প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

মনজুরুল ইসলাম

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

প্রেমের কারণে আজ ধ্বংসের পথে দুটি গোষ্ঠি

   
প্রকাশিত: ৩:৪৪ অপরাহ্ণ, ৩ জানুয়ারি ২০২০

কিশোর-কিশোরীর প্রেমকে কেন্দ্র করে ধ্বংসের পথে দুই পরিবার। মন্ডল পরিবারের কিশোরী মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে খান পরিবারের কিশোর ছেলের। এ দিকে দুই মেরুতে দুই পরিবার। একদিকে মন্ডল পরিবার অপর দিকে খান পরিবার। দুই পরিবার বা গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে চলে আসছে। এর মাঝেই গড়ে উঠে দুই পরিবারের কিশোর-কিশোরীর প্রেমের সম্পর্ক। সিনেমা বা উপন্যাসের কাহিনীর মত ময়মনসিংহ সদর উপজেলার বোররচর ইউনিয়নের দিয়ারচর গ্রামের মন্ডল পরিবার বনাম খান পরিবার দুই গোষ্ঠীর চলমান দ্বন্দ্ব রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রুপ নিয়েছে বার বার। আগে থেকেই ঘটেছে একাদিক প্রাণহানীর ঘটনা। আহত হয়েছেন অনেকেই। মামলা, হামলা যেন সেখানে মামলি ব্যাপার মাত্র।

দুই পরিবারের দ্বন্দ্বের কারণে অজানা আতংক পিছ ছাড়ে না গ্রামবাসীর। সাম্প্রতিক সময়েও দুই পরিবারের ছেলে-মেয়ের প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে। ভাংচুর করা হয়েছে ২০-২৫টি বসত ঘর। নষ্ট করা হয়েছে ৩ শতক জমির ফসল। আহত হয়েছেন ২২ জন। দীর্ঘদিনের চলমান এই গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব স্থায়ীভাবে নিরসনের পথ খুঁজছেন পুলিশ ও জন প্রতিনিধিরা। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, মন্ডল গোষ্ঠীর কামাল হোসেন মন্ডল বলেন, ১৯৮৫ সাল থেকেই খান গোষ্ঠীর সাথে আমাদের বিরোধ চলছে। এই বিরোধে ১৯৮৫ সালে জেটা মেঘু মিয়া ও ১৯৯৯ সালে বাবা আব্দুল মোতালেব মন্ডলকে প্রাণ দিতে হয়েছে। খান গোষ্ঠী আমাদের চেয়ে শক্তিশালী। তাই বাবা ও জেটাকে প্রকাশ্যে দিবালোকে হত্যা করেও আইনের ফাঁক ফোকরে তারা বেরিয়ে এসেছে। ২০০৪ সালে হত্যার উদ্দেশ্যে আমার উপর হামলা হয়েছে। আমার একটি চোখ নষ্ট হলেও প্রাণে বেঁচে রয়েছি। এরই মাঝে গত ১৭ আগস্ট আমার ভাতিজি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে খান বাড়ির ছেলে মমিন খান রাতের আধারে ধর্ষণ করে সরিষা ক্ষেতে অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে রাখে।

এ বিষয়ে আমরা থানায় একটি ধর্ষণ মামলাও করি। এরপর থেকে খান গোষ্ঠীর স্থানীয় ইউপি সদস্য এনামুল হক খান মামলা তুলে নিতে নানাভাবে হুমকী দেয়। তাতে সাড়া না দেওয়ায় তারা আমাদের ৪০-৪৫ টি ঘরে দিনে দুপুরে হামলা চালিয়ে লুটপাট করে। ৩ শতক জমির ক্ষেতের ফসলও নষ্ট করে। তাছাড়া ২২জনকে পিটিয়ে আহত করে। অনেকেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আমরা তাদের ভয়ে বাড়ি ছাড়া। কোন লোকজন বাড়ি ঘরে যেতে পারছেনা। উল্টো তারা আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েও হয়রানী করছে। আমাদের এলাকাটি ময়মনসিংহ সদর, ফুলপুর এবং নকলা উপজেলার সীমান্ত হওয়ায় আমরা সহজেই পুলিশি সহযোগিতা পাইনা। আমরা এসব ঘটনার সুষ্ঠ বিচার চাই।

ইউনিয়ন কৃষকলীগের সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, মন্ডল বাড়ি এবং খান বাড়ির বিরোধ দীর্ঘদিনের। আমরা সামাজিকভাবে বসে বিরোধ নিরসনের জন্য অনেক চেষ্টা করেছি তাতে কোন লাভ হয়নি। সম্প্রতি খান বাড়ির ছেলের সাথে মন্ডল বাড়ির মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের বিবাদ আরো চরম আকার ধারণ করেছে। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় কোতোয়ালী মডেল থানায় একটি ধর্ষণ মামলা হয়। মামলা হলে তারা মেয়েকে আটকে রেখে মন্ডল বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট করেছে। আমি মীমাংসা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমার বাড়িতেও হামলা হয়েছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য এনামূল হক খান বলেন, মন্ডল ও খান দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের মূলে মন্ডল গোষ্ঠীই দায়ি। তারা আমাদের গরু চুরি করে নেয়াসহ নানা ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। তাই তাদের সাথে আমাদের কোন ভাবেই সমঝোতা হবে না। মন্ডল গোষ্ঠীর লোকজন অন্যায়ভাবে মানুষের ক্ষতি করে। তাদের কোন মানবিকতা নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের ঘর-বাড়িতে ভাংচুর ও আগুন দিয়ে আমাদের উপর দোষ চাপাচ্ছে।

তারা আমাদের পরিবারের ছেলের নামে মিথ্যা ধর্ষণ মামলা দিয়েছে। ওই মেয়েকে মমিন ধর্ষণ করেনি। তারা নিজেদের বাড়ি ঘর ভাংচুরের পর দুই ছেলে মেয়ে কোথায় পালিয়ে গেছে কোন খোজ খবর পাচ্ছি না। বোররচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী বুদু বলেন, একটি মেয়েকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের শুত্রুতা আরো চরম আকার ধারণ করেছে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে। এ নিয়ে চার গোষ্ঠী দু’ভাগে ভাগ হয়েছে। মন্ডল-হাজী এবং খান-সরকারের মধ্যে বিবেদ ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকার একাধিক সাধারণ মানুষ জানান, দুই গোষ্ঠির দ্বন্দ্বের কারণে বহুবার সংঘর্ষ, মারামারি হানাহানি, মামলার ঘটনা ঘটেছে। গ্রামবাসী তাদের কারণে এক অজানা আতঙ্কে থাকেন। তারা এর স্থায়ী সমাধান চান।

কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি মাহমুদুল ইসলাম বলেন, দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বংশ পরম্পরায় বিরোধ চলে আসছে। সেটি আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে সেটি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করছি অচিরেই বিষয়টি সমাধানের মাধ্যমে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক মেলবন্ধন ফিরে আসবে।

এমআর/এনই

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: