শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা প্রদানে কাজ করছে ঢাবি নিরাপত্তা মঞ্চ

   
প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ণ, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার: বিংশ শতকে বাঙালির হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে অগ্রগামী সৈনিক ছিলো তখনকার নতুন প্রজন্ম, তাদের নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। চলমান শতকে আবহমান বাংলার গ্রামের চিরন্তন শৃঙ্খল ভেঙ্গে নতুন প্রজন্ম বেরিয়ে আসছে নতুন পৃথিবী বিনির্মাণের দৃপ্ত শপথ নিয়ে। স্বভাবতই এই নতুন জাগরণের কার্যকরী সৈনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই।

অত্যন্ত লজ্জা ও পরিতাপের বিষয়, কৃষিনির্ভর গ্রামীণ সংস্কারের ক্রমাগত বিবর্তন ঘটায় উচ্চশিক্ষিত তারুণ্যের যে অপার সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ-সেই ভবিষ্যৎ বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ বিনির্মাণে তারুণ্যের পথ আগলে দাঁড়ায় গ্রাম্য রাজনীতির পথভ্রষ্ট মোড়লের অসাধু চক্র। চলে আসা পরম্পরায় অসৎ কর্মের যে সূক্ষ্ম শৃঙ্খল জালের মতো বিস্তৃত, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তারুণ্যের আচারে, কর্মে ও কন্ঠে সেই শৃঙ্খল ভাঙার প্রচেষ্টায় বিচলিত হয়ে এবং তারুণ্যের ক্রমবিকাশে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তারা দেশব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার এক নৃশংস মিশনে নেমেছে।

এই মিশনে তরুণদের বিরুদ্ধে ভিলেজ পলিটিক্সের নিয়ন্ত্রকদের প্রধানতম অস্ত্র হচ্ছে মিথ্যা মামলা, হামলা, হুমকি-ধমকি এবং জবর দখল। কোনভাবে এসমস্ত ঝুট-ঝামেলায় তরুণদেরকে জড়াতে পারলেই নষ্ট করা যায় তাদের মূল্যবান সময়, ভেঙ্গে দেয়া যায় দুর্বার মনোবল এবং সৃষ্টি করা যায় পারিবারিক অশান্তি। ফলে, একদিকে তরুণরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে এসব সমস্যার সমাধানে, অন্যদিকে গ্রাম্য কূট-কৌশলীদের দাম্ভিক অত্যাচার চলমান থাকে নির্বিবাধেই! বাংলাদেশের আইন প্রয়োগের দীর্ঘসূত্রিতা, অবৈধ অর্থ ও প্রভাবের মাধ্যমে আইনের নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছার অভাবে এ ধরণের নিপীড়নের ঘটনা নিয়মিতই ঘটে।

তবে, করোনা মহামারীতে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়েই দীর্ঘ সময় ধরে লাখ লাখ শিক্ষার্থী গ্রামে অবস্থান করছে। মহামারীতে সারা পৃথিবী যেখানে ঐক্যবদ্ধভাবে সঙ্কট মোকাবেলার চেষ্টা চালাচ্ছে, বাংলাদেশের গ্রামীণ মোড়লরা এই সুযোগে নিষ্ঠুরতার সীমা অতিক্রমে লিপ্ত হয়েছে। গত ছয় মাসে দেশব্যপী বিশেষতঃ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পরিবারের উপর হামলা, মামলা ও জুলুমের মাত্রা অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে গিয়েছে।

প্রায় প্রতিদিনই পারিবারিক বিরোধের সূত্রে দেশব্যপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উপর হামলা ও মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ক্যারিয়ার ধ্বংসের হুমকি –সহ নানাবিধ অভিযোগ জমা হতে থাকায় সম্মিলিতভাবে এ ধরনের সঙ্কট প্রতিরোধে গত জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সদ্য সাবেক জিএস জুলিয়াস সিজার তালুকদারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চ।

‘সবাই মিলে নিরাপদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ি’ স্লোগান নিয়ে প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন মাসেই এই মঞ্চে যোগ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় বিশ হাজার শিক্ষার্থী। গত তিন মাসে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অর্ধশতাধিক সমস্যার সমাধান করা হয়েছে, ফলে সেই পরিবারগুলো এখন নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছে। শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ভুমিকা রাখায় প্রশংসায় ভাসছে এই সংগঠনটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে এই সংগঠনের কার্যক্রমও চোখে পড়ার মতো। তাদের রয়েছে রয়েছে একটি ফেসবুক পেজ ও একটি গ্রুপ।

শুধু শিক্ষার্থীদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষান্ত হয়নি তারা, অল্প সময়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনেক শিক্ষামূলক কাজও করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শততম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের বিনা খরচে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ। শততম বর্ষে দ্বিগুণ সংখ্যক বা ২০০ জন শিক্ষার্থীকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য ইতোমধ্যেই আবেদন নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০০ জনকে গ্রাফিক ডিজাইন ও ১০০ জনকে ফ্রিল্যান্স রাইটিং স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ দেবেন তারা।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর তুচ্ছ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেয়া আক্তার কাকলি নামের এক ছাত্রীকে নিজ বাড়ি নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা থানার আতকাপাড়া গ্রামে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। ঘটনাটি জানার সাথে সাথেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চের সর্বাত্মক সহযোগিতায় কেয়ার যথাযথ চিকিৎসা প্রদান ও হামলাকারীকে দ্রুত গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় স্থানীয় প্রশাসন। কেয়া আক্তার কাকলি বলেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে গর্ববোধ করি। আজ আমার বিপদের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইয়েরা আমাকে যেভাবে সাপোর্ট করেছে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চের অবদান কখনো ভুলে যাওয়ার মতো নয়। এখন থেকে পরবর্তীতে আর কেউ শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলার সাহস পাবে না।’

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সদ্য সাবেক জিএস জুলিয়াস সিজার তালুকদার জানান, ‘বৃহত্তর স্বার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ও ব্যক্তিজীবন নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যেই এই মঞ্চ গঠনের চিন্তা করি। ঢাবির প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আমরা সেই লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবো বলে আশা রাখি।’

তিনি আরও বলেন, ‘মিথ্যা মামলা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা হচ্ছে। ঢাবিয়ানদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করতেই পরশ্রীকাতররা হিংস্রতার মাধ্যম পাল্টে এখন মিথ্যা মামলার আশ্রয়গ্রহণ করছে। ঢাবিয়ানদের উপর সকল প্রকার নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের অঙ্গীকার করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চের পরামর্শক হিসেবে যুক্ত আছেন প্রাক্তন ঢাবিয়ান ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সিনিয়র এএসপি মো: জুয়েল রানা এবং প্রাক্তন ঢাবিয়ান ও বর্তমানে ব্যাংক কর্মকর্তা মেহেদী হাসান শামীম।

মো: জুয়েল রানা জানান, ‘আমি যেহেতু পুলিশের কাজের সাথে জড়িত, তাই এ কাজ আমার পেশা ও নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন শিক্ষার্থীকে সহযোগিতা করে যখন রাতে ঘুমাতে যাই, তখন মনের মাঝে যে প্রশান্তি তৈরি হয় তা কখনো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য মেহেদী কাউসার ফরাজী জানান, ‘তারুণ্যের পথচলা হতে হবে সদা নির্বিঘ্ন এবং তাদের চিন্তা ও কর্মের নিরাপত্তাই মুখ্য অধিকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই জুলিয়াস সিজার তালুকদারের আহবানে হাজারো শিক্ষার্থীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ফসল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চ।’

সংগঠনটির কাজ আরো ফলপ্রসূ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে চারটি টিম। সেগুলো যথাক্রমে-সাইবার সিকিউরিটি টিম, আইন সহায়তা টিম, প্রশাসনিক সহায়তা টিম ও নারী নিরাপত্তা টিম। এসব টীমে সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন আরাফাত চৌধুরী, অপি করিম, তাজুল ইসলাম, সোহাগ মিয়া, মাহমুদ হাসান, রুবাইয়া আক্তার প্রমুখ।

এছাড়াও এডভোকেট, বিচারক, পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত প্রাক্তন ঢাবিয়ানরাও সেবার ব্রত নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চে যুক্ত হচ্ছেন বলেছে জানা গেছে। তবে, অবৈধ কোন কাজে সহযোগিতা কিংবা কোন প্রকৃত দোষীকে বাঁচাতে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয় না বলে জানিয়েছেন সংগঠন সংশ্লিষ্টরা। কাজের ক্ষেত্রে শতভাগ সচেতন থাকার চেষ্টা করেন বলেও জানিয়েছেন তারা।

এমআর/এনই

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: