আরমান হোসেন

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

৯ মার্চের পর

দেশে এসেছেন ১১০১১৬ জন, কোয়ারেন্টিনে মাত্র ৯১০৬ জন

   
প্রকাশিত: ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ, ২০ মার্চ ২০২০

করোনা ভাইরাস নিয়ে সচেতনা বৃদ্ধি, প্রবাসীদের কোয়ারেন্টাইন বাধ্য করাসহ গুরুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশের অধিকাংশ জেলায় ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কোয়ারেন্টাইনে বাধ্য করতে মাঠে নামছে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে টাস্কফোর্স। ৯ মার্চের পর দেশে এসেছেন ১১০১১৬ জন আর কোয়ারেন্টিনে মাত্র ৯১০৬ জন।

অধিকাংশই রয়েছে কোয়ারেন্টাইনের বাইরে। কোয়ারেন্টাইন না করলে ৬ মাসের জরিমানা এবং লাখ টাকার জরিমানার নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়। হাচিকাশি থাকলে জুমআর জামায়াতে প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে নানা সচেতনা এবং প্রস্তুতির মধ্যেও আরও ৩জন করোনা আক্রান্ত হিসাবে সনাক্ত হয়েছে। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৭ জনে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

শরিয়তপুর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এস.এম আশরাফুজ্জামান জানান, করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে সচেতনা বৃদ্ধির জন্য জেলায় প্রতিটি এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডের মেম্বারকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশের একজন এসআই, এএসআই, মসজিদের ইমাম ও এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সচেতনা বৃদ্ধির পাশাপাশি যারা প্রবাস থেকে এসেছেন তারা ঠিকমত কোয়ারেন্টাইন ঠিকমত করছে কিনা সেই ব্যাপারে খবর নিবে। হোম কোয়ারেন্টাইন না করায় বৃহস্পতিবার চারজনকে জরিমানা করা হয়েছে। এরমধ্যে একজনকে ৭৫ হাজার, অপরজনকে ৫০ এবং ২৫ হাজার এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জেলার ইউএনওসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম জানান, হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নিয়ম অনেকে মানছেন না। বাইরে থেকে দেশে ফেরা সকলকেই বাধ্যতামূলকভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। আমরা নজরদারি করছি।

তিনি আরও জানান, র‌্যাবের কাজই হচ্ছে মানুষের সেবা করা। এ জন্য নিজেদের সুরক্ষা আগে জরুরি। সেজন্য প্রত্যেককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বিশেষ ছুটি যেন কেউ ভোগ না করেন। করোনাকে কেন্দ্র করে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং গুজব ছড়ালে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বাজারে কিছুাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাফস, হ্যান্ড পরিষ্কারকের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমরা দেশের সাতটি স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি। আমরা ৪৫ লাখ টাকার ওপরে অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করেছি।

জানা গেছে, চলতি বছরের ৯ মার্চ থেকে বিদেশ থেকে যারা বাংলাদেশে আসবেন তাদের কোয়ারেন্টিনে থাকা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। ওইদিন থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে এসেছেন ১ লাখ ১০ হাজার ১১৬ মানুষ। এদের মধ্যে কোয়ারেন্টিনে আছেন মাত্র ৯১০৬ জন। বাকি ১ লাখের বেশি মানুষ কোয়ারেন্টিনে নেই। বৃহস্পতিবার দেশের সকল সিভিল সার্জন অফিস থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হিসাব থেকে এতথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে দেশে বন্দরগুলোতে গত ২১ জানুয়ারি থেকে যাত্রীদের স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। প্রথম চীন থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং করা হলেও পরবর্তীতে স্ক্রিনিংয়ের তালিকায় যুক্ত হয় থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালিসহ পুরো ইউরোপ।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষনা ইনসিটিটিউট (আইইডিসিআর) গত ৯ মার্চ একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, যেসব দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে সেসব দেশ থেকে আগত (দেশী-বিদেশী) নাগরিকদের বাংলাদেশে এলে ১৪ দিন স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা বাধ্যতামূলক। বিজ্ঞপ্তিতে ৬০টি দেশের নাম উল্লেখ করা হয়। জেলা সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রশাসনকে কোয়ারেন্টিনে বিষয়টি নজরদারি করবেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যারা বিদেশ থেকে আসছেন, তারা হোম কোয়ারেন্টিনে থাকছেন না। দেশে আসার পর থেকে তারা পরিবারের সদস্য ছাড়াও আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে মিশছেন। হাট-বাজারে যাচ্ছেন। তারা সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে অবাধে মেলামেশা করছেন। আর স্থানীয় প্রশাসনও বিদেশ ফেরত মানুষগুলো কোয়ারেন্টিনে থাকছেন কিন্তু কঠোরভাবে নজরদারি করেননি। ফলে বিদেশ ফেরত মানুষের মাধ্যমে স্থানীয় কমিউনিটিতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পরার ঝুঁকি তৈরি হয়। উপায়ান্তর না পেয়ে বুধবার কোয়ারেন্টিনে শর্ত কারা অমান্য করে ঘুরেবেড়াচ্ছেন তাদের খোঁজে বের করতে পুলিশ প্রশাসনকে মাঠে নামানো হয়।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, যাদের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা তারা কোয়ারেন্টিনে থাকছেন না। এতে করে আমাদের কমিউনিটিতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পরার ঝুকি তৈরি আছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যারা সেল্ফ কোয়ারেন্টিনে থাকবেন না, তাদের আমরা প্রতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে এনে রাখবো।

প্রাপ্ততথ্যমতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন ৭ হাজার ২৩৬ জন যাত্রী। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করেছেন ৩ হাজার ১৬৯ জন, চট্টগ্রাম ও মংলা নৌবন্দর দিয়ে ২১১ জন এবং চালুকৃত স্থলবন্দরগুলো দিয়ে প্রবেশকারী ৩৮৫৬ জন যাত্রী রয়েছেন। তবে এদের মধ্যে কোন দেশের কতজন যাত্রী তার তথ্য পাওয়া যায়নি।

সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী ৯ মার্চ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যারা বাংলাদেশে (দেশী-বিদেশী) আসবেন তাদের হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। কিন্তু সকলের কোয়ারেন্টিনে থাকা বাধ্যতামূলক হলেও সেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৭১৩ জন কোয়ারেন্টিনে গেছেন। বাকি ৪৫২৩ জন মানুষ কোয়ারেন্টিনে যাননি। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় যারা কোয়ারেন্টিনে থাকার শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে এমন নয়, আগে থেকে এই অনিয়ম হয়ে আসছে। কোয়ারেন্টিনে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়ায় ঝুকিতে পড়েছে দেশের মানুষ। ফলে এখন সরকার ও দেশের জনগণ করোনাভাইরাস নিয়ে খুবই উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে দিনপার করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি মাসের ৯ মার্চের পর থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আগত ১ লাখ ১০ হাজার ১১৬ জন যাত্রীর স্ক্রিনিং করা হয়েছে। এসব মানুষের দেশে ঢোকার পর হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার কথা। কিন্তু সেখানে কোয়ারেন্টিনে আছেন মাত্র ৯ হাজার ১০৬ জন। বাকি ১ লাখ ১ হাজার ১০ জন মানুষ কোয়ারেন্টিনে নেই। যারা দেশে আসার পর পরিবার পরিজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে অবাধে মেলামেলা করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১০ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষের মধ্যে বেশি হচ্ছে ঢাকার বিভাগের বাসিন্দা। এরপরই আছে চট্টগ্রাম বিভাগের। ঢাকা বিভাগে কোয়ারেন্টিনে আছেন ২৭৪২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৬২৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩২১ জন, রাজশাহী বিভাগে ৮০২ জন, রংপুর বিভাগে ২৫৩ জন, খুলনা বিভাগে ১২২৭ জন, বরিশাল বিভাগে ২৫১ জন এবং সিলেট বিভাগে ৮৮৩ জন রয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলা করণীয় নিয়ে বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মিটিং হয়েছে। বৈঠকে ভাইরাস মোকাবেলা নিয়ে জোরারো পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে মাঠে পুলিশ নামানোর সিদ্ধান্ত হয়। বুধবার রাত থেকে পুলিশ মাঠে নেমেছে। যারা বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পর কোয়ারেন্টনে থাকছেন পুলিশ তাদের বাড়ি বাড়ি যাবে। কেউ কোয়ারেন্টিনে থাকার শর্ত ভঙ্গ করলে মোবাইলকোর্ট সংশ্লিস্ট ব্যক্তিকে জেল-জরিমানা করবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় যখন যা করা রকার, যেমনরকার, সেটাই করা হবে। চীনে কিন্তু স্টেডিয়ামকে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু রোগের জন্য ওতো ভালো হাসপাতাল না হলেও চলবে, তাদেরকে শুধু পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য আলাদা হাসপাতাল প্রয়োজন। আমাদের আর্মি ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করার মতো ক্যাপাসিটি আছে। আমরা প্রয়োজন হলে সে রকম জায়গায় করবো। তবে আমরা আশা করছি দেশে ওই ধরনের পরিস্থিতি হবে না ইনশাল্লাহ। আমরা গত দুই মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছি, প্রতিনিয়ত ভিডিও কনফারেন্সিং করছি, উপজেলা পর্যন্ত সকলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এছাড়া কিছুদিনের মধ্যে ১ লাখের বেশি করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার কিট দেশে আসবে বলে নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক।

কোয়ারেন্টাইন না করলে জেল-জরিমানা : বিদেশফেরত ব্যক্তিরা বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন না মানলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল বা এক লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার এক জরুরি নির্দেশনায় এ শাস্তির কথা জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, করোনা প্রতিরোধের লক্ষ্যে সম্প্রতি বিদেশফেরত এবং তাদের সংস্পর্শে আসা সবাইকে ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে অবস্থান সম্পর্কে জানাতে হবে। নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে জেল-জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, জনসমাগম এড়িয়ে চলুন এবং যার যার অবস্থান থেকে করোনা মোকাবিলায় জাতিকে সহায়তা করুন। এ নির্দেশনা না মানলে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮’ এর ২৪(২) ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে মুখে পড়তে হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এআইআ/এইচি

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: