আরমান হোসেন

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

থমকে আছে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ

   
প্রকাশিত: ৪:৫৪ অপরাহ্ণ, ৮ মার্চ ২০২০

ছবি: প্রতীকী

রাজধানীর বাংলামোটরের ফুটপাতে ছোট্ট চায়ের দোকান দিয়ে বসেছেন ফাতেমা আক্তার। রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে সপ্তাহের সাত দিনই চা বিক্রি করেন এই নারী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চা বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে সংসার। স্বামী নেই, দুই সন্তান নিয়েই তার সংসার। ফাতেমা জানান, কেউ কাজ দেয় না। ফুটপাতে চা বিক্রি না করলে না খেয়ে থাকতে হবে।

দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও বাড়ছে না কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ। অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ নানান পেশাতেও কাজ করেন নারী। বর্তমানে দেশে ১৫ বছর বয়সী নারীর সংখ্যা ৫ কোটি ৫০ লাখ। এর মধ্যে শ্রম বাজারে আছে দুই কোটি বা ৩৬ দশমিক ৩ ভাগ নারী। বাকিদের কোনো কাজ নেই। কাজের খোঁজেও নেই বেশির ভাগ নারী। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা অনেক। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ, বেকারত্ব, ব্যাংক হিসাব, অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজের সুযোগ, মুঠোফোন-ইন্টারনেট সুবিধাসহ নানা সূচকে পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশ পিছিয়ে। নানান সংকটের মধ্যেই আজ ৮ মার্চ পালিত হবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রজন্ম হউক সমতার- সকল নারীর অধিকার’। রাষ্ট্রায়াত্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ মনে করেন, নারীদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। আলোকিত বাংলাদেশকে তিনি বলেন, প্রত্যেক পরিবারকে তাদের মেয়েরা যেন কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারে সে সুযোগ করে দেয়া প্রয়োজন। পরিবার যেন নারীর এগিযে আাসার পেছনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে সে বিষয়টি খেয়াল রাখা জরুরি। তার মতে, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে আগে তাদের যে আয় করা দরকার এটা নিজেকে বুঝতে হবে। আবার শ্রমবাজারে নারীদের অংশ বাড়ানো উচিত এটা অন্যদেরও বুঝতে হবে। যারা আসতে চায় কিন্তু সুযোগের অভাবে আসতে পারছে না তাদেরকে কাজের সুযোগ করে দিতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, সিপিডি’র সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ২০১৭ সালের পর আর শ্রম জরিপ হয়নি। বর্তমান সময়ে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে। বিশেষ করে শিল্পখাতে কমেছে নারীর অংশগ্রহণ। তিনি বলেন, কৃষি খাতে নারীদের সম্পৃক্ততা বেশি। সমাজের এক অংশকে বাদ রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ জরিপে দেখা গেছে, দেশে মোট জনসংখ্যার মধ্যে অর্থনীতিতে অংশগ্রহণকারী সক্রিয় মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৩৫ লাখ। আর নারীর অংশগ্রহণ ২ কোটি। ১৫ বছরের উর্ধ্বে যাদের বয়স সেসব মানুষের উপর এ জরিপ পরিচালনা করে বিবিএস। জরিপ অনুযায়ী, এ সময়ে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৮ লাখ। এর মধ্যে শ্রমবাজারে থাকা পুরুষের সংখ্যা ৪ কোটি ২২ লাখ। আর নারীর সংখ্যা দুই কোটি। একই সময়ে বেকার পুরুষের সংখ্যা ১৪ লাখ বা ৩ দশমিক ১ শতাংশ। আর ১৩ লাখ নারী কর্মহীন বা বেকার। শতকরা হিসেবে এর পরিমাণ ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী গেল ২০১৭ সাল শেষে সারা দেশে ৭২ লাখ নারী-পুরুষ মজুরিবিহীন কাজ করতেন। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৫৪ লাখ। আর ১৮ লাখ পুরুষ এমন কাজ করেন। অর্থাৎ কাজের মূল্যায়নের দিক থেকে পিছিয়ে নারীরা।

ড. নাজনীন আহমেদ আরও বলেন, মেয়েরা যে কাজে সক্ষম সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এজন্য প্রথমে মেয়েদেরকে উচ্চ শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা আরো বাড়াতে হবে। অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে উচ্চশিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত থাকার জায়গা বা হোস্টেল, যাতায়াত ব্যবস্থা নেই। আবার যেসব নারীরা শহরাঞ্চলের বাইরে থেকে কাজ করতে আসে তাদেরও আবাসন ও নিরাপত্তা অভাব রয়েছে। কর্মজীবীদের নারীদের কাজে আনতে হলে ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করতে হবে। না হলে যাদের ছোট বাচ্চা সেসব নারীরা কাজ করবে কিভাবে? অন্যদিকে যেসব নারীরা চাকরি করতে চায় না, নিজে কিছু করতে চায়, তাদের বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি যারা উদ্যোক্তা হতে চায় তাদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, কারণ তারা ঋণ পায় না। এটা একটা বড় সমস্যা। যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ দেয় তারা নারীদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে চায় না। ঋণ পেতে অনেক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এসব প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। যেসব নারী বড় ব্যবসা করতে চায় তাদেরকেও ঋণের সুযোগ দিতে হবে।

নারী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি: এদিকে দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবের উদ্যোগে ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে বিকেল সাড়ে ৪টায় ‘নারী উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এতে কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনকে সম্মাননা প্রদান করা হবে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) উদ্যোগে এ উপলক্ষে বেলা ১১টায় ডিআরইউ চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হবে। এদিন নারী দিবস উপলক্ষে কেক কাটা হবে। পরে ডিআরইউ নারী সদস্য ও সকল সদস্যদের পরিবারের নারীদের জন্য ব্রেস্ট স্ক্রিনিং ও ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতামূলক হেলথ ক্যাম্প পরিচালিত হবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ১১ মার্চ ডিআরইউ’র উদ্যোগে এক আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নারী সদস্যদের বিশেষ সংকলন ‘কণ্ঠস্বর’ এর বিশেষ সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করা হবে। পাশাপাশি দিবসটি উৎযাপনে দেশব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এ বছরের আন্তর্জাতিক নারী দিবস বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাণীসহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে। সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন ও জাতীয় পর্যায়ে ৫ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতাকে সম্মাননা প্রদান করা হবে। দেশব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের লক্ষ্যে উপজেলা ও উপজেলা পর্যায়ে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। নারী উন্নয়নে অসামান্য অগ্রগতি, সমতা সৃষ্টি, বৈষম্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, বাল্যবিয়ে বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি, নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা ও সকল ধরণের সহিংসতা বন্ধে ব্যানার, প্লাকার্ড, ফেস্টুন, স্যুভেনিয়ুর প্রকাশ করা হবে। এছাড়া ১৬ থেকে ১৮ মার্চ দেশজুড়ে তিন দিনব্যাপী ‘নারী উন্নয়ন মেলা’ আয়োজন করা হবে।

আরএএস/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: