প্রচ্ছদ / খোলা কলাম / বিস্তারিত

মাশরাফি বিতর্ক: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ

   
প্রকাশিত: ৬:৫১ অপরাহ্ণ, ১ মার্চ ২০২০

লিখেছেন সাংবাদিক রেদওয়ান শাওন: মাশরাফি ২১৭ ওয়ানডে ম্যাচ খেলে নিয়েছেন ২৬৬ উইকেট। ক্যাপ্টেন হিসেবে ৮৫ ম্যাচ খেলে জয় এনেছেন ৪৭ ম্যাচে, বিপরীতে ৩৬ পরাজয়। ২০১০তে পথ হারানো বাংলাদেশকে নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্স দিয়ে ট্র্যাকে এনেছেন। প্রতিটা খেলোয়াড়কে একসাথে করার চেষ্টা করেছেন। একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে সে সময় খেলোয়াড়দের পেছন থেকে পেম্পার করেছেন। ২০১৩ সাল থেকে মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের জয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন।

বাংলাদেশে মাশরাফি’র ভূমিকা আমরা বাইরে থাকা সাপোর্টাররা যতটা না বুঝি তার থেকে বেশি বোঝে মাঠে থাকা প্রতিটা খেলোয়াড়। ২০১৮ সালে টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ খালেদ মহিউদ্দিনের এক সাক্ষাৎকারে সাকিব আল হাসানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল টিমে ক্যাপ্টেন মাশরাফি’র অবদান সম্পর্কে। উত্তরে সাকিব বলেছিলেন, “তিনি দলে বাবা’র ভূমিকা পালন করেন। অভিজ্ঞতা, গেম প্ল্যান সব কিছুতেই তিনি আমাদের থেকে অভিজ্ঞ। তাই যেকোনো সমস্যায় আমরা তার কাছে যাই, তার সাথে সমস্যাগুলো আলোচনা করি। শুধু ক্রিকেট না, ব্যক্তিগত সমস্যাতেও আমরা তাকেই আগে খুঁজি। একটা ঘটনা বলি। আমি আর তামিম তখন একই ফ্ল্যাটে থাকতাম। আমাদের ফ্ল্যাটের নিচে কে যেন দু’টো গুলি করেছিল, তখন আমরা মাশরাফি ভাইকে আর পুলিশকে জানাই। তখন দেখলাম মাশরাফি ভাই পুলিশের আগে আমাদের বাসার নিচে চলে এসেছে। তো তিনি এমন।” মাশরাফি অবসরে গেলে সে জায়গায় কোনো শূন্যতা দেখা দেবে কি না প্রশ্নের উত্তরে সাকিব বলেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই। আসলে দেখেন শচিনের থেকে কেউ ভালো করলেও সে শচিন হতে পারবেনা। মাশরাফি ভাই আমাদের দলে সেভাবেই ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে যিনি আসবেন তিনিও হয়তো ভালো করবেন, কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় তো অবশ্যই মনে হবে “ইস তিনি থাকলে মনে হয় এই জায়গায় ভালো হতো।” শুধু সাকিব না, তামিম, মাহমুদুল্লাহ, মুশফিক, সৌম্য, সাব্বির, লিটন, তাসকিন, আশরাফুলসহ সবাই অসংখ্যবার অধিনায়ক মাশরাফির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। তাহলে কি শুধু ক্যাপ্টেন কোটায় মাশরাফি দলে জায়গা পেতেন?

বাংলাদেশ দলে একজন কোয়ালিটি সম্পন্ন বোলারের ঘাটতি প্রথম থেকেই। সেখানে রুবেল, রাজীব, তাসকিনদের আবির্ভাব হলেও নানা কারণে নিজেদের মেলে ধরতে পারেননি তারা। অন্তত তাদের থেকে ভালো পারফর্ম করে দলে টিকে ছিলেন মাশরাফি। ওয়ানডেতে ২০১৫ সাল থেকে যদি ধরা হয়, তাহলে বাংলাদেশের পেস অ্যাটাকের সবচেয়ে নিয়মিত মুখ মাশরাফি ও মুস্তাফিজ। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মুস্তাফিজ মোট উইকেট পেয়েছে ১০৭ টি। ওই সময়ে মাশরাফি’র উইকেট সংখ্যা ৮৩ টি। ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ফিজের বোলিং ইকোনোমি যথাক্রমে ৪.২৫, ৪.৮৬, ৫.৪৭, ৪.২০, ৬.৭৭। সেখানে মাশরাফি’র বোলিং ইকোনোমি যথাক্রমে ৫.২৪, ৪.৪৬, ৫.৭৫, ৪.৯১, ৫.৮২। ২০১৫ থেকে সর্বশেষ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত প্রথম ১০ ওভারে বল করা বিশ্বের সেরা ৫ বোলারদের মধ্য একজন ছিলেন মাশরাফি। তাহলে এখনও কি আমি বলতে পারি, মাশরাফি শুধু ক্যাপ্টেন কোটায় দলে ছিলেন?

এবার মাশরাফি’র একটা ভুল নিয়ে বলতে চাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আজকে মাশরাফি কে নিয়ে এতো নেগেটিভ কথা হওয়ার প্রধান কারণ মাশরাফি’র নির্বাচনে অংশগ্রহণ। এখানে অনেক মানুষ আছেন যারা ক্ষমতাসীন দলের হয়ে মাশরাফির নির্বাচন করাকে ভালোভাবে নিতে পারেননি। আবার মাশরাফি বাংলাদেশে এমন একটা ক্যারেক্টার যার সমালোচনা করলে সেটা ওই ব্যক্তির উপর নানাভাবে ‘নিজের পায়ে কুড়াল মারা’র মতো একটা অবস্থা হয়ে যেত। তাই ফর্মহীন মাশরাফিকে পেয়ে তারা সমালোচনার কোনো কমতি রাখেনি এটাও আমি শতভাগ নিশ্চিত। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ না করেই বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে খেলায় ফোকাস নষ্ট করে নির্বাচনে মনোযোগ দেয়াটা আমি মোটেও ভালোভাবে নেব না। কিন্তু নির্বাচনের পরও মাশরাফি ভালো খেলেছেন।

২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকে তিনি যেমন খেলেছেন ২০১৯ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত তেমনি ছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি মোট উইকেট পেয়েছেন ২৬ টি। যা তার ক্যরিয়ারে এক বছরে তৃতীয় সর্বোচ্চ! আজকে মাশরাফি’র ক্যারিয়ারে যারা আঙুল তুলছেন, এবং সোস্যাল মিডিয়ায় বলছেন, ‘কেন তিনি অবসরে যাচ্ছেন না?’ মাশরাফি কিন্তু বিশ্বকাপে যাওয়ার আগেও বোর্ড প্রেসিডেন্টের সাথে বিশ্বকাপের পর মোটামুটি নিজের অবসর নিয়ে কথা বলে গিয়েছিলেন (পাপনের কথায় বেশ কয়েকবার এসেছে)। এমনকি বিশ্বকাপের আগেও প্রেস কনফারেন্সে নিজের কথার মাধ্যমে বেশ কয়েকবার বুঝিয়েছেন টুর্নামেন্টের পরই হয়তো অবসরে যাচ্ছেন। কিন্তু হঠাৎ কেন সিদ্ধান্তে পরিবর্তন? দুঃখের হলেও সত্য এটা নিয়ে কাউকে প্রশ্ন করতে শুনিনি।

বিশ্বকাপের পর সাকিবের নেতৃত্বে একটা আন্দোলনে যায় দেশের ক্রিকেটাররা। সে আন্দোলনে ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মাশরাফিকে একবার জানানোর প্রয়োজন বোধ না করা কি মাশরাফি’র অভিমানের কারণ? নাকি বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে সাকিবের স্ত্রী শিশিরের সেই স্ট্যাটাস যেটি পুরো দলের একতা নষ্ট করতে যথেষ্ট ছিল? কোনটা? মাশরাফি যে ঘাড়ের রগটা বাঁকা করে চলতে জানে এটা নতুন কিছু না। নড়াইলের ডানপিটে ছেলে এই কৌশিক। সে এখন যা করছে, তা নিতান্তই জেদ ছাড়া আর কিছু না বলেই আমি মনে করি আপাতদৃষ্টিতে।

নিজেদের ইতিহাসে বিশ্বকাপে সবচেয়ে ভালো দল নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ বিশ্বকাপ শেষ করেছে ৮ নম্বর হয়ে! অন্তত সেই বাংলাদেশ সেমিফাইনাল খেলার যোগ্যতা রাখে এটা আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। কিন্তু দলীয় কোন্দল আমাদের এই দলটাকে শেষ করে দিয়েছে। আর এর শুরুটা কোথায় এটাও সবাই জানি। বিশ্বকাপে এক সাকিব ছাড়া পুরো দল ‘দুর্দান্ত’ বাজে খেলেছে। এর ভার অবশ্যই দলের অধিনায়কের। কিন্তু দল সব সময় খেলা দিয়ে হারে এটা মানার মতো বিজ্ঞ মানুষ আমি না। মাঠের বাইরের পরিবেশ যতটা সুন্দর থাকবে, মাঠে তত ভালো প্রতিফলন দেখতে পাই বলে আমি বিশ্বাস করি। কিছুটা পড়ালেখার পরিবেশের উপর পড়ালেখা নির্ভর করা এবং পড়ালেখার উপর রেজাল্ট নির্ভর করার মতো বিষয়। তাই বিশ্বকাপে খারাপ করার পেছনে মাশরাফি’র থেকে মাঠের বাইরের অবস্থা বেশী দায়ী বলে আমি মনে করি। এখন, কয়েকদিন থেকে সোস্যাল মিডিয়ায় ‘আনফিট’ মাশরাফি, আবেগ দিয়ে ক্রিকেট চলে না এমন অনেক কিছু চোখের সামনে আসছে। আমার জানা মতে, শুধু বাংলাদেশ না, বিশ্বের সব দেশেই আবেগ দিয়ে খেলাটা চলে।

তা না হলে লিভারপুলের এতো ভক্ত হতো না। দীর্ঘদিন ট্রফিলেস ম্যান ইউ’র এখনও এতো সমর্থক থাকত না। যেখানে খেলা আসে, সেখানে আবেগ আসবেই। আর এই আনফিট মাশরাফি খেলা শুরু করার ১ বছর পর থেকেই আনফিট। কিন্তু আনফিট থাকার পরও প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি আইপিএলে নিজের নাম লিখিয়েছেন। এই ‘ল্যাংড়া’ মাশরাফিই বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত দেশের সবার কাছে বিশ্বের সেরা অধিনায়ক ছিলেন। সকলের অনুপ্রেরণা ছিলেন। তাহলে তার অবসরের ব্যাপারে কেন এতো জ্বালাতন? গত ৭ মাসে মাশরাফি তো খেলেননি। যাদের জায়গাটা এই “ল্যাংড়া” লোক নিয়ে রেখেছে কি অবস্থা তাদের?? শ্রীলঙ্কা থেকে সর্বশেষ পাকিস্তান… কয়টা বোলার জন্ম হয়েছে?? উল্টো দেশের সবচেয়ে ভালো বোলারকে ফর্মহীনতায় জায়গা হারাতে দেখেছি। আপনি বাংলাদেশে থেকে যদি ভারতের মতো দুইদিন পর পর অজস্র বোলার বানানোর স্বপ্ন দেখলে আপনাকে গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়াতে বলবো। কারণ ২০০১ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত একটা “ল্যাংড়া” মাশরাফি’র মতোও বোলারের জন্ম দিতে পারেন নি।

প্রথম আলোয় আজ পড়লাম, “রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ‘দ্য প্যাট্রিয়ট’ কবিতাটি আপনিও পড়ে থাকবেন। একজন দেশপ্রেমিকের করুণ পরিণতির সে বর্ণনা আজ আপনার জীবনে কিছুটা হলেও সত্যি। ব্রাউনিংয়ের ‘প্যাট্রিয়ট’—এর মতো আপনিও একদিন ফুলে ফুলে আচ্ছাদিত পথ দিয়ে হেঁটেছেন। যশ-খ্যাতির পাগল করা সৌরভ আপনাকে বিমোহিত করেছে। আপনাকে অভিবাদন জানাতে এ দেশের ক্রিকেটে বেজেছে ঘণ্টাধ্বনি। কিন্তু আজ সেই ‘প্যাট্রিয়টে’র মতোই আপনার দু হাত অদৃশ্য পিছ মোড়ায় বাধা। তার কপালে বেয়ে আসা রক্ত আপনার বেলায় ঝরছে হৃদয় থেকে। পাথর খণ্ডের মতোই নির্দয় সব প্রশ্ন ছুটে যাচ্ছে আপনার দিকে। আপনার কান্না কেউ দেখতে পায় না। পার্থক্য শুধু একটি। ব্রাউনিংয়ের দেশপ্রেমিক পেয়েছিলেন তাঁর কৃতকর্মের ফল। আর আপনি শাস্তি পাচ্ছেন একজন খেলোয়াড় হিসেবে ন্যূনতম মর্যাদাটুকু চেয়ে। দুঃখিত মাশরাফি। আমাদের বোধ হয় আপনাকে সেটি দেওয়ারও সামর্থ্য নেই।”

ইয়েস, আবেগ আছে বলেই আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি, আবেগ না থাকলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের খেলায় আমি ভারতকে সাপোর্ট করতাম। অস্ট্রেলিয়ার সাথে আমি অস্ট্রেলিয়ার জন্য গলা ফাটাইতাম। আবেগ ছাড়া খেলা দেখা প্রত্যেকটা বাঙ্গালীর কাছে প্রশ্ন, “ক্রিকেটে কেন বাংলাদেশ কে সাপোর্ট করেন?” উত্তরে ‘নিজের দেশ বলে’ বলিয়েন না। তাহলেই কিন্তু আবেগী হয়ে গেলেন.. ধন্যবাদ।

(প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব)

এসএ/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: