নৌকা ডোবাতে মরিয়া দলের এমপিরা

   
প্রকাশিত: ১০:০১ পূর্বাহ্ণ, ২০ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: ইন্টারনেট

রফিকুল ইসলাম রনি: দলের মনোনীত প্রার্থী পছন্দ না হলেই বিদ্রোহী দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন এমপি-মন্ত্রীরা। শুধু তাই নয়, প্রশাসন ও দলীয় কর্মীদের প্রভাবিত করে তারা বিজয়ী করে নিচ্ছেন নৌকাবিরোধীদের। এ নিয়ে কেন্দ্রকে জানানোর পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বরং ভোটের শেষে মন্ত্রী-এমপিরা বিদ্রোহীদের বিপক্ষে যাওয়া নেতা-কর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রমতে, আওয়ামী লীগের তীব্র অন্তর্কোন্দলের প্রভাব পড়ছে পৌরসভা নির্বাচনে। পরাজিত আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের অনেকেই তাদের পরাজয়ের পেছনে নিজ দলের নেতা, এমপি-মন্ত্রীদের অসহযোগিতাকে দায়ী করছেন। আগামী ৩০ জানুয়ারি তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠেয় ভোটেও নৌকার বিরোধিতা করছেন দলীয় এমপিরা। কোথাও প্রকাশ্যে, কোথাও আড়াল থেকে ইন্ধন দিয়ে নৌকা ডুবাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তারা। অনেক পৌরসভায় ভোট হচ্ছে, ‘আওয়ামী লীগ’ বনাম এমপি লীগের মধ্যে।

তৃতীয় ধাপের বরগুনার পাথরঘাটায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আনোয়ার হোসেন আকন। তিনি স্থানীয় এমপি বরগুনা-২ আসনের এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমনের বিরোধী হিসেবে পরিচিত। সে কারণে পাথরঘাটা থেকে প্রথমে আনোয়ার হোসেন আকনের নাম পাঠানো হয়নি। জেলা থেকে নাম পাঠানো হলে কেন্দ্র তাকে নৌকা প্রতীক দেয়। এতে বিপত্তি বাধেন এমপি শওকত হাসানুর রহমান রিমন। নৌকার বিপক্ষে তার দুজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী দাঁড় করিয়েছেন। তারা হলেন শ্রমিক লীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল ও সাবেক জামায়াত নেতা এবং এমপির ব্যবসায়িক পার্টনার মাহবুর রহমান। আওয়ামী লীগ বনাম এমপি লীগ ভোট হওয়ায় বিভ্রান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা।

তৃতীয় ধাপে রাজবাড়ীর পাংশায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ওয়াজেদ আলী। তার আরেক ভাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার ‘নিয়ন্ত্রণ’ হাত ছাড়া হওয়ার ভয়ে রাজবাড়ী-২ আসনের এমপি জিল্লুল হাকিম নৌকার প্রার্থীর বিরোধিতা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দলীয় নেতা-কর্মীরাও নৌকার প্রার্থীকে সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ ওয়াজেদ আলীর। তিনি বলেন, একটি বিশেষ মহলের ইন্ধনে উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ফজলুল হক ফরহাদ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে কাজ করছে। স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও তেমন সহযোগিতা করছেন না। তৃতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে নোয়াখালীর চৌমুহনী পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আক্তার হোসেন ফয়সল। দলের প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায় এখানে স্থানীয় এমপি মামুনুর রশিদ কিরণ তার ভাই খালেদ সাইফুল্লাহকে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।

একই অবস্থা বগুড়ার ধুনট পৌরসভায়। এখানে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন টিআই নুরন্নবী। স্থানীয় এমপি হাবিবুর রহমানের পছন্দের প্রার্থী ছিলেন বর্তমান মেয়র এ জি এম বাদশা। নুরন্নবী নৌকা প্রতীক পাওয়ায় বাদশা এমপির মদদেই বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে মাঠে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিগত পৌরনির্বাচনে বাদশা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। বিজয়ী হওয়ার পর স্থানীয় এমপিই তাকে আবার দলে ভেড়ান। এবারও বহিষ্কার করা হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপের পৌর ভোটেও এমপি-মন্ত্রীরা নৌকার বিরোধিতা করেছেন। একজন প্রতিমন্ত্রী এলাকায় নৌকার প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। আরেকজন প্রতিমন্ত্রীর নিজ ভোট কেন্দ্রে সর্বনিম্ন ভোট পেয়েছেন নৌকার প্রার্থী। অভিযোগ রয়েছে এ দুজন প্রতিমন্ত্রীই নৌকাবিরোধী ছিলেন।

হবিগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য হলেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় মাধবপুর পৌরসভার ভোটে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। পৌরসভাটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শ্রীধাম দাশ গুপ্ত পেয়েছেন মাত্র ৬০৮ ভোট। এখানে বিজয়ী বিএনপির হাবিবুর রহমান মানিক পান ৫ হাজার ৩১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী পংকজ কুমার সাহা পান ৪ হাজার ১৫৬ ভোট। আওয়ামী লীগের অপর বিদ্রোহী মুক্তিযোদ্ধা শাহ মো. মুসলিম পান ৩ হাজার ৪৯ ভোট। দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের এমপি ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের নিজ কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শহীদুজ্জামান শাহিদ ভোট পেয়েছেন মাত্র ৭৭। আর বিদ্রোহী প্রার্থী মুক্তার আলী পেয়েছেন ১ হাজার ১৯৫ ভোট। বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন ৯৫ ভোট। মোট ভোটার ছিলেন ১ হাজার ৭০০ জন। শনিবার অনুষ্ঠিত রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী পৌরসভায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী মুক্তার আলী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর আশীর্বাদেই বিজয়ী হয়েছেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী শহিদুজ্জামান শাহীদ বলেন, ‘তিনি নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে নানাভাবে বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। প্রশাসনের কোনো সহায়তা পাননি। প্রতিমন্ত্রীকে বলেছিলাম, সব কেন্দ্রে হারলেও আমার কষ্ট নেই। আপনার কেন্দ্রে ১ ভোটে হলেও আমাকে ফার্স্ট করবেন। কিন্তু ফলাফল উল্টো হলো। সেখানে নৌকা সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছে। এতেই বোঝা যায় ভোটে কার অবস্থান কী ছিল।’

দ্বিতীয় ধাপে শেষ হওয়া সিরাজগঞ্জের বেলকুচি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী বেগম আশানুর বিশ্বাস গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছেন, প্রশাসন ও নেতা-কর্মীদের প্রভাবিত করে তাকে হারিয়ে দিয়েছেন স্থানীয় এমপি আবদুল মোমিন মন্ডল। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যারাই নৌকার বিরোধিতা করছেন, তারা যতই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নেতা হোন না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাজ করছেন। নৌকাবিরোধীদের শাস্তির মুখোমুখি করা হবেই, এবার কোনো ছাড় নয়।’ সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

আমিনুল/শিইসি

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: