প্রশ্ন ড. আসিফ নজরুলের

তাহলে মিন্নির জন্য কেন কোন আইনজীবী নেই?

   
প্রকাশিত: ৩:২১ অপরাহ্ণ, ১৮ জুলাই ২০১৯

ছবি: ইন্টারনেট

বরগুনার রিফাত হত্যাকাণ্ড নিয়ে সারাদেশে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। রিফাত হত্যার প্রধান আসামী সুমন বন্ড ইতোমধ্যে পুলিশের সাথে বন্ধুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। বাকি আসামিরাও গ্রেফতার হয়েছে। তবে গত ২ দিন আগে এ ঘটনায় নতুন মোড় নেয়। এ মামলার প্রধান স্বাক্ষী রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিও হয়ে গেছেন মামলার আসামী। তাকে গ্রেফতার করে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। পুলিশ দাবি করছে, এ হত্যাকাণ্ডের সাথে মিন্নি সরাসরি জড়িত।

এ বিষয় নিয়ে এবার মুখ খুললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) তিনি তার নিজের ফেসবুক পেইজে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি ও এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তার স্ট্যাটাসটি বিডি২৪লাইভের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, কুখ্যাত খুনী, ধর্ষক, দূর্নীতিবাজ, মাদকব্যবস্যায়ী সবার জন্য আইনজীবিরা লড়তে পারেন। তাহলে মিন্নির জন্য কেন কোন আইনজীবি নেই? এটা দেখে আমার তো সন্দেহ হচ্ছে নয়ন বন্ড-এর গড়ফাদাররা আছে তাকে ফাসিয়ে দেয়ার পেছনে। না হলে তার পক্ষে লড়তে ভয় বা অনীহা কেন সেখানকার সব আইনজীবীর।
মিন্নির পক্ষে দাড়ানোর জন্য নেই কোন মানবাধিকার সংগঠনও?

‘মিন্নি নয়ন বন্ডের বাড়িতে গিয়ে রিফাত হত্যার পরিকল্পনা করে’

বরগুনায় রাস্তায় ফেলে প্রকাশ্যে কুপিয়ে রিফাত শরীফকে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা ওরফে মিন্নি জড়িত ছিলেন। তিনি হত্যা পরিকল্পনায়ও অংশ নেন। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন তিনি নয়ন বন্ডের বাড়িতে গিয়ে এ হত্যার নীলনকশায় অংশ নেন। এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বুধবার (১৭ জুলাই) আদালতকে এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় মূল নায়ক নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সঙ্গে মিন্নি পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটান।

আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ও নিহতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে আটকের পর বুধবার (১৭ জুলাই) আদালতে হাজির করা হয়।

বুধবার বেলা সোয়া ৩টার দিকে মিন্নিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে হাজির করে তদন্তের স্বার্থে ও অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বরগুনা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ূন কবির। আদালতের বিচারক মোহাম্মাদ সিরাজুল ইসলাম গাজী শুনানি শেষে তার বিরুদ্ধে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিকে, বুধবার সকালে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ডেকে এনে মিন্নিকে গ্রেফতার দেখানো ও আদালতে নেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানায় মিন্নির পরিবার।

পুলিশ বলছে- পরিকল্পিতভাবে ঘটানো এ হত্যাকাণ্ডে মিন্নির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে আদালতে আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি বলেছেন, ‘আমার স্বামী রিফাত শরীফ। আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার চাই। হত্যাকাণ্ডে আমি জড়িত নই। এ মামলায় আমাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে।’

প্রায় ১৫ মিনিট তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য শেষে বিচারক জানতে চান আসামির পক্ষে কোনও আইনজীবী আছেন কিনা? উপস্থিত আইনজীবীরা এ সময় নীরব ছিলেন। পরে বিচারক কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মিন্নিকে উদ্দেশ্য করে জানতে চান তার কোনো বক্তব্য আছে কিনা? মিন্নি এসময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘স্যার আমি এই ঘটনার সাথে জড়িত নই, ওইদিন যে এই ঘটনা ঘটবে তা আমি জানতাম না।’

আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে মিন্নি বলেন, বিভিন্ন সময় আসামিরা তাকে ফোনে বিরক্ত করতো ও ভয় ভীতি দেখাতো। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দিতো।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি বা আমার পরিবার আসামিদের ভয়ে কোথাও মুখ খুলতে পারিনি। আমার স্বামী রিফাত শরীফ হত্যাকারীদের বিচার চাই। আমাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে।’ বক্তব্যের একপর্যায়ে বিচারক হত্যাকারীর কল লিস্টে তার নম্বর কিভাবে এলো জানতে চাইলে মিন্নি নিরব থাকেন।

আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকার বিষয়টি নিয়ে রয়েছে অনেক গুঞ্জন। এ ঘটনায় বরগুনায় কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, মামলাটি ভিন্ন খাতে নেওয়া হচ্ছে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। পুলিশের ভূমিকারও সমালোচনা করেছেন তারা।

জানা গেছে, মিন্নির বাবা তিন আইনজীবী নিয়োগ করলেও ওকালতনামায় স্বাক্ষর না করায় তারা আদালতে লড়তে পারেন নি। এদিকে মিন্নির গ্রেফতার নিয়ে বুধবারও সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয়। সেখানে এক এমপি মিন্নির গ্রেফতারে প্রভাবশালী কারও ইন্ধন রয়েছে কি-না সে প্রশ্ন তোলেন।

আদালতে রিমান্ড আবেদনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বরগুনা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ূন কবির জানান, মূল পরিকল্পনাকারী নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে মিন্নি এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে।

পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একটি গণমাধ্যমকে কাছে দাবি করেন, ঘটনার দিন ও আগের দিন নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির কথোপকথন ও মেসেজ আদান-প্রদান রয়েছে। এতে তাদের মনে হয়েছে, রিফাত শরীফ হত্যার নীল নকশায় মিন্নির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু ওই কথোপকথন ও মেসেজে কী ধরনের বক্তব্য ছিল তা এখনই খোলাসা করতে চাননি পুলিশের ওই কর্মকর্তা।

রিফাত হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রিমান্ড শুনানিতে বলেন, এ মামলার এজাহারভুক্ত অন্যতম আসামি টিকটক হৃদয় ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যা পরিকল্পনায় মিন্নি জড়িত বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া মিন্নি তার আগের স্বামী নয়ন বন্ডের সঙ্গে বিয়ের কথা গোপন করে রিফাতকে বিয়ে করেন। তবে নয়ন বন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতেন। রিফাত তার স্ত্রীকে নয়ন বন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রাখার জন্য বলেন। মিন্নি এ ঘটনা নয়ন বন্ডকে জানান। পরে মিন্নি, নয়ন বন্ড ও তার বাহিনী রিফাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে। রিফাত হত্যার আগে এজাহারভুক্ত সব আসামির সঙ্গে মিন্নি বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ রাখতেন। এর প্রমাণ হিসেবে তদন্তকারী কর্মকর্তা মোবাইল কল লিস্ট আদালতে উপস্থাপন করেন।

রিমান্ড শুনানিকালে আদালতের বাইরে থাকা মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘রিফাত হত্যাকাণ্ডের আসল খুনিদের বাঁচাতে আমার মেয়েকে ষড়যন্ত্র করে এ মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। আমি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’

মোজাম্মেল হোসেন বলেন, তিনি তার মেয়ের পক্ষে তিনজন আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছিলেন। তারা ওকালতনামায় স্বাক্ষর নিতে না পারায় আদালতে দাঁড়াতে পারেন নি।

নিহত রিফাত শরীফের বাবা আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ বলেন, তিনি আগেই সন্দেহ করেছিলেন যে, মিন্নি তার ছেলের হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তাই তিনি পুত্রবধূকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছিলেন। পুলিশ মিন্নিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত আছে বলেও প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পেয়েছে।

মিন্নির শ্বশুর আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ আশা করেন, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মিন্নির কাছ থেকে হত্যার আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে। তিনি তার ছেলের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

এ বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন জানান, মঙ্গলবার সকালে মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ লাইনে আনা হয়। একটানা ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মঙ্গলবার রাতে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

তিনি আরও জানান, রিফাত হত্যা মামলায় তারা ১৪ জনকে গ্রেফতার করেছেন। গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০ জন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বাকি তিনজন এখনও রিমান্ডে।

উল্লেখ, গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এ ঘটনার পরের দিন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা সাতজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।

এ মামলায় পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত সাতজন (ছয়জন জীবিত) ও সন্দেহজনক সাতজন আসামিসহ মোট ১৪ জনকে গ্রেফতার করে। এজাহারভুক্ত গ্রেপ্তার চারজন এবং সন্দেহজনক ছয়জন আসামিসহ মোট ১০ জনকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

গ্রেফতার হওয়া এজাহারভুক্ত দুজন এবং সন্দেহজনক একজনসহ মোট তিন আসামিকে আদালতের অনুমতিক্রমে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে এনে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এ ছাড়া এই মামলায় পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা করছে পুলিশ।

এমআর/এনই

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: