প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

দুঃখিনী মায়ের কান্না, মোবাইল-ল্যাপটপ নিয়ে কোথায় গেল নর্থ সাউথের ছেলেটি?

   
প্রকাশিত: ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ, ২১ জানুয়ারি ২০২১

ছেলেকে ফিরে পেতে অনবরত কেঁদে যাচ্ছেন এক দুঃখিনী মা। তার নাম মনোয়ারা হোসেন (৪৫)। আর নিখোঁজ ছেলেটির নাম সাদমান সাকিব রাফি। বয়স মাত্র ২৩। সৌদি আরবেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বর্তমানে পড়াশোনা করছিলো নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিপল ই সাবজেক্ট নিয়ে। এর আগে মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করতো সে। রহস্যজনভাবেই হঠাৎ এই ছেলেটি নিখোঁজ হয়ে যায়। নিখোঁজ হয়েছে রাজধানী ঢাকা খেকে।

গত ১৩ জানুয়ারি রাজধানীর ভাটারা থানায় দায়ের করা নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি কপিতেই র‌হস্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘আমার ছেলে মাঝে মধ্যে কিছু একটা বিষয় নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত থাকে। সে গত নভেম্বর/২০ তারিখে এ্যাপোলো হাসপাতালে ডাক্তারের নিকট চিকিৎসা গ্রহণ করেছে।’

কিন্তু কি নিয়ে ছেলেটি খুব বেশি চিন্তিত থাকতো? সেটিকে ঘিরেই ছেলেটির সন্ধানে মাঠে তোড়জোড়ভাবে নেমে পড়েছে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীসহ দেশের শীর্ষ পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

ছেলেটির মা মনোয়ারা হোসেন আরটিভি নিউজকে বলেন, মহামারি করোনার কারেন ছেলেটি মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে চলে আসে গত ১৯ সেপ্টেম্বর। ওই দেশের এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে (এপিইউ) ত্রিপল ই বিভাগে ১ বছর যাবত পড়াশোনা করছিলো সে।

এরপরই দেশে ফিরে রাজধানী ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ত্রিপল ই সাবজেক্টেই ভর্তি হয় সাদমান রাফি। ৩ ভাই বোনের মধ্যে সাদমান রাফি ২য়। ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই শান্ত স্বভাবের বলে জানান মা মনোয়ারা।

সাদমান রাফির মা বলছেন, আমার ছেলে কখনোই বাসা থেকে না বলে বের হয় না। আর বলে বের হলেও ৩০ মিনিটের বেশি সময় বাইরে থাকে না। ওই বাংলাদেশি কোনো ফ্রেন্ড সার্কেল নেই। যেহেতু ও বিদেশ থেকে নতুন এসেছে, তাই ও ঢাকার শহর অতোটা চিনেও না।

কান্না জড়িত কণ্ঠে এই দুঃখিনী মা বলেন, মহান আল্লাহ্ তা’য়ালার কাছে চাওয়া এখন একটাই, আমার কলিজার টুকরা ছেলেটাকে যেনো ফিরে পাই। ও যেমন সুস্থ স্বাভাবিকভাবে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিলো, ঠিক তেমনভাবেই যেনো ওকে ফিরে পাই। ওর কাছে কোনো সন্দেহজন ফোনকল বা এসএমএস পাইনি। এ জন্য একটু বেশি চিন্তিত। এক সপ্তাহ হলো আমার আদরের ছেলেটা আমার কাছে নাই। ওর জন্য পরিবারের সবাই খুবই চিন্তিত। ওর ভাই বোনরা কান্নাকাটি করছে, ওকে ছাড়া খাবার খাচ্ছে না। এক কথায় আমাদের স্বাভাবিক জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে। যেকোন মূল্যে হোক আমার ছেলেকে আমি ফিরে পেতে চাই।

রাফির মায়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাদমান রাফি ওপিডি’তে (অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার) আক্রান্ত। মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরার পর এ্যাপলো হসপিটালে মনোবিজ্ঞানী নিগার সুলতানার অধীনে চিকিৎসা চলছিল। রাফির বড় বোন চিকিৎসক। রাফির ছোট ভাই তার চেয়ে ১ বছরের ছোট। এই দুই ভাই সৌদি আরবে জন্ম গ্রহণ করেছিলো। লকডাউনে মালয়েশিয়া থেকে ফেরার পর সে বাসায় থাকত তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গেই। বাসায় কেবল মুভি দেখত। তার বন্ধুদের সবাই কানাডা, ইউকে ও আমেরিকায় পড়াশুনা করে। মাললেশিয়ার এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির ত্রিপল ই বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের জন্য আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি টাকা জমা দেওয়ার কথা ছিল। এখন তার সকল ক্লাশ অনলাইনে চলছে। কিন্তু বাসায় একেবারে চুপচাপ, কারো সঙ্গে আড্ডা দেয় না এমনকি জঙ্গি বিষয়ে তার মধ্যে প্রচন্ড ঘৃণাবোধ কাজ করে। কি কারণে সে বাসা থেকে চলে গিয়েছে তার উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে এই মা।

এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে সাদমান রাফি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার কোন তথ্য প্রমান খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমরা চক্রবর্তী আরটিভি নিউজকে বলেন, নিখোঁজ রাফিকে খুঁজে পেতে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। সাধারণত নিখোঁজ সংক্রান্তে কোনো জিডি হলে অতীতে আমরা দেখেছি ‘উগ্রবাদে’ জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি উঠে আসে। আবার অপহরণ করে মুক্তিপন আদায়ের ঘটনাও ঘটে। তবে রাফি নিখোঁজের জিডি তদন্তে আমরা এখনো জঙ্গিবাদ ও অপহরণ করে মুক্তিপন চাওয়ার বিষয়ে কোনো তথ্য প্রমান পাইনি। ছেলেটিকে খুঁজে বের করতে প্রযুক্তির সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। পরিবারের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, ছেলেটি নিঃসঙ্গ জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলো। কেনো সে বাংলাদেশে এসেছিলো, এবং কাদের সাথে চলতো এই বিষয়গুলোসহ সকল বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত অব্যহত রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৩ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রাফি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সি ব্লকের ৫/এ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান রাফি। সঙ্গে নিয়ে যান তার ল্যাবটপ ও মোবাইল ফোন সেট। বাসা থেকে বের হয়েই রাফি তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দেন। নিখোঁজ রাফি মালয়েশিয়ার এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির (এপিইউ) ত্রিপল ই বিভাগের ছাত্র। গত ১৯ সেপ্টেম্বর লকডাউনের মধ্যে তিনি মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরেন। সেখান থেকে দ্বিতীয় সেমিস্টার শেষ করার পর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ত্রিপল ই বিভাগের প্রথম সেমিস্টারে ভর্তি হন। নিখোঁজের ঘটনায় তার মা মনোয়ারা হোসেন ভাটারা থানায় জিডি করেন। রাফি নিখোঁজের পর তার বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট তদন্ত করে। এছাড়াও দেশের শীর্ষ পর্যায়ের দু’টি গোয়েন্দা সংস্থা কাজ অনুসন্ধান চালাচ্ছে। রাফির ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও ফেসবুক যাচাই বাছাই করছে তারা। বাসায় রাফির ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসগুলোও তল্লাশি করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ভাটারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোক্তারুজ্জামান বলেন, রাফিদের বাসার সামনের এক বাড়ির সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ তল্লাশি করে দেখা গেছে যে ১৩ জানুয়ারি সকাল ৯ টা ২২ মিনিটে তিনি হাতে ল্যাবটপ নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। কোনও বিষয়ে নিয়ে তার মধ্যে কোনো হতাশা কাজ করছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া বিষয়টি সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা আছে কি না- সে বিষয়ে তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও ফেসবুক আইডি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

কাওসার/নিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: