আরমান হোসেন

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

পিরোজপুরে আ’লীগ নেতা আউয়ালের জামিন নিয়ে নাটকীয়তা

   
প্রকাশিত: ১২:০১ পূর্বাহ্ণ, ৫ মার্চ ২০২০

আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম এ আউয়ালের জামিন বিষয়ে নাটকীয়তায় পিরোজপুরের জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মান্নানকে প্রত্যাহারের ঘটনায় তোলপার শুরু হয়েছে। এঘটনায় আইন মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, পিরোজপুরের ঐ জেলা জজের ব্যবহার ছিল ‘অত্যন্ত অশালীন ও রূঢ়’। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এদিকে এই প্রত্যাহার আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট। বিষয়টি হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হলে প্রত্যাহারের আদেশ কেন অবৈধ নয় মর্মে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। অপরদিকে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল অভিযোগ করে বলেন, মৎস ও পানি সম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের প্রভাবে জামিন নাকচ হয়েছে। এছাড়া এ কে এম এ আউয়ালের জামিন প্রসঙ্গ ও সংশ্লিষ্ট জজ প্রত্যাহারের ঘটনায় বিভিন্ন মহলে আলোচনা – সমালোচনার ঝড় বইছে।

জানা যায়, আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম এ আউয়ালের জামিন নিয়ে নাটকীয়তায় পিরোজপুরের জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মান্নানকে প্রত্যাহারের আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে হাই কোর্ট। সাবেক সংসদ সদস্য আউয়ালকে কারাগারে পাঠানোর আদেশের পর বিচারককে বদলি করে তার জামিনের আদেশের খবর সংবাদপত্রে দেখে বুধবার (৪ মার্চ) আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল দেয়। আইন সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানান আইনজীবী এম আব্দুল কাইয়ুম। যে ক’জন আইনজীবী বুধবার বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন, আব্দুল কাইয়ুম তাদের মধ্যে একজন। আদালত আগামী বুধবার পরবর্তী আদেশের জন্য রেখেছে বলেও জানান এই আইনজীবী। সকালে বিষয়টি হাই কোর্টের পৃথক দুটি বেঞ্চের নজরে আনেন আইনজীবী শিশির মনির ও সায়েদুল হক সুমন।

তার মধ্যে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ আইনজীবী শিশির মনিরকে বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনার পরামর্শ দেন। এদিকে জজ আব্দুল মান্নানকে বদলি করার বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, আউয়ালের জামিন আবেদনের শুনানিতে পিরোজপুরের জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মান্নান অত্যন্ত ‘অশালীন ও রূঢ়’ ব্যবহার করায় তাকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়।

জেলা জজের এই ব্যবহার করা সমীচীন হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলছেন, ‘সিচুয়েশনটাকে প্রশমিত’ করতেই আওয়ামী লীগ নেতা ও তার স্ত্রীকে জামিন দেওয়া হয়েছে এবং এতে আইনের শাসনের ব্যত্যয় হয়নি। কারও জামিন দেওয়া, না দেওয়ার এখতিয়ার সম্পূর্ণ আদালতের’ মন্তব্য করেই আইনমন্ত্রী আত্মপক্ষ সমর্থনের সুরে বলেন, কিন্তু আদালত যদি এমন কোনো ব্যবহার করে, এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন যেখানে আইনশৃঙ্খলা এবং আইনের শাসন রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে কি না, সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন কিন্তু একটা ব্যবস্থা নিতে হয়।

সেই অবস্থার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্যই পরে এই সম্পূর্ণ সিচুয়েশনটাকে প্রশমিত করার জন্য পিরোজপুর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তার স্ত্রীকে বেইল দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি না যে এখানে আইনের শাসনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে। দুর্নীতির মামলায় পিরোজপুরের সাবেক সংসদ সদস্য আউয়াল ও তার স্ত্রী লায়লা পারভীনকে মঙ্গলবার সকালে কারাগারে পাঠানোর আদেশে দিয়েছিলেন জেলা জজ আব্দুল মান্নান। পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আউয়ালের সমর্থকদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে জজ আব্দুল মান্নানকে বদলি করা হয়।

বিকালে পিরোজপুরের ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজের দায়িত্ব নিয়ে নাহিদ নাসরিন আওয়ামী লীগ নেতা আউয়াল ও তার স্ত্রীকে জামিন দেন। আউয়াল দাবি করেছেন, তাকে কারাগারে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিচারকের উপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন পিরোজপুরের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

আউয়াল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মঙ্গলবার দুদকের মামলায় আমার জামিন নামঞ্জুর করতে বিচারক মো. আব্দুল মান্নানকে প্রভাবিত করেছেন মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সংবাদ সম্মেলনে আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সর্বৈবভাবে অসত্য ও মিথ্যাচার।

তিনি বলেন, মন্ত্রী হওয়ার পরে কোনও নিয়োগবাণিজ্য, কমিশনবাণিজ্য করি নাই, করবোও না ইনশাআল্লাহ। আমি আইন পেশায় নতুন নই। এ পেশা থেকে স্বচ্ছতার সঙ্গে আয় করেছি। সে আয় থেকে জমি কিনেছি। গাড়ি নেওয়ার যে কথা তিনি (এ কে এম এ আউয়াল) বলেছেন তাও মিথ্যা অভিযোগ। তিনি আরও যেসব অভিযোগ করেছেন তাও ভিত্তিহীন।

প্রসঙ্গত, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় এ কে এম এ আউয়াল ও তার স্ত্রী লায়লা পারভীন মঙ্গলবার (৩ মার্চ) পিরোজপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন। বিচারক মো. আবদুল মান্নান দুপুর পৌনে ১২টায় তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ওই আদেশের পরপরই আউয়াল দম্পতির আইনজীবীরা আদালত কক্ষে হট্টগোল করেন। আদালত প্রাঙ্গণে ও শহরে আউয়ালের সমর্থকরা বিক্ষোভ করেন। এর পরপরই জেলা জজ মো. আবদুল মান্নানকে আইন মন্ত্রণালয় স্ট্যান্ড রিলিজ করে।

এরপর ভারপ্রাপ্ত জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পান পিরোজপুরের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক নাহিদ নাসরিন। তার আদালতে আউয়াল দম্পতি পূর্বে করা জামিন আবেদন পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তাদের দুই মাসের জামিন দেন।

দুদকের আইনজীবী মুনসুর উদ্দিন হাওলাদার জানান, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে পিরোজপুর-১ (পিরোজপুর-নাজিরপুর-স্বরূপকাঠি উপজেলা) আসনের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এ কে এম এ আউয়াল এবং তার স্ত্রী জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি লায়লা পারভীনের বিরুদ্ধে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর পৃথকভাবে তিনটি মামলা দায়ের করে দুদক। মামলাগুলোর মধ্যে একটিতে আউয়াল ও তার স্ত্রী লায়লা পারভীনকে আসামি করা হয়েছে। বাকি দুটিতে এককভাবে আসামি করা হয়েছে আউয়ালকে। তিনটি মামলারই বাদী হয়েছেন দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আলী আকবর।

ওই তিন মামলায় আউয়াল দম্পতি গত ৭ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ থেকে আট সপ্তাহের আগাম জামিন নেন। মেয়াদ শেষ হওয়ায় মঙ্গলবার সকালে আউয়াল ও লায়লা পারভীন পিরোজপুর জেলা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিন চান।

এমআর/এনই

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: