প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

খায়রুল আলম রফিক

বিশেষ প্রতিনিধি

ফাঁসির মঞ্চ থেকে রাজনীতির মাঠে !

   
প্রকাশিত: ৭:০৫ অপরাহ্ণ, ১১ জুলাই ২০২০

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অন্যতম বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট অসিত সরকার সজল । তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় কমিটির সদস্য ও সদস্য নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগ নেতা । নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা । পচাত্তরে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করে একদল সেনা সদস্য।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছেন যিনি বঙ্গবন্ধুর নাম সগৌরবে উচ্চারণ করেছিলেন, তিনি অসিত সরকার সজল। তিনি একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধা এবং পঁচাত্তরের প্রতিরোধ যোদ্ধা। বীর মুক্তিযোদ্ধা অসিত সরকার সজলের জন্ম ১৯৫৩ সালে ৩০ ডিসেম্বর নেত্রকোনা জেলা শহরে এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী হিন্দু পরিবারে। তিনি আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন । নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত হয়ে পড়েন । তখন চরম ক্রান্তিকাল । তারপর ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পুলিশের হাতে প্রথম গ্রেপ্তার হন এবং তার সহোদর বড় ভাই অজিত সরকার রঞ্জিত দীর্ঘ ২ মাস কারাভোগের পর মুক্তি লাভ করেন । তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রচারণা কার্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন । ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা বাহিনীতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন । তখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা । ১৯৭৪ সালে জাতির পিতার বঙ্গবন্ধুর জেষ্ঠ পূত্র শহিদ শেখ কামাল সারাদেশে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বেগবান করার জন্য স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি অসিত সরকার সজলকে নেত্রকোনা জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করেন । ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির জনককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় । ১৯৭৫ সালে অক্টোবর মাসে অসিত সরকার সজল তার নেত্রকোনার বৈশাখী গার্ডেন বাসভবন থেকে গ্রেফতার হন এবং অমানবিক নির্যাতন করার পর তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা এনে জেলে পাঠিয়ে দেন । দীর্ঘ ২ মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি লাভ করেন । তিনি নেত্রকোনা থেকে আবারো ঢাকায় গিয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত হন । ১৯৭৫ সালে ৪ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন আহম্মদ ও আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশারফের মাতা এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দসহ অসিত সরকার সজল মৌন মিছিলে অংশ গ্রহন করে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়ে শত বাঁধা পেরিয়েছে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন । ঠিক সেদিনই বিকেল ৪ টায় আওয়ামী লীগ নেত্রী অগ্নি কণ্যা মতিয়া চৌধুরী, মুকুল বোস, নিরঞ্জন সরকার বাচ্চুর নেতৃত্বে সামরিক আইন ভঙ্গ করে বিক্ষোভ মিছিল করে তোপখানা রোডে যান । সেখানে অসিত সরকার সজল খুনি মোস্তাকের ছবি ভাঙচুর করেন এবং মোস্তাকের ছবি আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন । সেদিন তিনি জাতীয় ৪ নেতাকে জেলখানায় নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে প্রতিশোধের নেশায় মরিয়া হয়ে গিয়েছিলেন ।

১৯৭৫ সালে ১১ নভেম্বর রাতে মানু মজুমদার,অসিত সরকার সজল, নিরঞ্জন সরকার বাচ্চু, শহিদ ঝন্টু রায়সহ ১৫ জনের একটি দল গোপনে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে যান এবং সেখানে অস্ত্র হাতে বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়েন । ২ মাস পর অসিত সরকার সজল,মানু মজুমদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা নিরঞ্জন সরকার বাচ্চু, চন্দন বিশ্বাস, মোতাহার হোসেন মোল্লা ও যতিশ সরকার দুলাল সশস্ত্র ঢাকায় আসেন এবং আওয়ামী নেতৃবৃন্দদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন তখন বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ কর্মী বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম বজলুল রহমানের সহযোগিতায় অসিত সরকার সজল,মানু মজুমদারসহ অন্যান্য সহযোদ্ধারা খুনি খন্দকার মোস্তাককে হত্যা মিশনে অংশ নেয়ার জন্য গোপন বৈঠকে বসেন । ঠিক সেদিনই গোয়েন্দা পুলিশ কর্তৃক অসিত সরকার সজল এবং মানু মজুমদার বজলুল রহমানের বাসায় গ্রেফতার হন এবং বজলুল রহমান জিগাতলা থেকে গ্রেফতার হন । সেখান থেকে তাদের ধানমন্ডি থানায় নিয়ে যান এবং ১৭ দিন সেই থানায় রেখে অমানুষিক নির্যাতন করে রাষ্ট্র দোহিতার মামলা দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেন । দেড়মাস পর নির্যাতনের ফলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারের হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় । হাসপাতালে ভর্তির ৭ দিন পর অসিত সরকার সজল, মানু মজুমদার , বজলুল রহমানসহ ৩ জনকে কারাগারের মূল ফটক থেকে চোখে কালো কাপড় বেঁধে সামরিক গোয়েন্দা অধিদপ্তরে নিয়ে যান এবং সেদিনেই তাদের উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন । তারপর আবার দীর্ঘ দিন অমানুষিক নির্যাতনের পূনরায় জেলখানায় নেয়া হয় ।

১৯৭৭ সালে ১ নং সামরিক আদালত গণভবনে স্থাপন করা হয়। সেই সামরিক আদালতে অসিত সরকার সজল,মানু মজুমদার, বজলুল রহমানসহ ৩ জনকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয় । কিন্তু বয়স বিবেচনায় তাদের কে সরাসরি মৃত্যুদন্ড প্রদান না করে যাবত জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়। শুরু হয় দীর্ঘ কারা জীবন । জননেত্রী শেখ হাসিনা অসিত সরকার সজল,মানু মজুমদার, বজলুল রহমান, মোহাম্মদ নাসিমকে দেখতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যান এবং সেখানে তিনি তাদের মুক্তির ব্যাপারে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করার আশ্বাস দেন । এটি ছিল তাদের জীবনে চরম প্রাপ্তি । সেই ধারাবাহিকতায় মমতাময়ী জননেত্রী শেখ হাসিনার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় জেলের হিসেব মতে দীর্ঘ ১৩ বছর আট মাস কারাভোগের পর তাঁরা মুক্তি লাভ করেন । কারাগেইটে মুক্তি লাভের পর ছাত্র লীগের সভাপতি ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক খ ম জাহাঙ্গীর সহ অন্যান্য নেত্রীবৃন্দ তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নিয়ে যান। সেখান থেকে সকল নেত্রীবৃন্দকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়ে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন । কারাগার থেকে মুক্তির কিছুদিন পর ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিন্যু আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যলয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অসিত সরকার সজল, মানু মজুমদার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য পদ লাভ করেন এবং সেদিনই ওবায়দুল কাদের, ডাঃ: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, খ ম জাহাঙ্গীর, মমতাজ উদ্দিন ও জালাল উদ্দিন রুমি প্রাথমিক সদস্য পদ লাভ করেন ।

আবারো অসিত সরকার সজল তার জন্ম স্থান প্রাণের শহর নেত্রকোনা ফিরে যান এবং ১৯৮৫ সালে জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নেতা এড ফজলুল রহমান খান অসিত সরকার সজলকে জেলার প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পণ করেন । ২০১৮ সালে নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও জননেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিবেচনায় অসিত সরকার সজলকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত করা হয় । এছাড়াও তিনি ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর সঙ্গী হয়ে আমেরিকা যান এবং জাতি সংঘের অধিবেশনে যোগদান করেন। জীবনে বহুবার শেখ হাসিনার ৩২ নম্বর বাড়ি়টি থেকে তার সান্নিধ্য অর্জন করেছেন । অসিত সরকার সজলের জীবনের শেষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো একদিন অস্ত্র হাতে যে দেশ স্বাধীন করেছিলেন সেই দেশ মাতৃকার সেবায় নিয়েজিত থাকা। তিনি স্বপ্ন দেখেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার চিরচেনা নেত্রকোনাকে জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এনে সেখানকার মানুষের পাশে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দাঁড়ানোর ।

এক সাক্ষাতকারে অসিত সরকার সজল বলেন, সারাবিশ্বে করোনা ভাইরাস আজ মহামারী আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন জনপদ আক্রান্ত হচ্ছে।মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়েছে এই ঘাতক করোনা ভাইরাসে। আমাদের প্রবাসী ভাইদেরকে বাহক করে আমাদর দেশে প্রবেশ ঘটে এই মরণ ঘাতকের। ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে আমাদের মানোনীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অফিস- আদালত বন্ধ ঘোষণা করেন তিনি। দেশের সকল নাগরিকদের ঘরে থাকার নির্দেশনা দেন এবং এদেশের গরীব খেটে খাওয়া মানুষের কথা চিন্তা করে জনপ্রশাসনকে খাদ্য সামগ্রী ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি এমপি-মন্ত্রীদের জনগণের পাশে থাকার নির্দেশ দেন। জনপ্রশাসনকে সহায়তা করতে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন। এই বিপর্যয়ের সময় পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নিরলসভাবে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে জননেত্রী শেখ হাসিনা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, আসুন আমরা তার নির্দেশনা মেনে চলি। তাঁকে সহযোগিতা করি, তাঁর হাতকে শক্তিশালী করি।

এআইআ/এইচি

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: