মন্ত্রীর গাড়িতে গ্রেনেড ছুঁড়েছিলেন এনায়েতুল্লাহ গামা

   
প্রকাশিত: ৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ, ৬ মার্চ ২০২০

এনায়েতুল হক। ১৯৬৯ সালে কুস্তিতে পূর্ব পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। রেসলিংয়ে ভালো করার কারণে সবাই তাকে গামা বলে ডাকতো। সেই থেকে এনায়েতুল হকের পরিচয় এখন গামা নামে। এনায়েতুল হক গামার বয়স ১৯৭১ সালে ছিল ১৯ বছর। তখন পড়তেন আজিমপুর নতুন পল্টন স্কুলে। তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। বাবার বদলির কারণে বিভিন্ন এলাকার স্কুলে পড়তে হয়েছে। তাই পড়ালেখায় ব্যত্যয় ঘটে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা সে বছর দেওয়া হয়নি। স্কুলের ছাত্রাবস্থায়ই উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন এনায়েত।

সে সময়ের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, আসাদ মারা যাওয়ার পর ঢাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল। একদিন মিছিল নিয়ে সচিবালয়ের ব্যারিকেড ভেঙে আমরা ভেতরে ঢুকে গেলাম। ভাঙচুর চালাচ্ছি, হঠাৎ দেখলাম ভবনের ওপর থেকে আর্মি গুলি চালাচ্ছে। দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলাম, এখন যেখানে ওসমানী উদ্যান সেদিকে। সেখানে তখন ইটের স্তূপ ছিল। দেখি একজনের পায়ে গুলি লেগেছে, দৌড়াতে পারছে না। তাকে ধরে সচিবালয়ের আর্মির দিকেই ফিরে এলাম। এমন সময় একটি অ্যাম্বুল্যান্স এলো। আমাদের নিয়ে গেল ঢাকা মেডিক্যালে। ওকে ভর্তি করার পর একজন ডাক্তার আমাকে দেখে কড়া ধমক দিলেন।

‘চুপচাপ বসে থাকতে বললেন, না হলে আর্মির হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দিলেন। সবার মধ্যেই তখন একটা মায়া ছিল দেশের জন্য। আমাকে সেভ করার জন্যই তিনি এটা করলেন। তাঁর ডিউটি শেষ হলে আমাকে হাসপাতাল থেকে বের করে অনেক দূর এগিয়ে দিলেন। এর পর থেকে সব রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই যোগ দিতাম। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের দিন একটি লাঠি নিয়ে সেই সকালেই পৌঁছে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তোমাদের যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। মনের মধ্যে প্রেরণা তো তখনই তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল এই একটা লোকের ওপর আস্থা রাখা যায়। জীবন দিয়ে দেওয়া যায়।’

যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি সম্পর্কে গামা বলেন, ‘২৫ মার্চ পাকিস্তানি আর্মির আক্রমণের পর ভয়ে ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে চলে যাই। আমাদের বাড়ির পাশের নদীর ওপারে যশোর। সেখান থেকে জানতে পারলাম যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, বাঙালি ইপিআর ও পুলিশ যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। ভাবতেছি কিছু তো করা দরকার। কিন্তু এলাকার ছেলেদের সঙ্গে তো জানাশোনা নেই, আমার পরিচয় হলো ঢাকার ছেলেদের সঙ্গে। তখনো প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালু হয়নি। ঠিক করলাম ঢাকায় চলে যাব, সেখান থেকে কোনো দলের সঙ্গে ভিড়ে ট্রেনিংয়ের জন্য ইন্ডিয়ায় চলে যাব। হাঁটাপথে রওয়ানা দিলাম। দুই দিন, এক রাত হেঁটে পদ্মার পারে পৌঁছালাম। ফরিদপুরের মহারাজপুরে এক হিন্দু বাড়িতে সে রাত কাটিয়েছিলাম। ওই বাড়ির মহিলা খুব আদর করে রুটি খাইয়েছিলেন। জীবনে এত সুন্দর কারুকাজময় রুটি খাইনি। তারপর পদ্মার পারেও এক রাত কাটালাম। পথে পথে আর্মির চেকিং ছিল। সেটা অ্যাভয়েড করার জন্য গ্রামের পথ দিয়ে হাঁটতাম। গ্রামের কৃষকরাই সহযোগিতা করেছিল। যখন রাস্তা নিরাপদ মনে করত তারা ইশারা দিত। এভাবে ঢাকায় ফিরলাম। আসার পর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য।’

মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গেরিলা দল তখন ঢাকায় ঢুকেছে। এই দলের টুআইসি (সেকেন্ড ইন কমান্ড) ছিল মাহবুব আহমেদ শহীদ। সে আমাদের বন্ধু, আমাদের মহল্লা লালবাগ এলাকার। কিন্তু ওকে আমরা সন্দেহ করতাম। ও মাদরাসায় পড়ে পরে কলেজ লাইনে এসেছে। আমরা ভাবতাম সে কোনো পাকিস্তানপন্থী দল করে। পাড়ায় আমরা যখন দল বেঁধে ব্যায়াম করতাম তখন শহীদ থাকলে আমরা দম নেওয়ার ছলে জামায়াতকে গালাগালি করতাম। ও খেপে যেত, বলত, ‘তোরা কি আমাকে সন্দেহ করিস?’ কিন্তু তার পরও ওকে আমরা বিশ্বাস করতাম না। বাড়ি ফেরার কিছুদিন পর শহীদ এসে আমার বাসায় খোঁজ করল। তাই ওকে দেখে ভয়ে বাসা ছেড়ে পালালাম। ভাবলাম, বাসায় যে ছিলাম না, ও কি সন্দেহ করছে যে ইন্ডিয়ায় গেছি কি না, ও কি ধরিয়ে দেবে! এরপর আমাদের আরেক বন্ধু নিজাম (নিজাম উদ্দিন আকন দুদু) এলো। সে জানাল, ১৭ মুক্তিযোদ্ধার প্রথম যে দল ঢাকায় এসেছে, শহীদ সেই দলের ডেপুটি কমান্ডার। এটা ছিল আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য। সে শহীদের বাসায় নিয়ে গেল। সব জেনে তাঁর সঙ্গে যোগ দিলাম। কমান্ডার শহীদের নেতৃত্বে লালবাগে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা দল গড়ে উঠল। সে কয়েকটা গ্রুপ করল। আমাদের গ্রুপে সাত-আটজন ছিলাম। অন্য দলে কারা ছিল, তা আমাদের জানতে দিত না। কিন্তু কোনো অপারেশনের জন্য প্রয়োজন পড়লে লোক দিত।

যুদ্ধের প্রশিক্ষণ সম্পর্কে গামা বলেন, ‘বাবা পুলিশ অফিসার হওয়ায় অস্ত্র সম্পর্কে একটা ধারণা তো আমার আগে থেকেই ছিল। বাবার রিভলবার ছিল। প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যেতে চাইলে শহীদ বলল, তোর যাওয়ার দরকার নেই। ঢাকার ছেলেদের সম্মুখযুদ্ধের দরকার নেই। আমাদের হবে ব্রেনের যুদ্ধ, গেরিলা যুদ্ধ।’

বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন গামা। এর মধ্যে নিজেই পরিচালনা করেছেন কয়েকটি অভিযান। এর একটি ছিল ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া। স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘বকশীবাজার বদরুননেসা মহিলা কলেজ এখন যেখানে, সেটি আগে ছিল ইডেন কলেজ ইন্টারমিডিয়েট শাখা। তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলছে। সিদ্ধান্ত হলো ত্রাস সৃষ্টি করে পরীক্ষা বন্ধ করে দিতে হবে। তবে এমনভাবে অপারেশন করতে হবে, যাতে ছাত্রীরা আহত না হয়। এই অপারেশনের জন্য বোমা তৈরি করলাম পিকে ও টিএনটি দিয়ে। শহীদ বলল, বোমায় স্প্লিন্টার দেওয়া যাবে না, যাতে কেউ আহত না হয়। দুধের কৌটা দিয়ে বোমা বানিয়ে অপারেশনে গেলাম। সঙ্গে আমার কমান্ডার শহীদ। ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্রাবাসের দিক থেকে রাস্তার ওই পাশে কলেজের ভেতরে বোমা ছুড়লাম। যে শব্দ হলো তাতে নিজেই থ হয়ে গেলাম। পালানোর কথা; কিন্তু আমি ঠায় দাঁড়িয়ে। শহীদ ডাক দিচ্ছে, আমি কিন্তু শুনছি না, দাঁড়িয়েই আছি। ও গালি দিয়ে উঠল, তখন সংবিৎ ফিরে পেয়ে পালালাম।’

সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী অপারেশন ছিল মন্ত্রীর গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটানো। সেদিনের স্মৃতিচারণ করে গামা বলেন, তখন আমরা সকালের নাশতা করতাম হোটেলে। একদিন লালাবাগের রেস্তোরাঁয় বসে সকালের নাশতা করছি, দেখি ফ্লাগ উঠিয়ে একটি গাড়ি আসছে, আগে-পেছনে আর্মির কঠোর পাহারা। নাশতা বাদ দিয়ে পেছন পেছন গেলাম। রাজা শ্রীনাথ স্ট্রিটে নেজামে ইসলামের অফিস ছিল। সেখানেই দেখলাম স্লোগান হচ্ছে, মিটিং হবে। জানা গেল, মন্ত্রীর নাম মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক, নেজামে ইসলামের নেতা। সিদ্ধান্ত নিলাম, অপারেশন চালাতে হবে। ছুটে গেলাম আবুলের (আবুল হোসেন, ১৭ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরার পথে বুড়িগঙ্গায় নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান) কাছে। তখন আমার অস্ত্রশস্ত্র ছিল আবুলের কাছে। আবুলের বাসা ছিল নিরাপদ। তার মামা ছিলেন বড় রাজাকার। আর আবুলের বড় ভাইয়ের ভালো মোটরসাইকেল ছিল। ও ভালো চালাতে পারত। দুজনই কাপড় বদলে পায়জামা-পাঞ্জাবি-টুপি পরে নিলাম, যাতে কেউ সন্দেহ না করে। বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য নেওয়া হলো গ্রেনেড-৩৬। আর নিরাপত্তার জন্য ফসফরাস-৭৭ বোমা। আমরা মিটিংয়ের কাছে গিয়ে সুবিধা করতে পারলাম না।

তিনি বলেন, তাই মন্ত্রীর ফেরার পথে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম লালবাগ চৌরাস্তার মোড়ে। কিন্তু সেখানে মন্ত্রীর গাড়ি আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরসহ জনতাকে পুলিশ সরিয়ে দিল। সুবিধা করা গেল না। এবার মোটরসাইকেল নিয়ে গাড়ির পেছন পেছন চললাম। চালাচ্ছে আবুল, পেছনে আমি। গ্রেনেডের স্প্রিং খুলে, লিভারটা ধরে আছি, সুযোগ পেলেই ছুড়ব। মন্ত্রীর গাড়ির পেছনে নেজামে ইসলামের কর্মীভর্তি জিপ, মন্ত্রীর মার্সিডিজ গাড়ির সামনে আর্মির গাড়ি। মেডিক্যাল কলেজের চৌরাস্তায় পৌঁছতেই জ্বলে উঠল ট্রাফিকের লালবাতি। মন্ত্রীর গাড়ির বাম ধারে একটি ট্রাক। অপ্রশস্ত রাস্তায় গাড়ি ঘেঁষে ঢুকে গেল আমাদের মোটরসাইকেল। আমি দ্রুত গাড়ির জানালার ফাঁক দিয়ে গ্রেনেড বোমা ছুড়ে দিয়ে বিদ্যুত্গতিতে উধাও। চার-পাঁচ সেকেন্ড পরই ঘটল বিস্ফোরণ।

ঘটনাটি ঘটে ১৯৭১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে। এপিপি পরিবেশিত খবর অনুসারে, কর্মিসভা শেষে মন্ত্রী সচিবালয়ে ফিরছিলেন। গাড়িতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে মন্ত্রী আহত হন। রক্তাক্ত অবস্থায় মন্ত্রীকে হাসপাতলে নেওয়া হয়। লালাবাগের মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলের আরো কয়েকটি অপারেশনেও ছিলেন গামা। এর মধ্যে রয়েছে লালবাগ রহমতউল্লাহ স্কুলে জামায়াতে ইসলামীর মিটিং বোমা মেরে পণ্ড করে দেওয়া। কমান্ডার শহীদের নেতৃত্বে ঢাকায় প্রথম গাড়িবোমা বিস্ফোরণের অপারেশনেও সঙ্গে ছিলেন গামা। চকবাজারের এক চেয়ারম্যানের বাসায় রাত ৩টায় ঢুকে একটি রিভলবার ছিনিয়ে এনেছিলেন। ১৪ ডিসেম্বর বসিলায় ঢাকার অন্যান্য দলের সঙ্গে মিলে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখসমরেও অংশ নিয়েছিলেন এনায়েতুল হক গামা।

এসএ/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: