প্রচ্ছদ / ক্যাম্পাস / বিস্তারিত

এবার লীনা তাপসী খানের বিরুদ্ধে গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ

   
প্রকাশিত: ১০:০২ অপরাহ্ণ, ১৩ জুন ২০২১

ছবি: ইন্টারনেট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সঙ্গীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মহসিনা আক্তার খানমের (লীনা তাপসী খান) বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) সাবেক মহাপরিচালক ও সংগীত শিল্পী ইফফাত আরা নার্গিস।রোববার (১৩ জুন) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত উক্ত এ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান।

ইফফাত আরা নার্গিস বলেন, একজন সংগীতশিল্পী হয়ে সংগীত গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি আমাকে খুবই আহত করেছে। সংগীত বিষয়ে একজন শিক্ষকের রীতিমত প্রাতিষ্ঠানিক অপকর্ম আজ আমাকে বিষয়টি তুলে ধরতে বাধ্য করেছে। আমি ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে তার চৌর্যবৃত্তি নিয়ে অভিযোগ তুলছি। সেই শিক্ষকের নাম মহসিনা আক্তার খানম। যিনি কিনা তাপসী খান ছদ্মনামে সংগীতজগতে পরিচিত। তার মতো একজন পরিচিত শিল্পী ও শিক্ষক যখন চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় নেন, তখন আমাদের কষ্ট হয়। অভিযোগটি তদন্তপূর্বক শাস্তি প্রদানের দাবিতে আমার এই বিবেকতাড়িত প্রতিবাদ।

তিনি বলেন, সংগীতের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে আমি লীনা তাপসী খানের নজরুল-সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার গ্রন্থটি সংগ্রহ করি। কিন্তু বইটি পাঠ করে আমার এর আগে পাঠ করা তিন-চারটি গ্রন্থের সঙ্গে বেশ কিছু অংশের হুবহু মিল খুঁজে পাই, যা পরিষ্কার চৌর্যবৃত্তি। চুরির ওপর ভিত্তি করে যদি তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ রচিত হয়ে থাকে তবে, এ ডিগ্রি তদন্তপূর্বক বাতিল হলে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আর যদি তার এই পুস্তক পিএইচডির সাথে সম্পর্কিত না হয় তবে গবেষক হয়ে অন্যের গ্রন্থ থেকে যথাযথ তথ্য সংকেত উল্লেখ না করে নিজের গ্রন্থে ব্যবহার করে যে চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় তিনি নিয়েছেন, তার যথাযোগ্য বিচার হওয়া উচিত বলে আমি দাবি করি। এই অভিসন্দর্ভের কারণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছেন, এই গ্রন্থের কারণে তিনি পদোন্নতি নিয়েছেন, এই গ্রন্থের জন্য তিনি নজরুল পদকও লাভ করেছেন। অর্থাৎ এই চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে তিনি আর্থিক সুবিধা, পেশাগত সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা গ্রহণ করেছেন, যা দুর্নীতি হিসেবেও গণ্য।

তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ২৮০ পৃষ্ঠার গ্রন্থে ৮০ পৃষ্ঠার স্বরলিপি স্ক্যান করে ঢোকানো হয়েছে মূল পাঠ হিসেবে, যা অনৈতিক। এই স্বরলিপির স্থান হতে পারতো গ্রন্থের পরিশিষ্টে। মূল পাঠে এই স্বরলিপি কোনোক্রমেই স্থান পাওয়ার কথা নয়। এটিও একধরনের চৌর্যবৃত্তি। দেখা যাচ্ছে যে ২৭৭ পৃষ্ঠার বইয়ের মধ্যে ৮০ (স্বরলিপি)। ২৬ (শ্যামপ্রসাদ) + ৪৬ (কাকলী) +১৭ (পরিশিষ্ট) = ১৬৯ পৃষ্ঠা লীনা তাপসী খানের রচনা নয়। এগুলো অন্যের গ্রন্থ থেকে হুবহু গৃহীত। বাকি ১০১ পৃষ্ঠা লীনা তাপসীর খানের লেখা বলে দাবি করা হয়েছে। তার মধ্যে ইদরিস আলীর গ্রন্থ থেকেও নেওয়া হয়েছে। যথাযথ অনুসন্ধান হলে প্রমাণিত হতে পারে যে ওইসব পৃষ্ঠায় ব্যবহৃত তথ্যও লেখকের নয়। এমতাবস্থায় তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

ইফফাত আরা নার্গিস বলেন, আমার অভিযোগটি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। কেবল উপাচার্য নন, দুজন উপ-উপাচার্য এবং সিন্ডিকেটের সকল সদস্যের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে। কিন্তু তদন্তের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না, বরং লীনা একজন জাতীয় অধ্যাপকের দোহাই দিয়ে বলে বেড়াচ্ছে যে কেউ তার কিছুই করতে পারবে না। এই সংবাদ যাতে প্রচারিত না হয় সেই ব্যাপারে তিনি তদবির করে বেড়াচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কেন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরেও তদন্ত করছে না, সেই রহস্য বুঝতে পারছি না।

উক্ত সংবাদ সম্মেলন থেকে পাঁচটি দাবি তুলে ধরেন নায়েমের সাবেক এই পরিচালক। দাবিগুলো হলো- অভিযোগ তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন মোতাবেক লীনা তাপসীর পিএইচডি ডিগ্রি বাতিল করা; এ ডিগ্রির জন্য প্রাপ্ত সব সুবিধা প্রত্যাহার করা; এ ডিগ্রি প্রদানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে শাস্তি প্রদান করা; এ ডিগ্রির ওপর রচিত গ্রন্থ- নজরুল সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার বাতিলের জন্য কবি নজরুল ইনস্টিটিউট এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা নেওয়া; এ গ্রন্থের জন্য প্রাপ্ত নজরুল পদক বাতিল করে নজরুল পদককে কলঙ্কমুক্ত করা।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ হিসেবে একটি বই উপস্থাপন করেন। নাম নজরুল সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার। ২০১১ সালে যা বই আকারে প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। তখনই অভিযোগ উঠে, ১৫ অধ্যায়ের ২৭৭ পৃষ্ঠার এই বইয়ে প্রায় ১১টি অধ্যায়ের ১৫২ পৃষ্ঠাই বিভিন্ন লেখকের গ্রন্থ থেকে হুবহু নেয়া। বাকি পাতার তথ্যেই আছে গড়মিল।

নজরুলের গানের শ্রেণিবিন্যাসের অধ্যায়টি গীতবিতান নজরুল গীতিকার সহায়তায় রবীন্দ্রনাথের গানের শ্রেণীবিন্যাস থেকে নেয়া।
তৃতীয় অধ্যায়ে নজরুলের মূল গান ও ভাঙা গান শিরোনামে এ কি তন্দ্রা বিজড়িত আঁখি গানটিকে নজরুলের বলে উল্লেখ করলেও এর রচয়িতা মূলত তুলশী লাহিড়ী।

আর নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ইদ্রিস আলীর নজরুল সঙ্গীতের সুর বইটি থেকে হুবহু নেয়া হয়েছে বেশকয়েকটি অধ্যায়। এমন নকলের বাহারে ভরা এই পিএইচডি থিসিসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে লীনা তাপসী খানের দাবি, বিষয়টি ঠিক নয়, শুধু শত্রুতার বহিঃপ্রকাশ। এই গবেষণার তত্ত্ববধায়কদের একজন, জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের দাবি, গবেষণাটি তখন তাদের কাছে সঠিকই মনে হয়েছিলো।

এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিষয়টি নিয়ে উপাচার্যসহ সব সিন্ডিকেট সদস্যের কাছে তদন্তের দাবিতে অভিযোগপত্র জমা দেন নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক। কয়েকমাস পেরুলেও বিষয়টি সিন্ডিকেট সভায় এজেন্ডাভূক্ত না হওয়ায় এবারে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

যদিও উপ-উপাচার্যের দাবি, করোনার কারণে সভা সংক্ষিত হওয়ায় এতোদিন তদন্ত কাজ এগোয়নি। গবেষণায় চুরির মতো নেতিবাচক বিষয় নিয়ে সবাইকে আরও সচেতন থাকা জরুরি বলেও পরামর্শ দেন।

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: