প্রচ্ছদ / খোলা কলাম / বিস্তারিত

নবগ্রামের ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’ ও পরসমাচার

   
প্রকাশিত: ৪:০৯ অপরাহ্ণ, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯

নবগ্রামের জন্ম বেশি দিন হয়নি। জনসংখ্যা ও আয়তনের সবটুকু মিলেই উত্তর পাড়া আর দক্ষিণ পাড়া। ডিজিটাল মানচিত্রে দেখতে ব-দ্বীপের মতই। জন্মের পূর্ব থেকেই উত্তর পাড়া যেখান থেকে নবগ্রাম আলাদা হয়েছে তাদেরই উত্তরসূরী। শুধু মাত্র ভৌগলিক বিভক্তির কারণে উত্তর পাড়া পূর্বের গ্রামের আনুগত্যের অংশীদার ও ভবিষ্যত পূর্বের গ্রামে ফিরে যাবার অলৌকিক স্বপ্ন দ্বারা তাড়িত একটি বিশেষ ভাবনার মানুষের বাস।

আর দক্ষিণ পাড়া সব সময়ই শিক্ষাদীক্ষা সংস্কৃতিতে এগিয়ে আর আধুনিক বিশ্বায়নের পক্ষের পরিশিলীত চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী প্রায় সমসংখ্যক মানুষের বাস। আন্দোলন সংগ্রাম স্বাধীনতা দেশাত্ববোধ অসম্প্রদায়ীকতা অর্থাৎ বিশ্বমানুষের প্রতিনিধিত্বশীল আধুনিক মানুষ বিশিষ্ট দক্ষিণ পাড়া।

সঙ্গত কারণেই নবগ্রামের জন্মের কিছু দিনের মধ্যে দুই পাড়ার সমন্বিত আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। গ্রামের জনসংখ্যা, তাদের জীবন যাত্রা আগামীর ভাবনা গ্রাম পরিচালনা ইত্যাদির সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কুটনৈতিক পরিকল্পনা করতে হবে। দক্ষিণ পাড়া চিন্তা চেতনায় এগিয়ে বলে তাদের উপর দায়িত্ব অর্পন করার ক্ষেত্রে উত্তর পাড়ারও কোন আপত্তি থাকল না।

পন্ডিতদের মাথায় আসল জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জমি জমা উভয়েরই প্রায় অর্ধেক অর্ধেক। উত্তর পাড়া বলল, আমাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ এটা করতে চায় না তাদের মত একটু ভিন্ন। এ বিষয়ে একমত হতে আমাদের একটু সময় দিতে হবে। উত্তর পাড়া সময় পেয়ে পূর্বের গ্রামের প্রভূদের সাথে কথা বলে একটি নতুন ফরমূলা পেয়ে গেল। তা হল তারা জন্ম নিয়ন্ত্রণে রাজি কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা সিদ্ধান্ত নিল এটির বিপরীতে হাটতে হবে এবং যতদ্রুত এটি বাস্তবয়ন করা যাবে ততই দ্রুত দক্ষিণ পাড়াকে কুপোকাত করা যাবে। তাই হল।

শুরু হল নবগ্রামে জন্ম নিয়ন্ত্রণ। পরিচালনায় দক্ষিণ পাড়া। সঙ্গত কারণে একটি নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হবার পর দেখা গেল দক্ষিণ পাড়ার মানুষের ব্যবসা বাণিজ্য জমি জমা বাসস্থান ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে আর উত্তর পাড়ার জনসংখ্যা জ্যামেতিক হারে বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় এসেছে যে প্রায় উত্তরপাড়ার তিন জনের বিপরীতে একজন দক্ষিণ পাড়ার মানুষ পাওয়া যাচ্ছে। টনক নড়ল দক্ষিণ পাড়ার। অবশ্য ততক্ষণে পার্শ্ববর্তী গ্রামের কিছু লোকজনও নবগ্রামে ঢুকে পড়েছে এমনকি দক্ষিণ পাড়ার প্রতিবেশী বন্ধুগ্রাম তাদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এমন যে তারাও মনে মনে কিছু লোকজনকে নবগ্রামে পাঠানোর বিষয়ে মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে।

এরকম বাস্তবতায় দক্ষিণ পাড়া প্রায় বেদিশা অবস্থায় কি আর করা। আবার দুই পাড়ায় মধ্যে মিটিং বসল। এবারও প্রসঙ্গ জন্ম নিয়ন্ত্রণ, তার সুফল কুফল এবং ভবিষ্যত কর্ম পরিকল্পনা। দেখা গেল দক্ষিণ পাড়ার বর্তমানে জনসংখ্যা উত্তর পাড়ার ২০% এরও কম। উত্তর পাড়া এবার বলল, শোন তোমরা এই ২০% শিক্ষিত মানুষই এই গ্রাম চালাবা আর এ রায় আমরা দিচ্ছি তোমাদের কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে তোমাদের সম্মান জানাতে হবে অবশ্যই।

রাজী দক্ষিণ পাড়া। প্রশ্নটি কি হবে সেটা সম্পর্কে জানার মত আগ্রহ বেশি দূর আগানো গেল না জনআধিক্যের বিবেচনায় উত্তর পাড়া বলল তোমাদের ঘরে আর কোন হারমোনিয়াম বাজতে পারবে না কারণ আমাদের বেশির ভাগ মানুষ এটা ভীষণ অপছন্দ করে। কাজেই আমাদের পছন্দ অপছন্দের মূল্য তোমাদের দিতে হবে নইলে?

জন্ম নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা আমরা আরো বেশি এটার বিপরীতে চলব। ভয়ের ব্যাপার। গ্রামটা কি আবার তাদের কাছেই ছেড়ে দিতে হয় কি না কিন্তু ততক্ষণে আর কোন বিকল্প পন্থা না থাকায় দক্ষিণ পাড়া রাজি হল। কিন্তু সংস্কৃতির উৎকর্ষ্ সাধনে সাংস্কৃতিক চেতনার লালন পালন শিক্ষা দীক্ষার জ্ঞান, গরিমা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে অসাপ্রদায়িক চিন্তা দ্বারা চালিত এ মানুষগুলির হারমোনিয়াম বন্ধ হলে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে জেনেও দক্ষিণ পাড়া রাজি হল।

পুঁজিবাদের গণতন্ত্র আর গণতন্ত্রের মেজরিটি’র কাছে এখন দক্ষিণ পাড়া অনেক খানি কোনঠাসা। দক্ষিণ পাড়া শুরু থেকে জন্ম নিয়ন্ত্রণ চালু করেছে। কিন্তু যারা এটি বাস্তবায়ন করবেন না রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত না করায় আজ তাদেরই কন্ঠরোধ হচ্ছে, চেতনা অষাড়ে পরিণত হচ্ছে। উদাসীনতা আর অন্যকে মূল্যায়ন না করার মত মানুসিকতার কারণে দক্ষিণ পাড়াই আজ মনস্তাত্বিক ভাবে আত্মসমর্পন করার দারপ্রান্তে।

উত্তর পাড়ার পুর্ণাঙ্গ স্বপ্ন পুরণ না হলেও প্রতিশোধ এবং নব প্রতিরোধ গড়ার ক্ষেত্রে উত্তর পাড়া অনেক খানিই সফল। যদিত্ত দক্ষিণ পাড়া জনসম্মুখে তা বলতে পারে না কোন ভাবেই।

লেখক: এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার, সাবেক পুলিশ সুপার ফেনী।(খোলা কলামে প্রকাশিত সব লেখা একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সাথে পত্রিকার কোন সম্পর্ক নেই)

এমআর/এনই

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: