শাহিনুর রহমান শাহিন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সাফল্যের বীরত্ব গাঁথা জাবির মাহফুজ

   
প্রকাশিত: ৩:৩৬ অপরাহ্ণ, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯

ইচ্ছা, মনোবল ও কঠিন পরিশ্রম না থাকলে জীবনে কোনকিছুই আপনি করতে পারবেন না। কোনকিছুই আপনি বানাতে পারবেন না, যদি আপনি তা গড়তে না চান। চেষ্টার আরেক নামই হলো পরিশ্রম, পরিশ্রম এবং পরিশ্রম। বিশৃঙ্খল জীবনকে বেধে ফেলুন শৃঙ্খলার শিকলে। পথটা সে যেমনই হোক লক্ষ্যে থাকুন স্থির। কী হয়েছে তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ আপনি কি ঘটাতে চলেছেন। এমন তেজদীপ্ত অভীষ্ট লক্ষ্যে বলীয়ান ছোট শাওনের মুখের কথা। তাঁর মুখের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছে কত ক্ষুধা মনের ভেতর এখনো জমিয়ে রেখেছেন। অথচ কিনা! এরই মধ্যে সফলতার শীর্ষ চূড়ায় পা রেখেছেন ছোট এই মানুষটি। ছোট মানুষটির নাম মাহফুজুল হক শাওন। তাকে কখনোই তাঁর লক্ষ্যে অর্জনে থেমে যেতে দেখে নি পরিববার। তার প্রমাণ রীতিমধ্যে আকাশচুম্মী অর্জন। সফলতার ঝুড়িতে তাঁর আজ অনেক অর্জন। তাই তো কৃতিত্বের স্বরে বলতেই হচ্ছে সাফল্যের বীরত্ব গাঁথা একজন অদম্য মাহফুজের গল্প। বলছিলেন মাহফুজ, সবকিছু ঝেড়ে ফেলে নতুন করে শুরু করুন। আরও একবার বলীয়ান হোন স্বপ্ন পূরণে। আরও একবার জীবনটাকে সাজান নতুন করে। আরও একবার ভুলে যান পিছনের অতীত। নতুন করে আবার শুরু করুন। গতকালের ইতিহাস যেমনই হোক আগামী ইতিহাসটা বদলে যাবে।

সত্যি কত সুন্দর মনোমুগ্ধকর তাঁর বাচনভঙ্গি। কি সুন্দর! তাঁর আশাহত না হওয়ার অনুপ্রেরণা। মাহফুজুলের ডাক নাম মাহফুজ শাওন। যাই হোক ছোট এই ছেলেটি পিতা-মাতা সহ সকল স্বজনের কাছে অতি আপনজন, অতি আদরের। পড়ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি বিভাগে। নিসন্দেহে এই বিভাগটি অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তুু তাকে কী যায় আসে! তাঁর মন তো খেলাপাগল। খেলাধুলায় তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। ছোটবেলা থেকেই মা-বাবা তাঁর মধ্যে খেলা পাগল স্বভাব খুঁজে পান। মা-বাবার স্বপ্ন মাহফুজ বড় হয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে। অনেক স্বপ্ন আর ভবিষ্যত পরিকল্পনা মতো মাহফুজকে পাঠ্য বইয়ের ছেলে হিসেবে দেখার ইচ্ছা ছিল মা-বাবার। মাহফুজ বাধ্য ছেলে বটে তবে মনোযোগ যে তার খেলাধুলায় বেশি। তিনি পড়ে আছেন খেলার মাঠে খেলা নিয়ে।

তাই তো স্কুল জীবন থেকে হার না মানা অদম্য মাহফুজ সফলতার মুখ দেখেছেন বারবার। স্কুল থেকেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিয়েছেন। ধীরে-ধীরে খেলার প্রতি প্রীতি বাড়তে থাকে তাঁর। আজ মাহফুজ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করার দোড়গোড়ায়। বিশ^বিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলায় মনোযোগী সাফল্যের কৃতিত্বে লম্বা করেছেন পুরস্কারের তালিকা।

এ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন দেশের বাইরে গত ১৯ ডিসেম্বর ভারতের জয়সালমির মরুভূমিতে অবস্থিত আল্ট্রা টাফম্যান ডেজার্ট চ্যাম্পিয়নশিপ-২০১৯ ইভেন্টে অংশ নিয়ে ৪৫ ঘন্টায় ২২০ কি:মি: ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এর আগে ২০১৮ সালে একই ইভেন্টে অংশ নিয়ে ১৬১ কি:মি: ক্যাটাগরিতে সাফল্য হন। সেখানে সময় নেন ৩৩ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট ২৯ সেকেন্ড।

বন্ধুরা মাহফুজকে অলরাউন্ডার মনে করেন। কেননা তিনি দৌড়, ম্যারাথন ও ফুটবল মাঠে সমানতালে খেলেন। তার প্রমাণ বঙ্গবন্ধু আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার মিনি ম্যারাথন ক্যাটাগরিতে সেরা হয়েছেন তিনি। সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারের এই মিনি ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর হাতিরঝিলে। সেখানে ৩৫ জন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে মাত্র ১৮ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে গন্তব্যে পৌঁছান তিনি।

এখন পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ ২ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে ৮০০ মিটার, ৪ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে ১৫০০ মিটার, ১৭ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে পাঁচ হাজার মিটার এবং ৩৮ মিনিট সময়ের মধ্যে ১০০০০ হাজার মিটার পথ দৌড়ে অতিক্রম করেছেন। গত মার্চে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা হাফ ম্যারাথন’-এ ৬৫০ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তৃতীয় হয়েছেন। ঢাকা হাফ ম্যারাথনে প্রথম স্থান, ২৯ মার্চ বঙ্গবন্ধু আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপের হাফ ম্যারাথনে প্রথম স্থান ও ২৮ জুন ‘গাজীপুর সামার আল্ট্রা ম্যারাথন’-এ ৮০ কিলোমিটার সিম্প্রন্টে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি।

দেশের বাইরেও নানা প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছেন মাহফুজ। ২০১৮ সালে টিএসকে ২৫ কিমি রান কলকাতায় অংশ নিয়েছিলেন। এতে তিনি ৪:১৪ কিলোমিটার গতির সঙ্গে ১:৪৫:৩৩ সময় নিয়ে ১৮-২৫ বছর বয়সের ক্যাটাগরিতে ১৯তম স্থান অর্জন করেন।

অলরাউন্ডার মাহফুজের ‘অলরাউন্ডার’ হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে তাঁর ফুটবল নৈপুণ্য। ফুটবল মাঠে মাহফুজ যেন সিংহ। তাঁর গতি, ড্রিবলিং ও ক্ষিপ্রতা মুগ্ধ করে ফুটবল মাঠের দর্শকদের। গুটিগুটি পায়ে তাঁর বল নিয়ে দৌড়ানো দেখলে গায়ে শিহরণ জাগে, মনে দোলা দেয় উৎফুল্লতা। তাই ফুটবল নৈপুণ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রিয় মুখ আর ভালবাসার নাম মাহফুজ। জীবনে এত অর্জনে দমে যান নি তিনি। একটি অর্জন নাকি তাকে আরও হাজারো অর্জনের অনুপ্রেরণা দেয়।

নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও মাহফুজকে দিয়েছে দু-হাত ভরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাথলেটিকস টিমের সদস্য তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় গত চার বছরে ৮০০ মিটার ম্প্রিন্টে অংশ নিয়ে যথাক্রমে দ্বিতীয়, প্রথম এবং তৃতীয় হন। এ ছাড়া ১৫০০ মিটার ম্প্রিন্টে দু’বার প্রথম এবং দু’বার দ্বিতীয়, ৫০০০ ও ১০০০০ মিটার ম্প্রিন্টে তিনবার প্রথম এবং একবার দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। আর ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে যথাক্রমে ১৮ ও ২০ পয়েন্ট নিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন। ৪০০ মিটার দলীয় ম্প্রিন্টে তিনবার চ্যাম্পিয়ন এবং একবার রানার্সআপ এবং ১০০ মিটার দলীয় ম্প্রিন্টে একবার চ্যাম্পিয়ন ও একবার রানার্সআপ। অ্যাথলেটিকস এ ২০১৫-২০১৮ এই চার বছরে দলীয়ভাবে আ ফ ম কামালউদ্দিন হল চ্যাম্পিয়ন হয় এবং ফুটবলে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে রানার্সআপ হয়, যে দলের অন্যতম সদস্য মাহফুজ।
সাফল্য গাঁথা মাহফুজ বলেন, সত্যি আমি ভাগ্যবান। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাকে দু-হাত ভরে দিয়েছেন। যারা বিভিন্ন ভাবে এখন পর্যন্ত সাহস জুগিয়েছেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি যাতে দেশের জন্য আরও ভালো কিছু অর্জন করতে পারি। এখন স্বপ্ন দেখি দেশের হয়ে ইন্টারন্যাশনাল রানিং ইভেন্টে গৌরবময় অর্জনের।

ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. মেজবাহউদ্দিন সরকার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, মাহফুজের এমন গৌরবময় অর্জনে আমরা কৃতিত্ব। তাঁর সফলতা দেশ ও দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়ুক। তাঁর অদম্য চলার পথে সব ধরনের সাহায্যে সহযোগিতা আমরা করবো। সে জীবনে আরও বড় কিছু অর্জন করুক এটাই বিভাগের পক্ষ থেকে কামনা।

এমআর/এনই

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: