গোল্ড মনিরের ৯৩০ কোটি টাকা লেনদেন, ২৫ ব্যাংক হিসাবে আছে ৫৪২ কোটি টাকা, বিএনপি-জামায়াতে অর্থায়নের সন্ধান, কিনেছেন বড় হাউজিং কোম্পানির শেয়ার, টাকা পাচারের অভিযোগ মালয়েশিয়ায়

ম্যানেজ করেই সম্পদের পাহাড়

   
প্রকাশিত: ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ, ২৪ নভেম্বর ২০২০

অপরাধ জগতের সম্রাট গোল্ড মনিরের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৯৩০ কোটি টাকা লেনদেনের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চার ব্যাংকের ২৫টি অ্যাকাউন্টে এসব টাকার খোঁজ মিলেছে। ওইসব অ্যাকাউন্টে ৫৪২ কোটি টাকা পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বিএনপি-জামায়াতে অর্থায়নের বিষয়টিও। এ ছাড়া তিনি কিনেছেন বড় হাউজিং কোম্পানির শেয়ার। মালয়েশিয়ায় তার বিরুদ্ধে টাকা পাচারেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছুদিন আগে গোল্ড মনির বিএনপি নেতা, সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মালয়েশিয়ায় পলাতক কাইয়ুমের মালিকানাধীন একটি হাউজিং কোম্পানির শেয়ার কিনে নেন। এরপর মানি লন্ডারিং করে কয়েক শ কোটি টাকা মালয়েশিয়ায় পাচার করে কাইয়ুমের কাছে পাঠিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিএনপি-জামায়াতে অর্থায়ন ছাড়াও বাস পোড়ানোসহ বিভিন্ন নাশকতায় গোল্ড মনিরের সংশ্লিষ্টতার খবর রয়েছে। পাশাপাশি বড় একটি হাউজিংয়ের পরিচালক পদ নেওয়ার বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে প্লট ও বাড়ি রয়েছে তার। বিএনপির হয়েও তিনি ক্ষমতাসীন নেতাদের ম্যানেজ করে জমি দখল, জাল জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং এবং সোনা চোরাচালানে লিপ্ত ছিলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, অল্প দিনে গোল্ড মনিরের এত সম্পদের মালিক হওয়ায় তারা হতবাক। এ যেন আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো, শূন্য থেকে কোটিপতি হওয়ার কাহিনি। তারা বলছেন, অবৈধ প্রভাব আর অনৈতিক কাজের মাধ্যমে একজন দোকান কর্মচারী কীভাবে হয়ে ওঠেন হাজার কোটি টাকার মালিক, তা গোল্ড মনির গ্রেফতার হওয়ার পর বের হয়ে আসছে একে একে। সূত্র জানান, গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত গোল্ড মনিরের চার ব্যাংকের ২৫টি অ্যাকাউন্টে ৯৩০ কোটি ২২ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১১০ কোটি টাকা ঋণও নিয়েছেন তিনি। যদিও গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) আয়কর রিটার্নে তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে মাত্র ২৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এ ছাড়া গত অর্থবছরে গোল্ড মনিরের বার্ষিক আয় ১ কোটি ৪ লাখ টাকা দেখানো হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, গোল্ড মনিরের বাবা ছিলেন বাড়ির কেয়ারটেকার, আর মা কাজ করতেন অন্যের বাসায়। তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট মনির। অভাবের সংসারে লেখাপড়া করা হয়নি বেশি দূর। ছোটবেলা থেকেই কাজ করতেন মানুষের দোকানে। চুরির অভিযোগে চাকরিও চলে যায় বেশ কয়েকবার। সোনা চোরাকারবারের সঙ্গে জমি দখল হয়ে ওঠে তার নেশা। মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টেই কয়েক শ প্লট রয়েছে তার। এ ছাড়া দখল করেছেন বেশ কয়েকটি বাজারও। অবৈধ জায়গা বৈধ করার জন্য গড়ে তুলেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।সূত্র জানান, অপরাধ জগতের এই সম্রাটের বিস্ময়কর উত্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তার এমন উত্থানের পেছনে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ১০-১২ জন কর্মকর্তার নামও বেরিয়ে আসছে তদন্তে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে রাজউক ভবনে তার কলকাঠি নাড়া শুরু হলেও পরে সব সময়ই সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টিতে থেকেছেন। এ সম্পর্ক টিকিয়ে রেখে তিনি রাজধানীর বাড্ডা, বনশ্রী, বারিধারা, বনানী, গুলশান, উত্তরা, কেরানীগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশ এলাকায় গড়েছেন হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। রাজউক কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে গোল্ড মনির ২০০-এর বেশি প্লট নিজের দখলে নিয়েছেন বলে তাকে গ্রেফতারের পর র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী গতকাল নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একশ্রেণির কর্মকর্তার সিল ও স্বাক্ষর জাল করে রাজউকের বিভিন্ন প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন গোল্ড মনির। তদন্তে ডিআইটি প্রজেক্টে ৩০টিসহ পূর্বাচল, নিকুঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, উত্তরায় রাজউকের প্রকল্পে তার আরও প্লট পাওয়া গেছে। এসব অবৈধ প্লটের উৎস এবং কারা কীভাবে সহায়তা করেছেন তদন্ত হচ্ছে। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন উপায়ে কোটি কোটি টাকা মূল্যের সোনার অলঙ্কার চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে নিয়ে আসেন। তার বাসায় যেসব সম্পদ পাওয়া গেছে তা বৈধ কিনা যাচাই করা হচ্ছে এবং এগুলোর উৎস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ প্রতারণার মাধ্যমে কিংবা কারও যোগসাজশে গড়া কিনা তাও তদন্ত করা হচ্ছে।

সূত্রগুলোর তথ্যানুযায়ী, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাড্ডার তৎকালীন কাউন্সিলর কাইয়ুমের সঙ্গে রাজউকে আসা-যাওয়া শুরু করেন গোল্ড মনির। অল্প দিনের ব্যবধানেই বাড্ডা পুনর্বাসন জোনের ৪৩০টি প্লটের মধ্যে প্রায় ১০০ হাতিয়ে নেন। এরপর বাকি সব প্লটের মালিকানা হস্তান্তর ও নকশা অনুমোদনসহ সব দাফতরিক কাজের দায়িত্ব নিজের কব্জায় নিয়ে আসেন। বাড্ডার বাইরেও ২০০৩ সালের ৩ ডিসেম্বর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা আয়তনের একটি প্লট নিজ নামে বাগিয়ে নেন। এরপর তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করে বারিধারার জে ব্লকের ১০ নম্বর সড়কের ৯.৬৪ কাঠার ১০ নম্বর প্লটটি নিজ নামে বরাদ্দ নেন। ২০০৫ সালে পূর্বাচলের ৫ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বরের ১০ কাঠার একটি প্লটও তিনি নিজ নামে বরাদ্দ নেন। উত্তরায় গত বছরের ১৯ মার্চ প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের ৯০.২৫ কাঠা জমি কেনেন মনির। একটি বড় হাউজিং কোম্পানির অনুকূলে আমমোক্তারনামা থেকে মনির জমির মালিকানা গ্রহণ করেন। এ ছাড়া মনিরের মালিকানাধীন উত্তরা গ্র্যান্ড জমজম টাওয়ার রাজউকের একটি দল ২৯ অক্টোবর পরিদর্শন করেন। সেখানে রাজউকের অথরাইজড অফিসার নির্মাণসংক্রান্ত তিনটি অনিয়ম তুলে ধরে মনিরকে চিঠি দেন। কিন্তু মনির এসবের তোয়াক্কা করেননি।

মনিরের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মোহাম্মদ ইয়াসীন গাজী এ প্রতিবেদককে জানান, রিমান্ডের প্রথম দিনে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হচ্ছে। আর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পেতে তারা বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেবেন। এ ছাড়া এনবিআরের কাছে তার ট্যাক্স ফাইলও চাওয়া হয়েছে।

সূত্র জানান, রাজউকের সবকিছু নিজের কব্জায় নেওয়ার পর গণপূর্ত অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন গোল্ড মনির। বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি সোচ্চার হন। এ ক্ষেত্রে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিককে সঙ্গে নিয়ে গণপূর্তে ঠিকাদারি কাজে নেমে পড়েন। প্রভাবশালী ওই ঠিকাদারকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের কিছু প্রভাবশালী মহলকে কাজে লাগিয়ে সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ে তার অনুসারী প্রকৌশলীদের বসানোর জোর তৎপরতা শুরু করেন।

অভিযোগ রয়েছে, গোল্ড মনিরের সেকেন্ড হোম রয়েছে মালয়েশিয়ায়। তিনি পলাতক বিএনপি নেতা বাড্ডার একসময়ের ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাইয়ুমের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত। বিএনপি জোট আমলে নামে-বেনামে প্লট বরাদ্দ করিয়ে নেন। ২০০০ সালের শেষের দিকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিজ বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, জমির জাল দলিলসহ গোল্ড মনিরকে গ্রেফতার করা হয়। অপহরণ, চোরাচালানসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় রয়েছে তার নামে একাধিক মামলা। ডিআইটি প্রজেক্টে অন্যের নামে থাকা একাধিক প্লট দখল করে নিয়েছেন তিনি। আমদানিনিষিদ্ধ পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যক্তিগত চলাচলে ব্যবহার করতেন গোল্ড মনির। গাউছিয়ায় থাকা তার একটি সোনার দোকানকে চোলাচালানের সোনা বিক্রির হটস্পট হিসেবে পরিণত করেন মনির। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

এআইআর/ডিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: