প্রচ্ছদ / মানবজমিন / বিস্তারিত

যেভাবে প্রতারণা করতো ভুয়া নবাব

   
প্রকাশিত: ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ, ৫ নভেম্বর ২০২০

শুভ্র দেব: কথিত আলী হাসান আসকারীর ভুয়া নবাব সেজে প্রতারণার তথ্য পেয়ে খোদ তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাই বিস্মিত। লাভজনক প্রজেক্টে বিনিয়োগ ও বিদেশে ভালো চাকরি পাইয়ে দেয়ার আশায় অনেক মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই প্রতারক। ভুয়া এই নবাব প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে ঠিক কত টাকা নিয়েছে তার হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। তবে ভুক্তভোগীদের দেয়া তথ্যমতে এখন পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আলী হাসানের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে নড়েচড়ে বসেছেন ভুক্তভোগীরা। দেশের বিভিন্ন স্থানের ভুক্তভোগীরা পাওনা টাকার জন্য হতাশ হয়ে আছেন। উপায়ান্তর না পেয়ে তারা পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছেন। আবার কেউ কেউ আলী হাসানের এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

কিছু এজেন্ট আলী হাসান গ্রেপ্তারের পর থেকেই গাঢাকা দিয়েছেন। তবে কিছু এজেন্ট ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা না করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা বলছেন- মামলা করলে টাকা পাওয়া যাবে না। বরং অপেক্ষা করলে আলী হাসান জামিনে বের হওয়ার পর টাকা ফেরত পাওয়া যাবে।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) ইকোনমিক ক্রাইম ও হিউম্যান ট্রাফিকিং বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভুয়া নবাবকে প্রতারণা বিশেষজ্ঞ আখ্যা দিলে ভুল হবে না। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এর আগেও অনেক বড় মাপের প্রতারক ধরা পড়েছে। আলী হাসান খুবই ধুরন্ধর। একটা সাধারণ অবস্থান থেকে উঠে এসে সে তার প্রতারণার ফাঁদ দেশজুড়ে বিস্তৃত করেছে। নবাব পরিবারের সম্পত্তির লোভে ২০১৪ সাল থেকে সে মিথ্যা নবাব সেজে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা শুরু করে। আলী হাসান খুবই মিষ্টভাষী।

সে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ খানের নাতি হিসেবে পরিচয় দিতো। জন্ম সৌদি আরবের মক্কায়। বেড়ে উঠেছে নিউ ইয়র্কে। ব্যবসা করে দুবাইয়ে। স্থায়ী বসতি নেদারল্যান্ডসে। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মালিকানায় তার অংশীদারিত্ব রয়েছে। তার বাবা ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। নবাব পরিবারের নাতি হওয়াতে দেশে-বিদেশে তার সুনাম রয়েছে। এসব বলে আলী হাসান মানুষকে বশে আনতো। টার্গেট করে মানুষকে বশে এনে মিথ্যা প্রজেক্টে বিনিয়োগ করাতো। তার এজেন্টদের মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠানোর কথা বলে টাকা নিতো। বাস্তবে সে কাউকে কোথাও পাঠাতে পারেনি। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের বিভিন্ন সেক্টরে লোক লাগবে বলে প্রায় ৪০০ মানুষের তিন কোটি ৩৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তাদেরকে সিঙ্গাপুর পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আলী হাসান মেডিকেল বাবদ প্রতিজনের কাছ থেকে ৮ হাজার ৫০০ করে ৩৪ লাখ ও ওয়ার্ডবয় সার্টিফিকেট তৈরির কথা বলে আরো তিন কোটি টাকা নিয়ে যায়। কিন্তু টাকা নেয়ার পর আর তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। একইভাবে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর কথা বলে সিরাজগঞ্জের মঞ্জুর রহমানের কাছ থেকে ৫০ লাখ, জামালপুরের মাসুম হাসানের কাছ থেকে ৪৩ লাখ, নাঈমের কাছ থেকে ১৭ লাখ, গাজীপুরের তাজুলের চার লাখ, ইব্রাহিমের ১৭ লাখ, মিজানের দুই লাখ, গাইবান্ধার বিল্লাল হোসেনের ১৩ লাখ, ফখরুল আলম ভূঁইয়ার ৪ লাখ ৫০ হাজার, নোয়াখালীর আরেক ব্যক্তির ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর বাইরে মানুষকে সরকারি-বেসরকারি চাকরি, দেশে-বিদেশে ব্যবসাসহ নানা প্রলোভনে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ভুয়া নবাব।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভুয়া এই নবাব ঢাকার লালবাগ এলাকায় বেড়ে উঠেছে। সেখান থেকেই তার মাথায় ভুয়া নবাব সেজে প্রতারণার ফন্দি আসে। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিয়ে এক জায়গায় থাকতো না সে। ঘন ঘন বাসা বদল করতো। ২/৩ মাসের বেশি এক জায়গায় অবস্থান করতো না। প্রতারণার অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে লোক দেখানো সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতো। করোনাকালে মাস্ক, স্যানিটাইজার থেকে শুরু করে খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ করেছে। প্রতারণার কৌশল হিসেবে টার্গেট করে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে দিয়েও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করিয়েছে। পরে ওইসব ব্যক্তিকে বিভিন্ন মিথ্যা প্রজেক্ট দেখিয়ে আবার বিনিয়োগও করিয়েছে। এসব টাকা আদতে কোনো বিনিয়োগ হয়নি। সব টাকাই ভুয়া নবাবের পকেটে যেতো।

অবস্থান জানান দিতে আলী হাসানের স্ত্রী মেরিনা আক্তার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন। এ ছাড়া চলতি বছরের ঢাকা-১০ আসনের উপ-নির্বাচনে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের হয়ে আলী হাসান আসকারীও নির্বাচন করেছিলেন। ওই নির্বাচনে সে ১৫টি ভোট পায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কথিত আলী হাসান আসকারী ২০১৪ সালে নিজের নামের আগে নবাব ও পরে আসকারী যুক্ত করে মানুষকে বোকা বানানো শুরু করে। তার মূল লক্ষ্য ছিল নবাব পরিবারের উত্তরসূরি সেজে নবাব এস্টেটের সম্পত্তি দখল করা। এ জন্য সে কয়েকটি মামলাও করেছিলেন। প্রতারণার অংশ হিসেবে সে শুধু তার নামই পরিবর্তন করেনি তার স্ত্রী-সন্তানদের নামও পরিবর্তন করেছে। এ ছাড়া তাদের শিক্ষাগত সনদ থেকে শুরু করে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট সবকিছুই নাম পরিবর্তন করে নবাব ও আসকারী সংযুক্ত করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নবাব পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে প্রচারণা চালাতো সে।

সিটিটিসি’র ইকোনমিক ক্রাইম ও হিউম্যান ট্রাফিকিং বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ভুয়া নবাব গ্রেপ্তারের পর থেকে বহু অভিযোগ আসছে। আমরা এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছি। যারা মামলা করতে আগ্রহী তাদেরকে দিয়ে মামলা করাচ্ছি। আমরা জানার চেষ্টা করছি প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া টাকা কোথায় রেখেছে। তার সহযোগী যাদেরকে গ্রেপ্তার করেছি তাদের তিনজনই তার ভাই। তারা রিমান্ডে। তাদের এক ভাই সৌদি আরবে ২০০৫ সালে মৃত্যুবরণ করেছে বলে জানিয়েছে। তিনি বলেন, তার প্রকৃত পরিচয় বের করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। সূত্র: মানবজমিন।

এমআর/এনই

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: