক হতে পারেননি। তার পরিবর্তে বালখে একজন পুতুল চাঘতাই শাসক বসিয়ে নিজে শাসন চালাতেন।

চেঙ্গিস খানের বংশধর না হওয়ায় তৈমুর ‘খান’ পদবি ব্যবহার করতে পারতেন না বলেই ‘আমির’ পদবি ব্যবহার করতেন। তবে তৈমুর মঙ্গোল সাম্রাজ্যে নিজের উচ্চ অবস্থান ঠিকই তৈরি করেছিলেন। চেঙ্গিসখানের বংশধর এবং আমির হুসেইনের বিধবা স্ত্রী সারা মুলক খানুমকে বিয়ে করার পর রাজ জামাতা পদবি ব্যবহার করতেন।

শাসক হিসেবে তৈমুরের ৩৫ বছরের সাফল্য

তৈমুর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর জীবনের পরবর্তী ৩৫ বছর একের পর এক সফল অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি পার্শ্ববর্তী রাজ্যসমূহ আক্রমণ করে নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করতে থাকেন। পশ্চিম এবং উত্তর-পশ্চিমে ক্যাস্পিয়ান সাগরের নিকটবর্তী স্থল ও ইউরাল পর্বত এবং ভোলগা নদীর তীর পর্যন্ত ভূখণ্ড জয় করেছিলেন।

দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পশ্চিমে বাদাদ, কারবালা এবং উত্তর ইরাক সহ পারস্যের প্রায় পুরো অংশ দখল করেছিলেন। তার বিজয় অভিযান চলার সময় তিনি সামরিক শক্তি এবং বর্বরতা দুটোই প্রদর্শন করেছেন। পারস্য বিজয়ের পর ১৩৮৭ সালে ইস্পাহান শহরে বিদ্রোহের জেরে তৈমুরের নির্দেশে তার সেনাবাহিনী প্রায় দুই লাখ সাধারণ জনগণ হত্যা করেছিল। ১৩৯৮ সালে দিল্লি জয়ের পর তার বাহিনী প্রায় এক লাখ মানুষকে যুদ্ধ বন্দি করেছিল।

দিল্লির সালতানাত দখল তৈমুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজয়। সে সময় বিশ্বের ধনী শহরের মধ্যে একটি ছিল। দিল্লিতেও তার সৈন্যরা নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল। তৈমুর ১৩৯৯ সালে দিল্লি ত্যাগের সময় তখনকার সমৃদ্ধ নগরীটি একটি মৃত্যু পুরিতে পরিণত হয়েছিল। তৈমুর লং একজন অজেয় সেনানায়ক ছিলেন।

একই সঙ্গে তার মেধা এবং রাজনৈতিক কৌশলও ছিল অনন্য। শৈশব থেকেই তিনি বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে জ্ঞানী পণ্ডিতদের সংস্পর্শে এসেছিলেন। ফার্সি, মঙ্গোল, তুর্কি ছাড়াও তিনি আরবি ভাষা শিক্ষা লাভ করেন। রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী তিনি কোথাও ইসলামি আবার কোথাও মঙ্গোল সাম্রাজ্যের আইনকানুন প্রয়োগ করতেন।

বর্বরতার জন্য পরিচিত হলেও তিনি পণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্মান করতেন। শিল্পের প্রতিও তার অনুরাগ ছিল। তার মধ্যে সহনশীলতা এবং উদারতা ছিল বলেও জানা যায়। পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজ তৈমুরের সম্মানার্থে একটি গজল লিখেছিলেন। যেখানে তার গুণগান করা হয়েছে।

তৈমুরের পারিবারিক জীবন

তৈমুরের ৪৩ জন স্ত্রী এবং উপপত্নী ছিল। তার স্ত্রী এবং উপপত্নীদের বেশিরভাগই শত্রু রাজ্যের রাজকন্যা কিংবা রাজাদের স্ত্রী ও সঙ্গী ছিলেন। রাজ্যগুলো জয় করার পর তিনি নিজের সঙ্গী হিসেবে তাদেরকে এনেছিলেন। তৈমুর তাদের বেশ কয়েকজনকে পরবর্তীতে বিয়ে করেছিলেন।

তৈমুর বসন্তে অভিযান পরিচালনা করতে পছন্দ করতেন। তবে তার শেষ যুদ্ধযাত্রা ছিল প্রচণ্ড শীতের মধ্যে। তৈমুর লং তুরস্ক থেকে ইরান পর্যন্ত এবং মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল তার সাম্রাজ্য ভুক্ত করার পর চীন আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন। সে কারণেই সৈন্য বহর নিয়ে চীনের মিং সাম্রাজ্য দখলের জন্য অগ্রসর হয়েছিলেন।

তবে তার এই স্বপ্ন আর পূর্ণ হয়নি। যাত্রা পথেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৪০৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ব্রিটিশ ভূগোলবিদ ক্লেমেন্টস মার্খামের বর্ণনা অনুযায়ী, তৈমুর লং মৃত্যুবরণ করার পর তার দেহ কস্তুরি এবং গোলাপজল দ্বারা সজ্জিত করে একটি উন্নত বস্ত্র দিয়ে জড়িয়ে আবলুস কাঠের কফিনে সমরকন্দে পাঠান হয়েছিল।

তৈমুরের সমাধি রহস্য

তৈমুর লং এর রাজধানী সমরকন্দে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধিস্থ করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় কেটে যায়। কয়েক শতাব্দী ধরে তার সমাধির সঠিক অবস্থান হারিয়ে যায়। জোসেফ স্ট্যালিন ১৯৪১ সালে প্রখ্যাত রাশিয়ান নৃবিজ্ঞানী মিখাইল গেরাসিমোভ’কে তৈমুর লং এর দেহাবশেষের উপর বিভিন্ন গবেষণার জন্য সমরকান্দে পাঠিয়েছিলেন।

নৃবিজ্ঞানী গেরাসিমোভ নৃবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, জীবাশ্ম বিজ্ঞান এবং ফরেনসিক বিজ্ঞানের উপর ভিত্তিকরে প্রথম ফরেনসিক মুখচ্ছবি তৈরির পদ্ধতি রপ্ত করেন। তিনি রাশিয়ায় প্রখ্যাত জার ইভান দ্য টেরিবলের মাথার খুলি থেকেও চেহারার অবয়ব তৈরি করেন। অজানা কারণেই জোসেপ স্ট্যালিন চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত বিজেতা তৈমুর লং এর মুখচ্ছবি এবং তার সম্পর্কে অন্যান্য বিষয়েও জানতে কৌতূহলী হন।

তার নির্দেশ অনুযায়ী, নৃবিজ্ঞানী গেরাসিমোভ নিজের গবেষণা দলসহ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত উজবেকিস্তানের সমরকান্দে পৌঁছান। গেরাসিমোভ’র উদ্দেশ্য ছিল তৈমুর লং এর সমাধির সন্ধান এবং দেহাবশেষ নিয়ে গবেষণা ও তার মাথার খুলি থেকে চেহারার অবয়ব তৈরি করা। রাশিয়ার এই পরিকল্পনার কথা শুনে সমরকান্দের স্থানীয় লোকেরা ভীত হয়ে পড়েন।

সেখানে তৈমুর লং এর একটি ভয়ঙ্কর অভিশাপ সম্পর্কে তারা অভিহিত ছিলেন। ফলে স্থানীয়রা গেরাসিমোভ’কে তৈমুর লং এর সমাধির একটি ভয়াবহ অভিশাপ সম্পর্কে সতর্ক করেন। তবে রাশিয়ান এই নৃবিজ্ঞানী সমাধির অভিশাপের কথা বিশ্বাস করেননি। তিনি কুসংস্কার হিসেবে বিবেচনা করে বিষয়টি উপেক্ষা করেন।

তৈমুরের অভিশাপ

পরিকল্পনা অনুযায়ী গেরাসিমোভের নেতৃত্বে রাশিয়ান নৃতাত্ত্বিক দল সমরকান্দে তৈমুর লং এর সমাধি এবং দেহাবশেষের সন্ধান করতে থাকেন। অবশেষে ১৯৪১ সালের ১৯ জুন বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রের ভিত্তিতে গবেষক দলটি তৈমুর লং এর সমাধি আবিষ্কার করেন। সমাধিটি উন্মুক্ত করে তৈমুর লং এর দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়।

অবাক করা বিষয় হলো, কয়েক শতাব্দী পূর্বে সমাধিস্থ করার সময়ের সুগন্ধি তেলের গন্ধ তখনো ছিল। নৃতত্ত্ববিদরা সমাধিটি উন্মুক্ত করার পর একটি অদ্ভুত লিপিবদ্ধ অভিশাপ দেখতে পান। যার অর্থ ‘যারাই আমার সমাধিটি খুলবে, তারা আমার চেয়ে ভয়ঙ্কর আক্রমণকারীর শিকার হবে।’

নৃবিজ্ঞানীরা এই অভিশাপটিকে গুরুত্ব সহকারে নেয়নি তখন। আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে তারা এমন কোনো অভিশাপ কিংবা সতর্কতা মানতে ছিলেন নারাজ। স্বাভাবিকভাবেই এটি মধ্যযুগীয় অভিশাপ হিসেবে উপেক্ষা করেন। নৃবিজ্ঞানীরা সমাধিস্থল থেকে তৈমুর লং এর দেহাবশেষ সংগ্রহ করে গবেষণার জন্য মস্কোতে নিয়ে যান।

এই ঘটনার ঠিক তিন দিন পর ১৯৪১ সালের ২২ জুন আকস্মিকভাবে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করে। তৈমুরের সেই অভিশাপই যেন সত্য প্রমাণিত হয়। রক্তক্ষয়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে রাশিয়া। এই যুদ্ধে আনুমানিক ৩০ মিলিয়ন রাশিয়ান মৃত্যুবরণ করে। জার্মানির ভয়াবহ আক্রমণ শুরু হওয়ার পর নৃবিজ্ঞানী গেরাসিমোভ তৈমুর এর অভিশাপের বিষয়ে সন্দিহান হয়ে ওঠেন। তার মনে হতে থাকে তাহলে ভয়ঙ্কর সেই অভিশাপই কি বাস্তবে রূপ নিল?

তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে নিজেই স্ট্যালিনকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা করেন। ১৯৪২ সালের শীতের সময় তিনি স্ট্যালিনের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। এ সময়ের মধ্যে অবশ্য তিনি তৈমুরের মুখচ্ছবি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্টালিন নিজেই একজন গভীর অন্ধবিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। তিনি নৃবিজ্ঞানীর কাছ থেকে তৈমুরের অভিশাপের বিষয়ে বিস্তারিত জানার পর আর কালক্ষেপণ করেননি।

স্ট্যালিন যথাযথ সম্মানের সঙ্গে তৈমুর লং এর দেহাবশেষ পুনরায় দাফন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী, একটি বিশেষ বিমানে তৈমুরের দেহাবশেষ সমরকান্দে পাঠিয়ে দেন। ১৯৪২ সালের নভেম্বরে তৈমুরের দেহাবশেষ পুনরায় সমাহিত করা হয়। তৈমুরের সমাধিসৌধটি যত্নসহকারে সিল করে দেয়া হয়। হয়তো তাকে সমাহিত করার পর রাশিয়ানরা অভিশাপ মুক্ত হয়েছিল।

তৈমুরকে পুনরায় সমাহিত করার কয়েক সপ্তাহ পর যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে যায়। রাশিয়ায় জার্মান সৈন্যদের জয়যাত্রা থেমে যায়। রাশিয়ানরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। স্ট্যালিনগ্রাদ যুদ্ধের ফলাফল শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্যই নয় বরণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছিল বলে মনে করা হয়।

একটি অপ্রমাণিত সূত্র থেকে জানা যায়, তৈমুরের দেহাবশেষ বহনকারী বিমানটি মস্কো থেকে সমরকান্দে যাওয়ার পথে ইচ্ছাকৃতভাবেই স্ট্যালিনগ্রদের উপর দিয়ে উড়ে যায়। অনেকে বিশ্বাস করেন, এ কারণেই হয়তো স্ট্যালিনগ্রাদ অভিশাপ মুক্ত হয় এবং রাশিয়ানরা বিজয় অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে তৈমুরের সমাধিসৌধ কেন্দ্রিক একটি অপূর্ব কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। যা গুর-ই-আমির নামে পরিচিত।

বর্তমানে এটি উজবেকিস্তানের সমরকন্দের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। তৈমুরের অভিশাপ নিয়ে হয়তো অনেকের মনেই কৌতূহল জাগতে পারে। অনেকের ভিতরেই প্রশ্ন জাগতে পারে অভিশাপটি কি বাস্তব ছিল? নাকি শুধুমাত্র অতিপ্রাকৃত মানব কল্পনার সঙ্গে মিলিত এক বিস্ময়কর কাকতালীয় ঘটনার সমষ্টি? এসব প্রশ্নের ধ্রুব উত্তর হয়তো কখনই দেয়া সম্ভব নয়।

তবে মিখাইল গেরাসিমোভের মতো একজন বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানীর এক্ষেত্রে ধারণা পরিবর্তন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে তিনি তৈমুরের অভিশাপ মধ্যযুগীয় কুসংস্কার হিসেবে উপেক্ষা করেন। তবে এই অজানা রহস্যময় অভিশাপের বিষয়ে তিনি আর বাড়াবাড়ি করেননি। জোসেফ স্ট্যালিনকে সবকিছু জানিয়ে তিনি যথাযথ রীতিনীতি এবং অচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে তৈমুর লং কে পুনরায় সমাধিস্থ করেন।

কেএ/ডিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: