প্রচ্ছদ / খোলা কলাম / বিস্তারিত

বিধ্বস্ত বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা

   
প্রকাশিত: ৮:২৫ অপরাহ্ণ, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

রেজাউল করিম: কোভিড-১৯ অর্থাৎ করোনা ভাইরাস সংক্রমণে পুরো বিশ্ব আজ থেমে আছে। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হলেও বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এটি একটি মহামারী। দেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ এবং করোনয় প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। ২৫ মার্চ প্রথমবারের মতো রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানায়, বাংলাদেশে সীমত পরিসরে ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিকভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে সেই সংক্রমণ দাঁড়িয়েছে সোয়া তিন লাখের ওপরে। মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিয়েছে দেশে সাড়ে চার হাজার মানুষ। সংক্রমণ রোধে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিভাগও বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের নির্দেশনা মেনে ধীরে-ধীরে গণপরিবহন থেকে শুরু করে দেশের অধিকাংশ বিভাগের কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে থাকে। বর্তমানে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমটাই বন্ধ আছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখাটা যেমন যৌক্তিক, স্বাস্থবিধি না মেনে সবকিছু স্বাভাবিক রেখে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার যুক্তিও যথেষ্ট নয় বলে কেউ কেউ সমালোচনা করছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন করোনা সংক্রমনে শিশুদের ঝুঁকি কমেছে ঠিক উল্টো দিকে ভাবলে দেখা যায় জাতি ক্রমশ মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বিধ্বস্ত হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাখাত।

করোনা দেশের অধিকাংশ মানুষকে কর্মহীন করে তোলে। করোনাকালে সরকারি চাকরীজীবি ছাড়া হাতেগোনা কিছু বিভাগের কর্মচারীরা মাস শেষে বেতন পাচ্ছেন। যেকোন দুর্যোগের সময় দারিদ্ররা অসহায় হয়ে পড়েন। কিন্তু করোনাকালে যারা কর্মহীন তারাই অসহায় হয়ে পড়েছেন। ছয় মাসের করোনা মহামারীতে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষগুলো সরকারি সহযোগিতা পেয়েছেন। সরকারি চাকুরীজিবিরা নিয়মিত বেতন পেয়েছেন। শুধু উপার্জনহীন হয়ে পড়েন বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা। দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত কর্মহীন শিক্ষিত সমাজ আজ সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন।

লেখাপড়া শেষে চাকরীর জন্য বারবার চেষ্টা করেও চাকরী না পাওয়া মানুষগুলো সমাজের শিক্ষিত বেকার নামে পরিচিত। সর্বোচ্চ সার্টিফিকেট নিয়েও অনেক সময় লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পেরে হতাশায় থাকেন এরা। নিজে ও পরিবারকে বাঁচাতে ডুকে যান খন্ডকালীন পেশা টিউশনিতে। অনেকে দু-চারটা টিউশনির পয়শা দিয়ে চাকরীর আবেদন করার খরচ জোগায়। সমাজের মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়ালেখার খরচ চালাতেই টিউশনীতে ডুকে পড়েন। কেউ কেউ লম্বা সময় চেষ্টার পর চাকরীতে সুযোগ না পেয়ে শিক্ষা সহায়ক প্রতিষ্ঠান কোচিং সেন্টার বা কিন্ডার গার্টেনের উদ্যোক্তা হন। অনেকে বিনিয়োগ করতে না পেরে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরা অধিকাংশই উচ্চ শিক্ষিত। অথচ করোনাকালে কর্মহীন হয়ে এরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

দেশের এই বিশাল শিক্ষিত বেকার গোষ্ঠি তিনটি স্তরে কাজ করতেন। প্রথমত প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়) দ্বিতীয়ত কিন্ডার গার্টেন (কেজি স্কুল), তৃতীয়ত কোচিং সেন্টার। সমাজে এরা এমনিতেই বেকার হিসেবে পরিচিত। বেসরকারি স্কুলগুলোকে সরকার বই-খাতা, সনদ দিয়ে প্রাথমিকভাবে অনুমতি দিয়ে থাকেন। এছাড়া কোচিংগুলোর উপর কখনও সরকার চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। অতএব এটি শিক্ষা শক্তিশালী একটি অংশ। তারপরও সবসময় এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন চাপে থাকে। এসব শিক্ষকরা শিক্ষাদানে একদিকে সরকারকে সহযোগিতা করছেন অন্যদিকে বেকারত্ব দূর করছেন। এদের পাশে সরকারের সহযোগিতা থাকাটা জরুরী। অথচ করোনাকালে দেশে অন্যান্য পেশার কর্মহীনদের পাশে সরকার হাত বাড়ালেও বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের পাশে সরকারি কোন সহযোগিতা দেখা যায়নি। বেসরকারি শিক্ষকতা একমাত্র পেশা যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে পরীক্ষার সময় সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে দেশের অসংখ্য শিক্ষককে মাসব্যাপী বেকার রাখা হয়। প্রশ্ন ফাঁস করা অভিযুক্ত শিক্ষক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে বের করার কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়না। অথচ দেশের অন্য সব পেশায় একমাত্র অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই আইনের আওতায় আনা হয়।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যাদের নুন্যতম সাধ্য আছে তারা তাদের সন্তানদেরকে বেসরকারি স্কুলে পড়াচ্ছেন। সরকারি বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে যাদের সন্তান বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। এমনকি অনেক সরকারি শিক্ষকদের সন্তানও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভালো কিছু পেয়েই এসব প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকছে শিক্ষর্থীরা। এটা শিক্ষার মান উন্নয়ন ও জাতির অগ্রগতিতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার বা অন্য কোন সংস্থার আর্থিক সহযোগীতা ছাড়া সম্পূর্ণ ব্যক্তি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত। যার সংখ্যা সরকার গঠিত ট্রাক্সফোর্সের আনুমানিক পরিসংখ্যান ৬০,০০০ (ষাট হাজার) প্রকৃতপক্ষে এর সংখ্যা আরো অনেক বেশী। সরকারি, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি এই ব্যক্তি মালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সকল শ্রেণির প্রায় ১ কোটি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে, সেই সাথে নিজ উদ্যোগে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে বেকারত্ব নিরশন সরকারের বিরাট একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কষ্টে জীবিকা নির্বাহের পরও দাবী আদায়ের জন্য বা শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলন করে সরকার তথা জনগনকে বেকায়দায় ফেলেনি।

বর্তমানে করোনাকালে এসব শিক্ষিত কর্মহীনদের পাশে না দাঁড়ালে মানুষ শিক্ষিত হওয়ার ইচ্ছেটাই হারাবে। গত ১৬ মার্চ সরকারে নির্দেশে হঠাৎ করে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হল। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সকল বেসরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি কিন্ডার গার্টেনগুলো বন্ধ হল। অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাড়া-বাড়িতে রয়েছে। ৯৯ ভাগ কিন্ডার গার্টেন ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম চালায়। আয়ের ৪০ভাগ ঘড় ভাড়া, ৪০ ভাগ শিক্ষক শিক্ষিকা কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দের বেতন ভাতা, ১০ ভাগ পানি, বিদ্যুৎসহ প্রচারণায় খরচ হয়। ১০ শতাংশ থাকে উদ্যোক্তার। গত ৬ মাসে উদ্যোক্তা, শিক্ষক-কর্মচারী সবাই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানের ভাড়া পরিশোধ করতে না পেরে অধিকাংশ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিচ্ছেন। বিধ্বস্ত এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে হোঁচট খাবে দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত এসব শিক্ষিত সমাজ বেকার হয়ে সরকারের ঘাড়ে চেপে বসবে। অন্যদিকে এই বৃহৎ সংখ্যক শিক্ষার্থীদেরকে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হবে। অতএব শিক্ষা ও শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত এই বৃহৎ গোষ্ঠিকে বাঁচাতে এই সংকট নিরসনে বেসরকারি শিক্ষকেদের পাশে সরকারের দাঁড়ানোটা জরুরী।

লেখক: শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী ও সাহিত্যিক।

(খোলা কলামে প্রকাশিত সব লেখা একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সাথে পত্রিকার কোন সম্পর্ক নেই)

এআইআর/ডিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: