হারুন অর রশিদ

পঞ্চগড় প্রতিনিধি

একজন সংগ্রামী মা ও তার চার কণ্যা !

   
প্রকাশিত: ১:১২ অপরাহ্ণ, ১২ মার্চ ২০২০

পৃথিবীতে কিছু নারীর জীবনে সংগ্রাম চলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ঝলই শালশিরি ইউনিয়ন এর কামাত মানিকচাঁদ গ্রামে স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে ১৯৭০ সালে ১৪ সেপ্টেম্বর জন্ম রশিদা খাতুনের। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ২য় সন্তান রশিদা অনেক আদরের ছিল । স্থানীয় জোতদেবীকান্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত পড়াশুনা করে মাধ্যমিকে স্কুলে ভর্তি হতে চেয়েছিল, তখন রশিদার বয়স তখন ১৫ বছর। কিন্তু রশিদার বাড়ির কাছাকাছি মাধ্যমিক কোন স্কুল না থাকায় বাবা আশিরউদ্দিন বয়সন্ধিকাল না আসতেই পঞ্চম শ্রেনী পাশ করা রশিদাকে তৎকালিন পঞ্চগড় সুগার মিলের ইক্ষু উন্নয়ন সহকারি নুরুল ইসলাম এর হাতে তুলে দেয়। অনিচ্ছাসত্তেও বাবার সিদ্ধান্তের কাছে হার মেনে বিয়ের পিড়িতে বসে রশিদা খাতুন।

রশিদা খাতুনের সাথে কথা বললে তিনি বলেন সংসার জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতেই লেগেছিল কয়েক বছর । রশিদা বললেন সবকিছু মেনে নিয়ে আমি স্বামীর সাথে সংসার জীবনে চারটি মেয়েকে জন্ম দিয়েছি। কিন্তু কপালে সূখ আর ধরা দিলনা । গৃহিনি হিসেবে মাত্র ১৫ বছরের মাথায় বিধবা হয় রশিদা কারন স্বামী নুরুল ইসলাম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা। স্বামীর তিন ভাইয়ের সাথে যৌথ পরিবারে আমার সংসার। ভিটেমাটি ছাড়া কোন কিছুতেই কতৃত্ব ছিলনা আমার। শুরু হয় আমার সংসার যুদ্ধ বড় মেয়ে সুমি তখন শুধুমাত্র অস্টম শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছিল মাগুড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। স্বামী নুরুল ইসলাম বেচেঁ থাকতে মেয়েগুলোকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতো। তাঁর মৃত্যুর সময় দ্বিতীয় মেয়েটি কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পড়াশুনা করবে। তৃতীয় মেয়ে মৌসুমি পাঁচ বছর বয়স ও চতুর্থ মেয়ে কেয়া বাবা হারানোর যন্ত্রনা কি তারা বুঝে উঠেনি। কাদোঁ কাদোঁ কন্ঠে রশিদা বললেন কেয়া তখন শুধু আমার স্তন পান করতো আর হাটি হাটি পা পা করছে। নিয়তির নির্মম পরিহাস মেনে নিয়ে আমি পিছপা হয়নি সংসার এর দায়িত্ব নিজের কাধে নিতে। নুরুল ইসলামের মৃত্যু আমাকে বিধবা করেছে কিন্তু তার স্বপ্নের কথা আমাকে প্রেরনা যুগিয়েছে সংসার যুদ্ধে জয়ী করতে। স্বামীর চাকুরীর অবসর ভাতা আসতে সময় লাগবে।

যৌথ পরিবারের সম্পত্তিতে হিস্যা নিতে অনেক নিয়ম কানুন আছে । পারতাম সবকিছু ফেলে বাপের বাড়িতে পারি জমানোর। কিন্তু মেয়েগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে বেচেঁ আজও বেঁচে আছি। স্বামী হারিয়ে অভাবের সংসার । শক্ত মনোবল নিয়ে নিজেই কৃষকেরমত ফসল ফলানোর কাজ করেছি। দুবেলা ভাল খাবার খেতে না পারলে। বড় মেয়ে কিছুটা বঝেছিল বাবাতো নেই মা আর কি করবে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ৫০ বছরের রশিদা ভরদুপুরে আজও থালা বাসন মাজার কাজ করছে। তবে চোখে মুখে স্বামীর স্বপ্ন আর মেয়েদেরকে শিক্ষিত করে তোলার প্রবল ইচ্ছা। এরই মধ্যে বড়মেয়েটি জেলার গন্ডী পেরিয়ে দিনাজপুরের সরকারি মহিলা কলেজ হতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজ হতে একই বিষয়ে মাস্টার্স পড়াশুনা শেষ করে পঞ্চগড়ের আটোয়ারি উপজেলার মির্জা গোলাম হাফিজ ডিগ্রী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছে। সুমির সাথে তার বাসায় সরাসরি কথা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলল মা শুধু সারাটাজীবন আমাদের জন্যই যুদ্ধ করেছে।

বছরে দুটো শাড়ি কাপড় দিয়ে দিনাতিপাত করেছিল মা। নিজের জন্য কখনো ভাবেনি শুধু মুখ বুজে আমাদের জন্য সংসার যুদ্ধ করেছে। নিজে কখনো ভাল খাবার খেয়েছে বলে আমার মনে হয়না। কিন্তু আমাকে কখনো বুজতে দেয়নি যে সংসারে অভাব অনটন যাচ্ছে। আমি কিন্তু বুজতাম মা অনেক কস্ট করে আমাকে লেখাপড়ার খরচ যোগাতো। মাঝে মাঝে ছোট মামা খলিলুর এর কাছে টাকা কর্য করে আমাকে টাকা পাঠাতো। এজন্যই আমিও কস্ট করে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেছি। সুমি বললো আমার ছোট বোন নুরুন নাহার কেমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং সেখানে একই বিষয়ে মাস্টার্স পাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসার পদে গত বছর ২০১৯সালে চাকুরি পেয়েছে। তবে আমাদের কোন বোনের এখনো বিবাহ হয় নাই। আমরা আগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়েছি যাতে মায়ের সংগ্রামি জীবনের মুল্য দিতে পারি। তাই ছোট বোন কেমি একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকুরি অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানে এমফিল ডিগ্রী অর্জনের জন্য এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে অবস্থান করছে। তৃতীয় বোন নুসরাত জাহান (মৌসুমি) অর্থনীতি বিষয়ে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দিনাজপুরে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। পড়াশুনা করে সেও মায়ের কস্টের টাকার মুল্য দিতে চায়। সর্বশেষ চতুর্থ বোনটি আইন বিভাগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছর ভর্তি হয়েছে।

রশিদা খাতুন তবুও এখনো ক্লান্ত হয়নি সে সাংবাদিকদের বললেন আমি শুধু আমার মেয়েদের ভাল কিছু দেখতে চাই । সর্বকনিস্ট মেয়ে কেয়ার ইচ্ছা দেশের বাইরে পড়াশুনা করার । আমি জীবন দিয়ে হলেও সেই মেয়ের ইচ্ছা পুরন করবো। আর তৃতীয় মেয়েটিকে আমি বিসিএস পাড়াতে চাই যাতে সে একজন ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারে। কারন পড়াশুনার খরচ যোগাতে তার বাবার দেওয়া একবিঘা জমিও বিক্রি করেছি শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য। তবে আজ একটু শান্তি পাচ্ছি দুটোমেয়ের চাকরি হয়েছে, সরকারের সহযোগীতা চাই মেয়েদের পড়াশুনা শেষ হলে যাতে তারা ভাল একটা চাকুরি পায়।

এআইআ/এইচি

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: