প্রচ্ছদ / সারাবিশ্ব / বিস্তারিত

বিশ্বের সাতশ কোটি মানুষের কাছে কীভাবে কোভিডের প্রতিষেধক টিকা পৌঁছানো হবে?

   
প্রকাশিত: ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ, ১৫ আগস্ট ২০২০

বিশ্বজুড়ে চলছে করোনা তাণ্ডব। বিশ্বের প্রত্যেক দেশেই আঘাত করেছে এই ভয়ঙ্কর ভাইরাস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি দল কোভিড-১৯র কার্যকর প্রতিষেধক টিকা তৈরির জন্য কাজ করছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ‘এটা আমাদের জীবদ্দশায় সবচেয়ে জরুরিকালীন যৌথ একটি উদ্যোগ।’ কিন্তু একটা সফল ফর্মূলা যেটি সব পরীক্ষায় জয়ী হবে সেটা বের করা যেমন উন্নত প্রযুক্তি বিশারদ বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি বিশ্বব্যাপী সাতশ কোটির ওপর মানুষের কাছে এই টিকা কীভাবে পৌঁছে দেয়া যাবে সেটাও একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি বাংলা এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটেনে টিকা উৎপাদনের প্রধান কাজটি হচ্ছে অক্সফোর্ডশায়ার এলাকার সাবেক একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে হারওয়েল সায়েন্স ক্যাম্পাসে। এটিকে যুক্তরাজ্যের টিকা প্রস্তুত ও উদ্ভাবন কেন্দ্র (ভ্যাকসিন ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার- ভিএমআইসি) হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছে। কোভিড-১৯এর কারণে এই কেন্দ্রের পরিকল্পনা কর্মসূচি আরও ত্বরান্বিত করা হয়েছে। “আগের সময়সূচি অনুযায়ী আমরা ২০২২এর শেষ নাগাদ ভ্যাকসিন উৎপাদনের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। এখন আমরা ২০২১ সালে এটি অনলাইনে ছাড়তে পারব বলে আশা করছি,” ব্যাখ্যা করেছেন ভিএমআইসি-র প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ ডাচারস্।

‘অনেকটা কেক বানানোর মত’
মি. ডাচারস্ তার গরমের ছুটি বাতিল করে দিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন, কারণ তিনি জানেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন এই কেন্দ্র গণহারে উৎপাদনে সফল হবে। তিনি গবেষক দলের সাথে সবসময় যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলছেন এটা বিশাল একটা দায়িত্ব। “এধরনের সফল ও কার্যকর ভ্যাকসিন খুব দ্রুত এবং সঠিকভাবে উৎপাদন করার বিষয়টা শুধু ব্রিটেনের জন্য নয়, সারা পৃথিবীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ,” তিনি বলছেন। “এটার সাথে ঘরে কেক বানানোর তুলনা করা যায়। বাসায় বসে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নিয়ে আপনি এক্কেবারে নিখুঁত কেক বানানোর কৌশলটা রপ্ত করলেন। এবার আপনাকে দায়িত্ব দেয়া হল বাইরে গিয়ে ঠিক একইভাবে সাত কোটি কেক বানাতে হবে আর প্রতিটা কেক সমান নিখুঁত হতে হবে। বুঝতেই পারছেন চ্যালেঞ্জটা কীধরনের।” অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ইতোমধ্যেই তাদের নিজস্ব ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য ল্যাবরেটরির পরিসর সাময়িকভাবে যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িয়ে নিয়েছে, যদিও এখনও বিশ্বের অন্যান্য দেশে তাদের ভ্যাকসিনের যে ট্রায়াল চলছে তার ফল এখনও তারা জানে না। একটা সময়ে পুরো মানব জাতির জন্য কোভিড-১৯ এর বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিনের কয়েক বিলিয়ন ডোজে উৎপাদনের প্রয়োজন হবে। সেগুলোর উৎপাদন, সরবরাহ বা বিলিব্যবস্থা এবং তা দেবার ব্যবস্থা করতে হবে বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন দেশকে। ভ্যাকসিন বিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট, যার নাম গ্যাভি, তারা দেশগুলোকে এখন থেকেই টিকা কর্মসূচি বা তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতার বিষয়টা খুব সহজ হবে না। কারণ বেশ কিছু ধনী দেশ ইতোমধ্যেই ওষুধ প্রস্তুতকারকদের সাথে দ্বিপাক্ষিকভাবে চুক্তি করে ফেলেছে, যাতে ম্যাজিক ফর্মূলা পাওয়া গেলেই তাদের সরবরাহ নিশ্চিত হয়ে যায়।

স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠা
গ্যাভি-র প্রধান নির্বাহী সেথ বার্কলে বলছেন তিনি সবচেয়ে বড় যে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেটা হল তথাকথিত “ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ”। “আমার মতে সব দেশকে এটা বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিবেচনা করতে হবে, এর একটা কারণ সেটাই হবে ন্যায়সঙ্গত, এছাড়াও এখানে স্বার্থের বিষয়টা জড়িয়ে আছে, সেটার উপরে উঠতে হবে,” তিনি বলছেন। “আপনার প্রতিবেশি দেশগুলো যদি ভাইরাসের খনি হয়, সেখানে যদি প্রচুর ভাইরাস ঘোরাফেরা করে, তাহলে তো আপনি স্বাভাবিক ব্যবসা বাণিজ্য, ভ্রমণ, মানুষের যাতায়াত এসব আবার শুরু করতে পারবেন না। এটা মাথায় রাখা খুবই প্রয়োজন। সবাই নিরাপদ না হলে আমিও নিরাপদ নই।” উন্নয়নশীল দেশগুলোও যাতে সঠিক ভ্যাকসিন পেতে পারে সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টাও মি. বার্কলেকে করতে হচ্ছে। তিনি বলছেন ভ্যাকসিন যখন বাজারে ছাড়া হবে তখন আনুষঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ আরও নানা বিষয় নিয়েও তাকে ভাবতে হচ্ছে, যেমন পৃথিবীতে যথেষ্ট কাঁচের ভায়াল বা টিকা রাখার শিশি আছে কিনা। কারণে চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত উপযুক্ত কাঁচের উৎপাদনে সম্ভাব্য সংকটের কথাও খবরে এসেছে। “আমরা এটা নিয়েও উদ্বেগে রয়েছি,” স্বীকার করেছেন মি. বার্কলে, “তাই আমরা দুশ’ কোটি টিকার ডোজের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত ভায়াল কিনে রেখেছি। আমরা ২০২১-এর মধ্যে এই পরিমাণ টিকা প্রস্তুত করে ফেলতে পারব বলে আশা রাখছি।” কাঁচের ভায়াল নিয়ে সম্ভাব্য সংকটই একমাত্র সমস্যা নয়, ফ্রিজ নিয়েও সমস্যা রয়েছে। কারণ অধিকাংশ ভ্যাকসিনই নিচু তাপমাত্রায় মজুত রাখতে হবে।

ঠাণ্ডা তাপমাত্রায় রাখার চ্যালেঞ্জ
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বর্তমানে ফ্রিজে ঔষধ মজুত রাখার যে সক্ষমতা আছে তা কীভাবে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে গ্যাভির মত সংস্থাগুলোকে পরামর্শ ও সাহায্য দিচ্ছেন ঠাণ্ডায় ঔষধ সামগ্রী মজুত রাখা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, ব্রিটেনের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টোবি পিটার্স। তিনি বলছেন: “শুধু ভ্যাকসিন মজুত রাখার জন্য ফ্রিজ থাকলেই হবে না, এই টিকা কার্যকর রাখতে সবসময় সেটার সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে। যেমন টিকার চালান বিমানে তোলার জন্য যে পরিবহন ট্রলি ব্যবহার করা হবে তার তাপমাত্রা, স্থানীয় ঔষধ গুদামে সরবরাহ পৌঁছনর জন্য যে গাড়ি ব্যবহার করা হবে তার তাপমাত্রা, এরপর আছে পাড়ায় পাড়ায় সেগুলো সরবরাহের জন্য যে যানবাহন ব্যবহার করা হবে বা যে ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেখানে সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা – সবকিছু সঠিক এবং নিখুঁতভাবে কাজ করতে হবে।” বিশ্বের বড় বড় খাদ্য ও পানীয় সংস্থাগুলো যারা বিশ্বব্যাপী ব্যবসা করে, তারা তাদের পণ্য সরবরাহ চেইনে যে হিমঘর ব্যবস্থা ব্যবহার করে তা এই বিশাল প্রকল্পের কাজে ব্যবহার করার জন্য ধার নেয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন অধ্যাপক পিটার্স।
এই টিকা যখন বাজারে ছাড়া হবে তখন তার জটিল ব্যবস্থাপনার অংশ হিসাবে দেশগুলোকেও ভাবতে হবে জনগোষ্ঠীর কোন্ অংশকে তারা টিকা দেবার ব্যাপারে অগ্রাধিকা দেবে। এসব ভাবনা আগেভাগেই শুরু করতে হবে।

লাইনের প্রথমদিকে কারা থাকবে?
যুক্তরাজ্যের ওয়েলকম ট্রাস্টের ভ্যাকসিন বিভাগের প্রধান ড. চার্লি ওয়েলার বলছেন দেশগুলোকে বেশ কিছু প্রশ্ন খোলাখুলিভাবে সামনে আনতে হবে। “এই টিকা কাদের বেশি প্রয়োজন? সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী কারা? কাদের সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে? কারণ এটা একেবারে স্পষ্ট যে প্রাথমিকভাবে টিকার চাহিদার তুলনায় সরবরাহের সম্ভাবনা থাকবে কম। কাজেই টিকাদান প্রক্রিয়ায় বাছাইয়ের প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী হবে আর সে কারণেই এসব প্রশ্নের উত্তর বিবেচনায় রাখা খুবই জরুরি।” এমনকী টিকা দেবার ব্যাপারটাও জটিল হবে। যেমন, ব্রিটেন ভোটের সময় যে ভোটদান কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে থাকে, সেই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ব্রিটেন গণহারে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার কথা বিবেচনা করছে। কিন্তু একই মডেল পৃথিবীর অনেক দেশেই হয়ত কাজ করবে না। এই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে – অর্থাৎ গণ-টিকাদান কীভাবে হবে। ড. ওয়েলার জোর দিয়ে বলছেন একটা শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এজন্য অপরিহার্য হবে। যে জনগোষ্ঠীকে প্রতিষেধক টিকা দেয়া হবে, তাদের এই টিকা দেবার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও দক্ষতা স্বাস্থ্য কর্মীদের থাকতে হবে। বিজ্ঞানীরা সবাই বলছেন কোন একটা ভ্যাকসিন অবশ্যই পাওয়া যাবে। তবে তাদের অনেকেই স্বীকার করছেন পৃথিবীর কয়েকশ কোটি মানুষকে সফলভাবে এই টিকা দেবার ব্যবস্থায় যে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা কীভাবে মোকাবেলা করা হবে সে ভাবনা তাদের অনেকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

আরএএস/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: