প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

শাহীন মাহমুদ রাসেল

কক্সবাজার প্রতিনিধি

অন্যের জমি দখলে নিতে প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙ্গিয়ে বঙ্গবন্ধুর নামে আশ্রয়ন

   
প্রকাশিত: ৪:৫৫ অপরাহ্ণ, ১৮ এপ্রিল ২০২১

কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের তৈতৈয়া রফিকের ঘোনা এলাকায় বিচারক, আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতাসহ পাঁচটি পরিবারের দুই একরের বেশি কৃষিজমি জোরপূর্বক দখল করে ফেলা হয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গা বসতি স্টাইলে অর্ধশতাধিক ঘরও নির্মাণ করে ফেলেছেন দখলদাররা। পাশাপাশি ওই এলাকার পূর্বের নাম রফিকের ঘোনা পাল্টে রাতারাতি ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, কক্সবাজার-রামু আসনের সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে উক্ত জমি দখল করেছেন খুরুশকুল ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শেখ কামাল ও তার ভাই কামাল উদ্দিন। এছাড়া জমি দখল করতে উসকানি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজার সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নু-এমং মারমা মং এর বিরুদ্ধে।

জোরপূর্বক যে জমি জবরদখল করা হয়েছে সেটির মালিক হলেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বৃটিশ ভারতের ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ফৌজ আর্মির সদস্য মৃত আবুল হোসেন। তিনি খুরুশকুলের তৈতৈয়া এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে উত্তরাধিকার সূত্রে চট্টগ্রাম আদালতে কর্মরত সিনিয়র সহকারী জজ কামাল উদ্দিন, হাইকোর্টের আইনজীবী বোরহান উদ্দীন রব্বানীসহ পাঁচজন ব্যক্তির পরিবার এসব কৃষিজমির মালিক।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানান, ব্রিটিশ আমল থেকে খুরুশকুল-মৌজার বি.এস ৩৯৮নং খতিয়ানের বি.এস ৪৪৬৬ দাগের ৩.৪৪ একর জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন তারা। কিন্তু গত ১১ এপ্রিল গভীর রাতে কোন কারণ ছাড়াই এমপি কমলের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য শেখ কামাল ও তার বড় ভাই কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী সবজি ক্ষেত উপড়ে ফেলে দুই একরের বেশি জায়গা দখল করে ঘর নির্মাণ শুরু করে। বিষয়টি ভুক্তভোগীরা প্রশাসনকে অবগত করেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিচারক কামাল উদ্দিনের বাবা ও খুরুশকুল ১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি মো. রফিক অভিযোগ করে বলেন, ‘সদর এসি-ল্যান্ডের উসকানিতে এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলের নাম ভাঙিয়ে তাদের কৃষিজমি দখল করেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।’ একই অভিযোগ আইনজীবী বোরহান উদ্দীনসহ ভুক্তভোগী অন্যান্যদের।

সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, এরই মধ্যে দখলদার চক্রটি কৃষিজমির সবজি ক্ষেত নষ্ট করে সেখানে ২৭টি ঘর নির্মাণ করেছে। আরও প্রায় ২৫টি ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখার আশায় প্রায় প্রতিটি ঘরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজিব ওয়াজেদ জয়ের ছবির পাশাপাশি স্থানীয় সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান এবং উদ্যোক্তা হিসেবে অভিযুক্ত কামাল উদ্দীনের ছবিযুক্ত ব্যানার টাঙানো হয়েছে।

এ সময় সংবাদকর্মীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য শেখ কামাল দলবলসহ সেখানে উপস্থিত হন। তিনি বলেন, ‘জায়গাটি ব্রিটিশ আমল থেকেই রফিকুল ইসলামের পরিবার ভোগদখল করে আসছে। আমরা এতদিন জানতাম জায়গাটি ‘জোত জায়গা’। কিন্তু সদর এসিল্যান্ড এটি খাসজমি বলে আমাদের নিশ্চিত করেছেন। এ কারণে এ জমিতে স্থানীয় গৃহহীনদের ঘর করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে যারা ঘর নির্মাণ করেছেন তাদের কারোরই ঘর নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না বলা পর্যন্ত তারা কেউ দখল ছেড়ে যাবে না। আর যদি রেজিস্ট্রি জায়গা প্রমাণ হয় তবেই সবাইকে আবার উচ্ছেদ করা হবে।’

সরকারি জমিতে দলবল নিয়ে অবৈধভাবে দখল করে ঘর নির্মাণ করা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কামাল বলেন, ‘গৃহহীনদের দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না।’ তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে একই কথা বলেছেন গৃহহীন দাবি করা ও ঘর নির্মাণ করে সেখানে অবস্থান করা নুরুল আলম, মো. সালামসহ অনেকেই।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দখল করাদের কেউ গৃহহীন নয়। বেশিরভাগ ওই এলাকার বাসিন্দাও নয়। তাদের ভাড়াটিয়া হিসেবে আনা হয়েছে। আবার কেউ কেউ জমি পাওয়ার আশায় টাকা দিয়ে সেখানে ঘর নির্মাণ করেছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্বাস্তু কিছু পরিবারকে কক্সবাজার শহর থেকে নিয়ে এসে খুরুশকুলের তৈতৈয়ায় রফিকের ঘোনা এলাকায় সামাজিক বনায়নের জায়গায় পুনর্বাসন করার কথা ছিল। কিন্তু বনায়নের উপকারভোগীদের পক্ষে মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি সরকারি বনের জমি রক্ষায় হাইকোটে রিট আবেদন করলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন হাইকোট। পিটিশন নং ৪১৭০/২০২১। উচ্চ আদালতের এ নিষেধাজ্ঞার কারণে বনভূমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্প আটকে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন স্থানীয় ইউপি শেখ কামাল, তার বড় ভাই কামাল উদ্দীনসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

স্থানীয়দের দাবি, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অনেক পরিবারের কাছ থেকে ৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে ওই চক্রটি। অন্যদিকে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি আদালতের নির্দেশে আটকে যাওয়ায় কোন উপায় না পেয়ে বিচারক, আইনজীবীর পরিবারের কৃষিজমি দখলে নিয়েছেন তারা।

জানতে চাইলে কথিত উদ্যোক্তা ও দখলদার হিসেবে অভিযুক্ত কামাল উদ্দীন কামাল বলেন, ‘এটি কারও ব্যক্তিগত জায়গা নয়। এসিল্যান্ড বলেছেন, এটি সরকারি জমি। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই ওই জমিতে গৃহহীনদের জন্য ঘর করা হচ্ছে।’ বনভূমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্প করার বিষয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এরপরও অন্যের জমি দখল করে আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ জন্য যদি জেল-ফাঁসি হয় আমার কোনো আপত্তি নেই।’

স্থানীয় বাসিন্দা মাওলানা নুরুল আবছার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, ১৯৩৮ সাল থেকে ওই জমি মৃত আবুল হোসেনের পরিবার ভোগদখল করে আসছে। কিন্তু গত কয়েকদিন আগে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চিহ্নিত কিছু অপরাধীরা তা দখল করে ঘর নির্মাণ করেছে।’

জানতে চাইলে খুরুশকুল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন বলেন, ‘স্থানীয় ইউপি সদস্য শেখ কামাল ও তার বড় ভাই কামালের নেতৃত্বে বিচারক-পরিবারের কৃষিজমি দখল করে ফেলা হয়েছে। আমি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বিষয়টি অবগত করেছি। আশা করছি, তারা ব্যবস্থা নেবেন।’

এদিকে স্থানীয়রা জানান, দখলদাররা ক্ষমতাসীন দলের দুই নেতার নাম ব্যবহার করলেও তারা মূলতো এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ইউপি সদস্য শেখ কামাল এমপি কমলকে ভুল বুঝিয়ে তার সমর্থন আদায় করেন। কমলের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েই অন্যের জমি দখল করেছেন তারা। এছাড়া স্থানীয় চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ান সেজন্য পৌর মেয়র মুজিবুর রহমানের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।

কক্সবাজার পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের কাছে তার নাম ভাঙিয়ে অন্যদের জমি জবরদখলের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তখন তিনি বলেন, ‘তাদের আমি খেয়ে না খেয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করেছি, এ কারণে আমার নাম ব্যবহারের চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা। কিন্তু সহযোগিতা করেছি বলে মাথায় উঠবে, এমনটা হতে পারে না। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে শনিবার সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের ব্যবহৃত মুঠোফোন একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেনি। এরপর অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

তবে এর আগে এ বিষয়ে আলাপকালে সাংসদ কমল বলেন, ‘বিষয়টি কক্সবাজার সদর এসিল্যান্ড আমাকে অবগত করেছেন। আমার নাম বিক্রি করলে তো হবে না। মূলতো ওখানে কক্সবাজার শহরের কিছু মানুষকে পুনর্বাসন করার কথা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় মেম্বার কামাল ও স্থানীয়রা দাবি করতেছে, অর্ধেক জায়গা লোকাল ভূমিহীন মানুষগুলোকে দেওয়া হোক। এ কারণে তারা কিছু প্লাস্টিকের ঘর নির্মাণ করে ফেলেছে।’

বিচারক কামাল উদ্দীনের পরিবারের কৃষিজমি দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এর ঘটনায় কেউ ভুক্তভোগী হলে তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। তখন বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখবো।’

কিন্তু বিচারক কামাল উদ্দিনের অভিযোগ, এমপি কমলের ব্যবহৃত মুঠোফোনে অসংখ্যবার কল দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে খুদেবার্তা পাঠালেও এমপি সাড়া দেননি।

এদিকে ভূমি দখলে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কক্সবাজার সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নু-এমং মারমা মং। তিনি বলেন, ‘যেহেতু মহামান্য হাইকোর্ট আশ্রয়ণ প্রকল্পটি বাতিল করে দিয়েছেন, তাই এ বিষয়ে আর মাথা ব্যাথা করার প্রয়োজন মনে করি না আমি।’

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, ‘এসিল্যান্ড যেখানে সরকারি জায়গা রক্ষা করতে পারে না। সেখানে অন্যের জমি দখলের জন্য উসকানি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি কেমন জানি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। এরপরও বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান বলেন, ‘কৃষিজমি জবরদখল করে অবৈধভাবে ঘর নির্মাণের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

নাঈম/নিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: