কারাগারে নারীর সঙ্গে আসামি: কে কত টাকা ঘুষ পান?

   
প্রকাশিত: ৯:৫০ অপরাহ্ণ, ২৪ জানুয়ারি ২০২১

নিয়ম ভেঙে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে এক নারীর সঙ্গে হলমার্ক কেলেঙ্কারির সাজাপ্রাপ্ত বন্দি তুষারের সময় কাটানোর জন্য কয়েকজনকে ঘুষ দিয়েছিলেন। এরমধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারি রয়েছেন। আজ রোবাবার (২৪ জানুয়ারি) কারা মহাপরিদর্শকের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার রত্না ও জেলার নূর মোহাম্মদ মৃধাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।

এরআগে এ ঘটনায় ডেপুটি জেল সুপার মোহাম্মদ সাকলাইন, সার্জেন্ট আব্দুল বারী ও সহকারী প্রধান কারারক্ষী খলিলুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়। গত ৬ জানুয়ারি গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের পার্ট-১ এ আটক হলমার্ক কেলেঙ্কারির হোতা মালিক তানভীরের ভায়রা কোম্পানির জিএম তুষারের সাথে এক নারী সাক্ষাৎ করেন। সিসিটিভিতে দেখা যায়, ডেপুটি জেলার সাকলাইন ১২টা ৫৭ মিনিটে কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করে ১টা ০৪ মিনিটে তুষারকে সাথে নিয়ে ওই নারীর সাথে সাক্ষাৎ করতে একটি কক্ষে নেন। ১টা ১৫ মিনিটে জেল সুপার কারাগার থেকে বের হয়ে যান। এরপর তুষার একটি কক্ষে প্রায় ৪৬ মিনিট সময় কাটায় ওই নারীর সাথে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ঘটনার সার্বিক বিষয় সম্পর্কে জানতে গিয়ে জেল সুপারের কাছে টাকা লেনদেনের বিষয়টি উঠে আসে। ১২ জানুয়ারি আনুমানিক বেলা সাড়ে ১১টায় একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা জেল সুপারের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তারা জানান, অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে সহযোগিতা করে জেলার নুর মোহাম্মদ ১ লাখ, ডেপুটি জেলার ২৫ হাজার এবং অন্যান্য সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর, গেট সহকারী প্রধান কারারক্ষী ৫ হাজার টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন। এই ঘটনা সম্পর্কেও তিনি কিছুই জানেন না।

জানা যায়, কারাগার অনুসরণে রাখেন এমন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধির মাধ্যমে জেল সুপার রত্না রায় জানতে পারেন, একজন সাধারণ বন্দির সঙ্গে অফিস কক্ষে তিনজনের সাক্ষাৎ হয়েছে। এদের মধ্যে একজন মহিলা। বন্দি তুষার ওই মহিলাকে সঙ্গে নিয়েই ৬ জানুয়ারি কারা অফিসের একটি রুমে দীর্ঘ সময় কাটান। কারাভ্যন্তরের দায়িত্বশীল বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার পর জেল সুপার নিশ্চিত হন বিষয়টির সঙ্গে জেলার নুর মোহাম্মদ মৃধা জড়িত। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের সামনে জেলার নুর মোহাম্মদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সব অস্বীকার করেন।

কারা সূত্র জানায়, মহিলাসহ তিনজন কারাগারের অফিস কক্ষে প্রবেশ করেন ৬ জানুয়ারি ১টা ৫৬ মিনিটে। কারা সেল থেকে হলমার্ক কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা তুষার কারা অফিস কক্ষে আসেন ২টা ৪ মিনিটে। এরপর জেল সুপার রত্না রায় অফিস কক্ষ থেকে বের হয়ে যান ২টা ১৫ মিনিটে। কারা অফিসের একটি কক্ষে টানা ৪৫ মিনিট অবস্থান করেন তুষার ও ওই সুন্দরী নারী।

এদিকে প্রতিবেদনে জেল সুপার উল্লেখ করেন, বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সরকারিভাবে সব শ্রেণির বন্দিদের জন্য পারিবারিক সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ। শুধু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা জেলারের অনুমতি সাপেক্ষে কারাগারের অফিসে প্রবেশ করে থাকেন। কাজেই জেলারের অথবা কর্তব্যরত ডেপুটি জেলার অথবা গেট কারারক্ষীর অবহিতকরণ ছাড়া কেউ অফিসে প্রবেশ করছেন, তা কোনো সুপারের পক্ষে জানা সম্ভব না।
অধিকন্তু শ্রেণিপ্রাপ্ত বন্দিসহ বিশেষ শ্রেণির বন্দির অফিসে সাক্ষাতের জন্য দরখাস্তের মাধ্যমে সুপারের অনুমোদন সাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সাক্ষাতের বিষয়ে জেল সুপারের জানার বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ নেই। করোনাকালীন কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের বাহির গেট (আরপি গেট) দিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কারোরই প্রবেশের সুযোগ নেই।

সামগ্রিক বিষয়টি ওয়াকিটকির মাধ্যমে না বলে গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে হওয়ায় জেল সুপার জানতে পারেননি। প্রতিবেদনের এক স্থানে বলা হয়, হাজতি বন্দি তুষার আহমেদ একজন সাধারণ বন্দি। তিনি শ্রেণিপ্রাপ্ত নন। এ কারণে তার অফিসে এসে সাক্ষাতের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি জেলারসহ সংশ্লিষ্টরা অবগত আছেন। ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলাইন ও গেট ওয়ার্ডার সহকারী প্রধান খলিলুর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, তারা জেলারকে অবগত করে বন্দি তুষারকে অফিসে নিয়েছেন। তৎসম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলাইন মধ্যাহ্নকালীন ডিউটি অফিসার ডেপুটি জেলার তানিয়া ফারজানা, গেট ওয়ার্ডারও জেল সুপারকে কিছুই জানাননি।

ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলাইন নিজে কারাভ্যন্তরে প্রবেশ করে হাজতি বন্দি তুষারকে অফিসে নিয়ে আসেন। এ সময় কয়েদি বন্দি আ. রউফ মিয়া সাকলাইনের সঙ্গে ছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজের রেকর্ড থেকে এসব তথ্যচিত্র ধরা পড়ে। সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে জেল সুপার প্রতিবেদনে বলেন, হাজতি বন্দি তুষার এবং ওই মহিলা জেলারের রুমের দিকে যায়। ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলাইন তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, বন্দি তুষার এবং ওই মহিলার সাক্ষাতের বিষয়টি জেলার জানেন।

এদিকে জেল সুপারের প্রতিবেদনে কয়েদি বেঞ্চে বসে তুষার ও ওই মহিলার সাক্ষাতের কথা বলা হয়। অন্যদিকে ডেপুটি জেলার তানিয়া ফারজানা তার জবানবন্দিতে বলেন, ওইদিন দুপুর পৌনে ১টার দিকে তিনি বাসায় যান। পৌনে ৩টার দিকে অফিসে প্রবেশ করে দেখতে পান ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলাইনের অফিস কক্ষে সাক্ষাৎ চলছে। এ বিষয়ে জেল সুপার রত্না রায়ের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক দুটি নম্বরে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে এ বিষয়ে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় গাজীপুর জেলা প্রশাসকের অতিরিক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবুল কালামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত টিম কাজ করছে। তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে সাক্ষাতের বিষয়টির সত্যতা পেয়েছে বলে জানান গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম। দেশের ইতিহাসে সবচে বড় ঋণ কেলেঙ্কারি কারণে হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ ও তার ভায়রা প্রতিষ্ঠানের জিএম তুষার ২০১২ সাল থেকে কারাগারে রয়েছেন

নাঈম/নিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: