প্রচ্ছদ / শিক্ষা / বিস্তারিত

স্ত্রী ও তিন বোনকে নিয়ে গড়া সেই বিদ্যালয়টি আজ বিভাগে সেরা

   
প্রকাশিত: ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ, ১৯ জানুয়ারি ২০২০

শুরুটা খুব কঠিন ছিল চরভিটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। ছাত্রছাত্রী ছিল না, শিক্ষকও না। কারণ কে-ইবা আসবে সেই স্কুলে পড়তে, যেখানে কোনো শিক্ষক নেই! আর কে-ইবা চাইবে সেই স্কুলে শিক্ষক হতে যেখানে পড়াতে হবে বিনা বেতনে? কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতা পাড়ি দিয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা এই স্কুলটিই এবার সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে রংপুর বিভাগে।

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী বকুয়া ইউনিয়নের নিভৃত গ্রামের এ স্কুলটি ভবিষ্যতে আরও সফলতার মুখ দেখবে বলে প্রত্যাশা শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়দের।

২০০১ সালে নিজের এক খণ্ড জমিতে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন চরভিটা গ্রামের নূরুল ইসলাম। কিন্তু স্কুলটি চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। এলাকাতেই চায়ের দোকান চালাতেন তার ছেলে স্নাতক উত্তীর্ণ এরফান আলী। বিদ্যালয়টির নাজুক অবস্থা দেখে ২০১১ সালে তার হাল ধরেন তিনি। শুরু হয় নতুন এক কাহিনির।

শিক্ষক নেই, বিনা বেতনে কেউ পড়াতেও রাজি নয়- এরফান আলী তাই বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন তার স্ত্রী ও তিন বোনকে নিয়ে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতেন তারা। কেউ যাতে ঝরে না পড়ে, সে জন্য নানাভাবে উৎসাহিত করতেন ছাত্রছাত্রীদের দরিদ্র মা-বাবাদের। অভিভাবকরা যাতে আকৃষ্ট হন, সে জন্য বিদ্যালয়ের স্বল্প জায়গাকে ঘিরেই মনোরম পরিবেশ গড়ে তোলেন তারা।

শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে ২০১৪ সালে সপ্তাহের কয়েক দিন দুপুরেই খাওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হয় এ বিদ্যালয়ে। স্কুল ভবনের পাশের পুকুরে হাঁস চাষ করা হয়, চারপাশে লাগানো হয় পেঁপে গাছ। এসব মাছ, হাঁস ও তার ডিম এবং নিজের বাগানে উৎপাদিত সবজি দিয়ে বিদ্যালয়ে সপ্তাহের দুই দিন ডে-মিল চালু রেখেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এরফান আলী। এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদানও কম নয়। দুপুরের খাবার কার্যক্রম চালাতে যখন প্রধান শিক্ষক হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন তারা মুষ্টির চাল দিয়ে এ উদ্যোগকে সচল রাখে।

যে বিদ্যালয়ে একদিন বলতে গেলে কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থীই ছিল না, সেখানে এখন শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত চারজন শিক্ষক ও তিনজন প্যারা-শিক্ষক। এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০১। বিদ্যালয় সংলগ্ন নিজের জমিতে এরফান আলী শিক্ষার্থীদের বিনোদনে গড়ে তুলেছেন শিশুপার্ক ও মিনি চিড়িয়াখানা। এলাকাবাসীর সহায়তায় বিদ্যালয়ের চারপাশে গড়ে তুলেছেন প্রাচীর।

বিদ্যালয়, পার্ক ও চিড়িয়াখানার প্রাচীরে রয়েছে বিভিন্ন মনীষীর উক্তি ও ছবি। গ্রামবাংলার বিভিন্ন লোকজ উপকরণ দিয়ে সাজানো হয়েছে এসব স্থান। মিনি চিড়িয়াখানায় রয়েছে খরগোশ, টিয়া, ঘুঘু, কবুতর, টার্কি, তিতির, রাজহাঁস, চিনাহাঁস, পাতিহাঁস ইত্যাদি। রয়েছে সিমেন্টের তৈরি হাতি ও জিরাফ। পুকুরে রয়েছে নৌকা।

বিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক পর্যায়ে এলে এরফান এটিকে নিবন্ধনের চেষ্টা করতে থাকেন। কয়েক বছর ধরে ছোটাছুটি করেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে, সংসদ সদস্যের কাছে। যোগাযোগ করেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম ও সাফল্য প্রচারিত হলে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মূকেশ চন্দ্র বিশ্বাস এটি পরির্দশন করেন। ২০১৫ সালের শেষদিকে এখানে তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান এমপি মা সমাবেশ করেন।

২০১৬ সালে বিদ্যালয় পরির্দশন করেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (নিয়োগ শাখা) একেএম সাফায়েত আলম।২০১৬ সালে চরভিটা প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা পায় এবং একই বছর এটি উপজেলার সেরা স্কুল হিসেবে নির্বাচিত হয়। স্কুলের শিক্ষকরা সরকারি বেতন পেতে শুরু করেন ২০১৭ সালের মার্চ মাস থেকে। জাতীয়করণের পর পাওয়া এককালীন অনুদান দিয়ে এরফান আলী বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর উন্নয়ন করেন।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাসরিন, সানা মনি, অন্তর, মানজারুল সেখানকার পরিবেশে খুবই আনন্দিত। তারা জানায়, শুধু লেখাপড়া নয়; স্কুলে খেলার ব্যবস্থাও রয়েছে। তাদের তাই খেলার জন্য বাইরে যেতে হয় না। অনেকেই বিদ্যালয় দেখতে আসেন- এটাও তাদের ভালো লাগে।

প্রধান শিক্ষক এরফান আলী নিজের উদ্যোগে বিদ্যালয়ে ৫ থেকে ১৮ বছরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (নিয়োগ শাখা) একেএম সাফায়েত আলম এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।

এরফান আলী বলেন, চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবার রংপুর বিভাগে সেরা হয়েছে। আশা করি, সবার সহযোগিতা পেলে জাতীয় পর্যায়ে সেরা হওয়ার গৌরবও অর্জন করতে পারব। সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। আসন সমস্যা দূর হচ্ছে। খুব অল্প সময়েই নতুন ভবনে উঠতে পারব।

তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যখন স্কুলের কাজ শুরু করেছিলাম, আশপাশের লোকজন তখন বলত, পাগল হয়ে গেছি! না হলে এ রকম নিভৃত গ্রামে কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করতে যাব? তাদের তখন বলতাম, আপনারা দোয়া করেন, তাহলে একদিন নিশ্চয় সফল হবো। এবার বিভাগে সেরা স্কুল ঘোষণা করায় কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। কারণ এ বিদ্যালয়কে দেশের সেরা বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিতি করাতে চাই।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হারুণ অর রশীদ বলেন, মাত্র ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া চরভিটা বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০১। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এ স্কুলের কোনো শিক্ষার্থী ফেল করেনি। আশা করি, আগামীতে আরও ভালো করবে।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ( ভারপ্রাপ্ত) নুর কুতুবুল আলম বলেন, চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এরফান আলী শিক্ষাক্ষেত্রে দেশের মডেল। চরভিটা এলাকায় একটি বিদ্যালয় জরুরি ছিল। এরফান সে চাহিদা পূরণ করতে পেরেছেন। নিজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠান করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন তিনি। সত্যিই এটি মুগ্ধ হওয়ার মতো বিদ্যালয়।

এইচ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: