করোনার সংক্রমণ রোধ

দেশে সময় মতো টিকা প্রাপ্তি নিয়ে শঙ্কা

   
প্রকাশিত: ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ, ২১ আগস্ট ২০২০

ছবি: ইন্টারনেট

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে প্রতিষেধক হিসেবে টিকা পাওয়ার জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও মরিয়া। কিন্তু এজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ পর্বে অনেক পিছিয়ে দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কত মানুষের টিকা প্রয়োজন, তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। এটি নির্ধারণের বেজলাইন সার্ভে প্রয়োজন, সেটা হয়নি। কতগুলো সোর্স থেকে টিকা আসবে, তা-ও চূড়ান্ত নয়, চুক্তির বিষয়ও খুব একটা এগোয়নি।

এ অবস্থায় দেশে সময়মতো টিকাপ্রাপ্তি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তুতির ঘাটতিও দেখছেন তারা। অথচ অনেক দেশ এ সংক্রান্ত প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে রেখেছে। কাজেই তারা যখন টিকা পাবে সেই সময় আমাদের পাওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির মতে, বাংলাদেশে কী পরিমাণ টিকার প্রয়োজন এবং তা সংগ্রহে কেমন অর্থ ব্যয় হতে পারে অথবা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে কি না, এসংক্রান্ত কাজ এখনই গুছিয়ে রাখা দরকার। এছাড়া টিকা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সিরিঞ্জ, পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন বা ক্রয় করার প্রস্তুতি থাকতে হবে। টিকা পাওয়ার পরে সংরক্ষণ, বিতরণ, লোকবল, সরঞ্জামসহ সব পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা এখনই ঠিক করে রাখা উচিত। টিকাপ্রাপ্তির পর তা প্রয়োগে কোন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যা অগ্রাধিকার পাবে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অগ্রাধিকারে কোন জনগোষ্ঠী, সেটা নির্ধারণ করে রাখা প্রয়োজন। এছাড়া জনগণের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার অংশ হিসেবে টিকার ট্রায়াল বাংলাদেশে হওয়া উচিত। কিন্তু এখন পর্যন্ত এগুলোর তেমন কিছুই করা হয়নি। এ ধরনের অনেক খাতেই অগ্রগতি প্রায় নেই বললেই চলে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক টেলিফোনে একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, ‘সবার জন্য একবারে টিকা পাওয়া যাবে না। পাওয়ার পর প্রথমে দেয়া হবে স্বাস্থ্যকর্মীদের, তারপর বয়স্কদের, তারপর সবার জন্য। ধাপে ধাপে টিকা আসবে, সেভাবেই সারা দেশের সব মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি তাকে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন। সিদ্ধান্ত জানালেই আমরা কাজ শুরু করব। এটা নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে সার্বিক প্রস্তুতি নিতে বলা আছে। টিকাদানের প্রস্তুতি বাংলাদেশের রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ প্রস্তুতকারক থেকে শুরু করে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো করোনার টিকা আবিষ্কারের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১১৫টি ভ্যাকসিন বা টিকা নিয়ে গবেষণা চলছে বলে জানিয়েছে দ্য কোয়ালিশন ফর প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস বা সিইপিআই। এর মধ্যে মানবদেহে বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিন প্রয়োগের পরীক্ষাও শুরু হয়েছে। তবে সেগুলো কবে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছবে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সাধারণত কোনো রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। তবে কোভিড-১৯ মহামারীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের এবং আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুমোদনের ধাপগুলো দ্রুত শেষ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। টিকা উৎপাদনের শুরুতেই যাতে বিভিন্ন দেশ তা হাতে পায়, এজন্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। অনেক দেশ কোম্পানি বা ওই দেশের সঙ্গে চুক্তিও করছে। কিন্তু আমাদের দেশ থেকে এখনও তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। কাজেই ওইসব দেশ যখন টিকা পাবে তখন আমরা পাব না।’

এছাড়া এত বড় একটি কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি নেয়া দরকার, তার অনেক কিছুতেই ঘাটতি আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রাথমিক প্রস্তুতি রয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘টিকা আসার আগে অনেক কাজ করতে হবে। বিশেষ করে একটা বেজলাইন সার্ভে করা দরকার। যাতে বোঝা যায় ঠিক কতসংখ্যক মানুষের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, কতজন মানুষের টিকা দরকার। কারণ দেখা গেছে, যাদের মৃদু সংক্রমণ হয়েছে তাদের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। তাই আমরা কাদের টিকা দেব, সেটিও ঠিক করতে হবে। যদি দেশের ২০ ভাগ মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়, তাহলে আরও প্রায় ১৪ কোটি মানুষের জন্য টিকা প্রয়োজন হবে। এই বিপুল পরিমাণ টিকার জন্য ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে দেশের মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সেজন্য মাল্টিপোল সোর্স খুঁজতে হবে। কারণ, ইতঃপূর্বে সিঙ্গেল সোর্সের ওপর নির্ভর করে পিসিআর কিটের সংকট দেখা দিয়েছিল।’

জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির বক্তব্য : কোভিড-১৯ বিশ্বমহামারী মোকাবেলায় টিকার গুরুত্ব বিবেচনা করে এ বিষয়ে জাতীয় পরামর্শক কমিটি সম্প্রতি বেশকিছু প্রস্তাব দিয়েছে। এগুলো হল- টিকা আন্তর্জাতিক বাজারে এলে কীভাবে প্রথমেই বাংলাদেশে নিয়ে আসা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। বাংলাদেশে কী পরিমাণ টিকার প্রয়োজন, তা সংগ্রহে কত খরচ হবে কিংবা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে কি না- সেসব বিষয়ে হিসাব করা। যেসব প্রতিষ্ঠান বা দেশ টিকার ট্রায়ালের তৃতীয় পর্যায়ে আছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। যাতে টিকা মানবদেহে প্রয়োগের অনুমতি পাওয়ামাত্রই বাংলাদেশ তা পেতে পারে। সাধারণত প্রথম ব্যবহারযোগ্য ভ্যাকসিন/টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমেই বিতরণ করা হয়। একটি নির্দিষ্ট মাথাপিছু আয়ের নিচের দেশগুলোকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিনামূল্যে নির্দিষ্টসংখ্যক ভ্যাকসিন দিয়ে থাকে এবং কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হবে। যেটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই দ্রুত ব্যবস্থার মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করার লক্ষ্যে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় অগ্রিম অর্থ দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করে কমিটি।

কমিটি মনে করে, কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে জনগণের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে টিকার ট্রায়াল বাংলাদেশে হওয়া উচিত। বিশ্বের যেসব দেশ যেমন- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া টিকার গবেষণায় এগিয়ে আছে, তারা তাদের টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অন্যান্য দেশও অংশগ্রহণ করছে। যেমন- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল ব্রাজিল ও ভারতে হচ্ছে। ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, চিলি, ফিলিপাইন ও তুরস্কেও ট্রায়াল হচ্ছে। বাংলাদেশে টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হলে প্রথমত বাংলাদেশ এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তা প্রমাণের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং এই টিকা সফল প্রমাণিত হলে সর্বাগ্রে পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে।

বিশ্ব পরিস্থিতি : রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সাফল্য ঘোষণা করার পর এরই মধ্যে ২০টি দেশ অগ্রিম বুকিং করেছে। জানা গেছে, এর পরিমাণ এক বিলিয়ন অর্থাৎ ১০০ কোটি ডোজ। তবে পুতিনের ঘোষণার পর বিভিন্ন দেশ টিকার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ জানায়। এত দ্রুত টিকা বের করার পদ্ধতিতে সঠিকভাবে পরীক্ষা চালানো হয়নি বলেও অভিযোগ উঠছে। তবে সেসব উড়িয়ে দিয়েছে রুশ সরকার। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন ঘোষণা দিয়েছেন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি করোনার টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সফল হলে তা সব নাগরিককে বিনামূল্যে দেয়া হবে। এজন্য ব্রিটিশ ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে একটি চুক্তিও করেছে অস্ট্রেলিয়া। এস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে চুক্তির ফলে টিকাটি বাজারে আসার শুরুতেই পাবে অস্ট্রেলিয়া। দেশের ২ কোটি ৫০ লাখ জনগণের জন্য এ টিকা দেয়া বাধ্যতামূলক করা হবে।

বিনামূল্যের টিকা কতদূর : করোনার কার্যকরী টিকা বাজারে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতেই নতুন আশঙ্কার কথা শোনাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সম্প্রতি সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, করোনার টিকা শুধু তৈরি হলেই হল না। সবার জন্য সেই টিকার ডোজ তৈরি করতে হবে। আর গোটা বিশ্বের জন্য সেই ডোজ তৈরি করতে প্রয়োজন প্রচুর অর্থ। যার ১০ শতাংশও নাকি এখনও জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ধারণা, গোটা বিশ্বের প্রত্যেক বাসিন্দার জন্য যদি করোনার টিকা তৈরি করতে হয়, তাহলে অন্তত ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার খরচ করতে হবে। সেই টাকা তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এপ্রিলে তারা বিশ্বের কাছে অনুদান চেয়েছিল। অনেকেই অনুদান দিয়েছে। কিন্তু তাদের কাছে থেকে প্রাপ্ত টাকা ডব্লিউএইচও’র লক্ষ্যমাত্রার ধারে-কাছেও পৌঁছায়নি। এখন পর্যন্ত মোট প্রয়োজনীয় অর্থের ১০ শতাংশ টাকাও অনুদানের মাধ্যমে ওঠেনি। সূত্র: যুগান্তর

আরএএস/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: