প্রচ্ছদ / ক্যাম্পাস / বিস্তারিত

স্মৃতির পাতায় প্রিয় ক্যাম্পাস

   
প্রকাশিত: ১১:৩৬ অপরাহ্ণ, ২০ জুলাই ২০২০

শাহীন আলম: প্রভাত থেকে গোধূলি বেলায় নিত্যদিন প্রিয় বিদ্যাপীঠে ঘড়ির কাঁটার ন্যায় চলত শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশনসহ নানা কর্মযজ্ঞ। এর মধ্যেই সাংস্কৃতিক থেকে রাজনৈতিক সব সংগঠনগুলো ব্যাস্ত থাকত জ্ঞান চর্চা, জ্ঞান বিতরণ এবং আহরণসহ ব্যাতিক্রমি মিটিং-মিছিল নিয়ে। আবার নানা আয়োজনে ক্যাম্পাসের রাস্তায় আল্পনার ছাপ দিতে হত চিত্রশিল্পীদের। এদের সবাই শিক্ষার্থী। দেশের নানা প্রান্তরে গড়ে উঠা সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর নিত্তনৈমিত্তিক কর্মসূচি থাকত এটি। ক্যাম্পাস নামক শব্দটি এমন রোমাঞ্চকর স্মৃতির ঝুড়ি নিয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্নার সাথে মিশে আছে। বলা হয়ে থাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় একটি দেশের মত। চলে রাজনীতি, গবেষণা এবং সচিবালয়ের আদলে দাপ্তরিক ব্যস্ততা। প্রতিটি মূহুর্তে এখানে থাকে উন্মুক্ত জ্ঞান চর্চার নির্মল পরিবেশ। এর প্রতিটি প্রাচীরের বেলকনিতে শতসহস্র আগামীর প্রজন্মরা ভীড় জমায় স্বপ্নের সমুদ্র নিয়ে।

তবে করোনার প্রাদুর্ভাবে সরকারি বিধি মেনে দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে প্রাণহীন ক্যাম্পাসে বড্ড বেমানান ভূতুড়ে পরিবেশ স্থান করে নিয়েছে অনায়সে। এখন সেখানে নিয়জিত পাহারাদারগণ ছাড়া তেমন কারও আনাগোনা নেই। তবে আদুরে প্রেমিকার মায়ার বাঁধনকে অনুভব করছে কি তার প্রেমিকেরা?

উত্তর খুজতে গেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু নাঈম বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়র পরিবেশটা একটু ভিন্ন। এ অনুভূতি শুধু ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই অনুভব করতে পারে। সবুজ এ ক্যাম্পাস সবসময়ই প্রাণচাঞ্চল্য। হোক সেটা ছুটির দিন বা খোলার দিন। কারণ অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসেই থাকেন। ফলে সবসময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, ক্যাফেটেরিয়া, শহীদ মিনার, নতুন কলা, পুরাতন কলা, ট্রান্সপোর্ট আর বটতলার বন্ধু আড্ডা লেগেই থাকে।
এদিকে মুক্তমঞ্চ এবং জহির রায়হান অডিটোরিয়ামে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কোনো না কোনো অনুষ্ঠান তো থাকেই। কিন্তু এ মহামারির কারণে ক্যাম্পাস বন্ধ রয়েছে। এখন অনেকটা প্রাণশূণ্য। তবে সবাই দূরে থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জুনিয়র-সিনিয়র, বন্ধু আর শিক্ষকদের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। আর সংগঠনগুলোর কার্যক্রমও থেমে নেই। সব সংগঠনই নিজেদের জায়গা থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে অনলাইন মাধ্যমে। ক্যাম্পাসের দোকানদার, রিকশা চালক আর কর্মচারীদের সহায়তায়ও তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তবে বন্ধুবান্ধবীদের খুবই মিস করছি। আশা করি খুব শিগগিরই আবার ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণ আড্ডা আর গানে করে প্রাণচাঞ্চল্যে ফিরিয়ে আনব।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী মুনাওয়ার রিয়াজ মুন্না বলেন, ‘সেই ১৭ মার্চ বিকেলের শেষ শাটলে চড়ে ক্যাম্পাস ছাড়লাম।একরকম প্রস্তুতিবিহীন যাত্রা, এরপর থেকে ভালবাসার আঙিনার সাথে দীর্ঘ বিচ্ছেদ! ঘুম থেকে ওঠেই ক্লাস, ঝুপড়িতে চা-আড্ডা আর গলা ফাটিয়ে গান এসব কিছুই যেন কেমন অতীত স্মৃতি হয়ে গেল। ক্লাসের অসমাপ্ত লেকচার, টিউটোরিয়াল, এসাইনমেন্ট, বন্ধু ও প্রিয়জনকে দেয়া প্রতিশ্রুতি সবকিছুই স্থবির হয়ে গেল এক অদৃশ্য শক্তির ভয়াল থাবায়। পড়াশোনার জন্য আমার গত ১০ বছর বাইরে থাকার সুবাধে একটানা ৩ মাস কখনোই পরিবারের সাথে থাকা হয়নি। তাই পরিবারের সদস্যদের সাথে হাসি-আনন্দ ও সাচ্ছন্দ্যে থাকলেও মনের মাঝে প্রিয় ক্যাম্পাসের প্রাণবন্ত প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে প্রতিনিয়ত। হৃদয় হাহাকার করে ওঠে সবুজ পাহাড়ঘেরা ২১০০ একরের চিরায়ত সে রুপ দেখার জন্য। সবসময় শাটলের হুঁইসেল, কাটাপাহাড়ের রাস্তায় সবান্ধব ছন্দময় পদচারণা আমাকে ভীষণভাবে মনকে ভারাক্রান্ত করে। আবার কবে ফিরবো প্রাণের ক্যাম্পাসে! কবে মিলবো অনুজ-সতীর্থদের আড্ডায়।’

ভীষণ আবেগ মিশিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারহানা নওশিন তিতলী জানান, সুদূর চীনের একটি ভাইরাস যে বাংলাদেশেও এত প্রকট আকারে আঘাত হানবে তা অকল্পনীয় ছিল। হঠাৎ এই ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে স্থগিত হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রথম ছুটি পেয়ে বাড়ির পরিবারের সাথে খুব ভালোই সময় কাটছিলো, কিন্তু ক্যাম্পাস যখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো তখন মনটা ভীষনভাবে ক্যাম্পাস কাতর হলো। ক্লাস, পরীক্ষা ও বিভাগের সবচেয়ে রাগী শিক্ষকের ক্লাসে হাঁপিয়ে ওঠা জীবন আজ ছন্দ হারিয়ে ভারাক্রান্ত। ক্লাস শেষ হলেই বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে হুটহাট করে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম, যা এখন কল্পনার কথা। ডাইনিংয়ের লাইন ধরে খাবার নিয়ে দিন শুরু হত। একাডেমিক পড়াশোনায় সবচেয়ে সিরিয়াস বান্ধবীসহ আজ সবার মনের অজান্তেই ক্যাম্পাসের স্মৃতি গুলো সবসময় স্মরণ করে দিচ্ছে। তারপরও দীর্ঘদিন পর এমন ছুটিতে বাড়িতে মা-বাবার স্নেহ ও ভাইবোনদের সাথে খুনসুটি করে সময় কেটে যাচ্ছে। তবে করোনা সকলকে দেখিয়েছে প্রকৃতি বা সৃষ্টিকর্তা চাইলে কি না করতে পারে! মানুষের কিছুই চিরস্থায়ী নয়। তাই আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা করা উচিত নয়। করোনা আমাদের একে অপরের প্রতি মানবিক হয়ে বাঁচতে শিখিয়েছে।’

লাল পাহাড়ের ক্যাম্পাস খ্যাত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তামান্না তাহসিন তন্নি বলেন, ‘আমি সবসময় উদ্যমী। তার মধ্যে ঠাঁই হলো লাল পাহাড় ও সবুজ ঘাসের বুকে। সবকিছু ঘটে অকল্পনীয় ভাবে যেমন গল্প, গান, সেমিনার, বিকাল হতে ক্যাম্পাসে হাঁটাহাটি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, নিত্যনতুন অনুষ্ঠানে আয়োজন নিয়ে দৌড়াদৌড়িতে ব্যাস্ত ছিলাম। আর ক্লাসের পরিক্ষা, এসাইনমেন্ট এবং মিডের ব্যস্ততা আরও বেশি ছিল। সবমিলিয়ে সহজ-সরল ও আনন্দে দিন কাটছিল। করোনার প্রাদুর্ভাবে হঠাৎই যেন সবকিছু থমকে গেছে। এর প্রভাবে অর্থনীতি, ব্যবসা, কর্মস্থল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ স্থগিত রয়েছে। তাও আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য, এখন মনের কোটরে বসবাস করছে লাল পাহাড়ে ক্যাম্পাস জগৎ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো এখন বর্ষা উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা হতো। পহেলা বৈশাখ পালন করতাম রংধনুর ন্যায় । ক্যাম্পাসে কাঁঠাল তলায় বসে লোক সংগীত হতো, অ্যাডেন অফ ফরেস্ট গিয়ে মুক্ত বাতাসে হৃৎস্পন্দন ঢেউ খেলতো। আর বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে প্রিয় মানুষ ও বন্ধুবান্ধব সবাইকে নিয়ে হয়তো ব্যস্ত সময় কাটত। কিন্তু এখন! এসব ভেবেই আনমনা হয়ে থাকি। কবে আসবে সেই সুস্থ পৃথিবী। আবার কবে আড্ডা দিবো লাবণ্যময় তনয়ার সাথে। আর সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি। আবার মুক্তি করে দাও প্রাণের ক্যাম্পাসটা।’

কাওসার/নিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: