বিরল ভালোবাসা

বঙ্গবন্ধুর জন্য এক বছর রোজা রাখেন সোবাহান

   
প্রকাশিত: ১০:০১ পূর্বাহ্ণ, ৫ মার্চ ২০২০

কুদ্দুস বিশ্বাস, কুড়িগ্রাম: আব্দুস সোবাহান। বয়স ৯০-এর ঘরে। তরুণ বয়স থেকে আজও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য কেঁদে বুক ভাসান তিনি। নামাজ পড়ে বঙ্গবন্ধুর জন্য, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের জন্য দোয়া করেন। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার যেন কেউ ক্ষতি করতে না পারে সে জন্য মোনাজাত করেন আল্লাহর দরবারে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি তাঁকে জীবিত ফিরে পাওয়ার জন্য টানা এক বছর রোজা রাখার নিয়ত করে তা পালন করেন। এই সোবাহানের বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ বিচ্ছিন্ন দুর্গম চরজনপদে।

সম্প্রতি সোবাহানের কাহিনি জানতে বাড়িতে গেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার দূরে মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের বড়বেড় চরে বাড়ি খুঁজে দুপুরের দিকে দেখা মিলল আব্দুস সোবাহানের। তাঁর স্ত্রী জয়গন বেগম মারা গেছেন বছর দুয়েক আগে। ছয় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলের মধ্যে একজন গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে থাকেন। আরেক ছেলে চরেই বসবাস করেন। এ ছেলের ঘরেই সোবাহানের খাবারদাবার হয়। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঘটনাবলি জানতে চাইলে এ প্রতিনিধিকে প্রতিবেশী স্কুল শিক্ষক শহীদুল্লাহ হকের বাড়িতে বসতে দেওয়া হয়।

আব্দুস সোবাহান বলতে শুরু করেন—‘আমি লেহাপড়া জানি না। বাবার সংসারের ক্ষেত-খামারে কাজ করি। যুদ্ধের সময় আমার বয়স ৩০-এর মতো হবে। তখন আমি নিয়মিত রেডিও শুনতাম। ক্ষেত-খামারে গেলেও সঙ্গে রেডিও নিয়ে যেতাম। রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতাম। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধু যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তা শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। তাঁর প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেয়।’

আব্দুস সোবাহান বলেন, ‘২৫ মার্চ কাল রাতে পাকিস্তানি সেনারা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার খবর সর্বপ্রথম রেডিওতে শুনতে পাই। জোহরের নামাজের পর দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে আল্লাহর দরবারে হাত উঠালাম, ‘বঙ্গবন্ধুর কোনো ক্ষতি তুমি হতে দিও না। তাঁকে সুস্থ অবস্থায় দেশে ফেরার ব্যবস্থা করো। এ জন্য তোমার কাছে আমি ওয়াদা করছি, পুরো এক বছর রোজা করব আমি। পরদিন থেকে আমি রোজা থাকতে শুরু করলাম। তখন ছিল চৈত্র মাস। আরেক চৈত্র মাস এলে আমি রোজা থাকা বন্ধ করি। মাঝে দুই ঈদে রোজা থাকা হয়নি।’

‘বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর এত খুশি হয়েছিলাম, যা আমি প্রকাশ করতে পারব না। মনে মনে ভাবছিলাম, মহান আল্লাহ আমার কথা শুনেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফেরেন তখনো আমার রোজা এক বছর পূরণ হয়নি। বাকিগুলো শেষ করে বছর পূর্ণ করি।’ তিনি জানান, দীর্ঘ ১২ মাস রোজা করতে সমস্যাও হয়েছিল অনেক। বউ রোজা থাকতে দিতে চাইতেন না। এ কারণে অনেক সময় সাহিরর খাবার থাকত না। সাহির না খেয়েই রোজা থাকতেন তিনি।

দেশে তো তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, আপনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি কেন—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি তখন অসুস্থ ছিলাম। যুদ্ধে না গেলেও আমি মুক্তিবাহিনীদের জন্য অনেক সহযোগিতা করেছি, রান্না করে খাবার নিয়ে দিয়েছি। আমাদের চরে মুক্তিবাহিনীদের সাতটি ক্যাম্প ছিল। এর মধ্যে তিনটি ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীদের নিয়মিত খাবার দিয়েছি আমি। বড়বেড় চরের ইসহাক সরকারের বাড়িতে, সন্ন্যাসীকান্দি কাচারি স্কুলে ও আব্দুল হাইয়ের বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। আমি বাড়িতে রান্না করে ওই তিন ক্যাম্পে খাবার নিয়ে যেতাম। ওই সময় আমাদের অবস্থা সচ্ছল ছিল। নিজেদের পুকুরের মাছ ধরে মুক্তিবাহিনীদের জন্য রান্না করেছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরদিন বাবাকে বলে-কইয়ে গোয়ালের একটা গরু জবাই দিয়ে চরের মানুষকে খাইয়েছি। এ সময় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের জন্য মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার খবরও প্রথমে শুনতে পাই রেডিওতে। এটা শোনার পর আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। দুই দিন বিছানা থেকে উঠতে পারিনি। যে মানুষটা নিজের জন্য না ভেবে, নিজের পরিবারের কথা চিন্তা না করে সারাক্ষণ দেশের মানুষের জন্য ভেবেছেন, হাজারো জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন, তাঁকে আমার দেশেরই কিছু লোভী-বিশ্বাসঘাতক খুন করল। আমি এক ধরনের পাগল হয়ে যাই। এদিকে বারবার ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের ফলে জমাজমি, ভিটামাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাই। এর পরও প্রতিবছর ১৫ই আগস্ট আমি বাড়িতে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে বঙ্গবন্ধুর জন্য, তাঁর পরিবারের জন্য এবং বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া-মোনাজাত করি। যত দিন বেঁচে থাকব, তত দিন ১৫ই আগস্ট দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেই যাব।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে তো কাছ থেকে দেখতে পারিনি। কিন্তু তাঁর কন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুব কাছ থেকে যদি একবার দেখতে পারতাম, তাহলে শান্তি পেতাম। এটা আমার ইচ্ছা ও আশা।’

এলাকাবাসীও জানালেন বঙ্গবন্ধুর জন্য তাঁর ভালোবাসার কথা বড়বেড় চরের বাসিন্দা নুর হোসেন (৬৮) বলেন, ‘সোবাহান বঙ্গবন্ধুর জন্য ১২ মাস রোজা করেছেন, এটা আমরা সবাই জানি।’ মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম (৭৪), মমতাজুর রহমান (৭৯) জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরদিন সোবাহানের বাড়িতে চরের সব মানুষকে দাওয়াত খাইয়ে বঙ্গবন্ধুর সুস্থতা কামনা করে দোয়াও করা হয়েছিল। চরের ইউপি মেম্বার নুরুল হক বলেন, ‘আমরাও সোবাহানের গল্প শুনেছি বড়দের কাছ থেকে।’ চরের মুক্তিযোদ্ধা নুরন্নবী হোসেন বলেন, ‘সোবাহান মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে খাবারও দিতেন। আমরা তাঁকে ভাত খাইতে বললে তিনি না খেয়ে বলতেন আমি রোজা আছি।’

রাজীবপুর মডেল সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিম উদ্দিন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর প্রতি সোবাহানের ওই বিরল ভালোবাসার গল্পটি জানতে পারি দুই বছর আগে।’ চরনেওয়াজী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শহীদুল্লাহ হক বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি রংপুর কার মাইকেল কলেজে লেখাপড়া করি। ওই সময়ই জানতাম বঙ্গবন্ধুর জন্য সোবাহান রোজা করছেন।’ সূত্র: কালেরকন্ঠ।

এমআর/এনই

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: