বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: আইন লঙ্ঘন করলেও রহস্যজনক ছাড়

   
প্রকাশিত: ৫:৫৩ অপরাহ্ণ, ২০ আগস্ট ২০২০

স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে উদাসীন শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বারবার আলটিমেটাম দেয়ার পরও তা প্রতিপালনে ব্যর্থ এসব প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি হিসেবে পৌনে তিন বছর আগে শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি বন্ধ করে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে আজও সে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এ সংক্রান্ত বৈঠক এখন পর্যন্ত ডাকা হয়নি। এছাড়া এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ ও অনুষদ খোলার অনুমোদন বন্ধ এবং সমাবর্তন আয়োজনের অনুমতি স্থগিত রাখার অবস্থান থেকেও সরে আসা হয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি বারবার অবহিত করে যাচ্ছে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সাময়িক সনদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। স্থায়ী ক্যাম্পাসেও এগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করছে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপরি স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেছে। কিছু আংশিক গেছে। স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়া ও ক্যাম্পাস নির্মাণের কোনো উদ্যোগ না নেয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছে সরকার। এগুলোর মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ৯৬টি। ১৯৯২ সালে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ শুরু হয়। ২০১০ সালের আগের আইনে ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে ২০১০ সাল থেকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে কয়েকদফা আলটিমেটাম বেঁধে দেয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে সময় বেঁধে দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তখন বলা হয়েছিল- যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এ নির্দেশ পালন করতে পারবে না সেগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দেয়া হবে।

নাম প্রকাশ না করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থায়ী ক্যাম্পাসে পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু না করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ থাকার কথা। আলটিমেটাম প্রতিপালনে ব্যর্থতার দায়ে এর আগে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ ও অনুষদ অনুমোদন এবং সমাবর্তন আয়োজনের অনুমতি বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে রহস্যজনক কারণে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে।’ জানতে চাইলে ইউজিসি পরিচালক (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) ড. মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু করেছে। যেগুলো যেতে পারেনি সেগুলোর ব্যাপারে কমিটি কাজ করছে। নতুন করে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম মূল্যায়নে আরেকটি কমিটি করা হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক, পুরনো ৫২টির মধ্যে কয়েকটি জায়গা জমি পর্যন্ত কেনেনি। কিছু আংশিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকারের সর্বশেষ বেঁধে দেয়া সময়ের পর এগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ থাকার কথা ছিল। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে কমিটি কাজ করছে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠার সাত বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে হয়। কিন্তু যেগুলোর প্রতিষ্ঠার বয়স সাত বছর হয়েছে সেগুলোর প্রতিষ্ঠাকালীন শর্তগুলো বিদ্যমান থাকলে এবং ক্যাম্পাস নির্মাণ কার্যক্রমের অগ্রগতি সন্তোষজনক থাকলে আবেদনের ভিত্তিতে সাময়িক সনদের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর নির্দেশনা আইনে আছে। এ ধরনের ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তিনটির স্থায়ী ক্যাম্পাস আছে। সাতটি সাময়িক সনদের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছে। এখন পরিদর্শন করে পরবর্তী সিদ্ধান্তের সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’ শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজে (বিওটি) বর্তমান সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা আছেন। তাদের কেউ কেউ অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। এ কারণে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিব্রত হন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে আইনের আওতায় আনতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জরুরি বলে মনে করেন মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, ৫২টির মধ্যে মাত্র ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেছে। এছাড়া করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেছে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ও ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি। ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের আলটিমেটাম লঙ্ঘন করছে। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখার কথা। অন্যদিকে ২০১২-২০১৩ সালে ২৬টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ১৬টির বয়স সাত বছর পার হয়েছে। ১৬টির মধ্যে কেবল নটর ডেম, বিজিএমইএ এবং হামদর্দ ইউনিভার্সিটি স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বাকি ১০টির মধ্যেও দু’একটি স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চালাচ্ছে। জানা গেছে, ২০০০ সালের ২১ মার্চ ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অনুমোদন পায়। এটি বনানী ও গ্রিন রোডে ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে এবং বাড্ডায় স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করছে। দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ অনুমোদন পায় ১৯৯৬ সালের ১৬ মে। প্রতিষ্ঠার ২৩ বছরেও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি। মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অনুমোদন পায় ২০০১ সালের ১৩ মার্চ। এটি বিরুলিয়ায় স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কথা বললেও ঢাকায় একাধিক স্থানে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ অনুমোদন পায় ২০০১ সালের ৫ ডিসেম্বর। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করেনি। গত সেপ্টেম্বরে ইউজিসি প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিদের ডেকেছিল। কিন্তু সদুত্তর দিতে পারেনি। এক সময়ে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ থেকে মুক্ত প্রাইম ইউনিভার্সিটি মিরপুরে স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়লেও আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জমি নেই। এছাড়া স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়া কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অন্যত্র কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ আছে। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অনুমোদন পায় ২০০২ সালের ২৪ জানুয়ারি। বিশ্ববিদ্যালয়টি আশুলিয়ায় নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণ করলেও সেখানে পুরোপুরি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। রাজধানীর শুক্রাবাদে একাধিক ক্যাম্পাস আছে প্রতিষ্ঠানটির। চট্টগ্রামে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ২০০১ সালের ৫ ডিসেম্বর অনুমোদন পায়। বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রাম শহরে একাধিক ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সূত্র: যুগান্তর

আরএএস/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: