প্রচ্ছদ / খোলা কলাম / বিস্তারিত

আরিচায় ত্রিমুখী সেতু পাল্টে দেবে দেশের অর্থনীতি

   
প্রকাশিত: ৮:৪১ অপরাহ্ণ, ২৯ মে ২০২২

ইয়াহিয়া নয়ন: বহুল আলোচিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হবে ২৫ জুন। পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দৃঢ় প্রত্যয় ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে। আমরা যারা উত্তরাঞ্চলের মানুষ, যমুনা সেতু চালুর পরে আমরা অরিচা-নগরবাড়ীর কথা এখন ভুলেই গেছি। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষও একদিন ভুলে যাবে মাওয়া-জাজিরার দুঃখ।

আমি আজ ভিন্ন প্রসঙ্গে লিখব। মালয়েশিয়া সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের একটা সমঝোতা স্মারক স্বক্ষর হয়ে আছে। সেটা হচ্ছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের। এটি হবে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পথে। সরকারের পরামর্শকরা বলছেন,এ পথে টানেল নির্মান করা সঠিক হবে। টানেল বা সেতু যাই হোক, একমুখী সেতু তৈরি না করে বরং আরিচায় পদ্মা-যমুনা ত্রিমুখী সেতু এবং করিডর নির্মাণ বাংলাদেশের জন্য হতে পারে মাইলফলক।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা পাল্টাচ্ছে। নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাক সত্তে¡ও দেশের অর্থনীতি সম্মুখযাত্রায় অগ্রসরমাণ। চলতি মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পর দেশের অর্থনীতি আরো গতিশীল হবে। তবে এসব মেগা প্রকল্প শেষ হলে তারপর কি থেমে থাকবে এ অগ্রযাত্রা? এক কথায় উত্তর, না। সরকার নিশ্চয়ই সেদিকে লক্ষ রেখে নতুন মহাপরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে। তবে সরকারের এ দূরদর্শী পরিকল্পনার সঙ্গে ভাবনায় নিতে হবে যে দুটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারলে স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের গতি ত্বরান্বিত করতে পারে। যা আমাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি আরো ৩-৪ শতাংশ বেড়ে গিয়ে ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যমাত্রাকে আরো এগিয়ে আনতে পারবে বলে আশা করা যায়।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক এস এম আতিয়ার রহমান। তিনি সরকারের নিকট একটি সুচিন্তিত প্রস্তাব রেখেছেন। আমি তাঁর প্রস্তাবের সাথে একমত পোষন করে তার প্রস্তাবটি পাঠকদের অবগতির জন্য এখানে তুলে ধরছি।

প্রথম প্রস্তাব: আরিচায় পদ্মা ও যমুনার মিলিত স্থানে ইংরেজি ওয়াই অক্ষরের মতো পদ্মা-যমুনা ত্রিমুখী স্টিল কম্পোজিট সেতু নির্মাণ। এর কারণ পদ্মা সেতু দিয়ে ট্রেনসহ ভারী যানবাহন চলাচল ছাড়াও নদীর গভীরতা, স্রোতে ও গতি-প্রকৃতির কারণে এতটা গভীরতাসম্পন্ন পাইলিং করতে গিয়ে এ প্রকল্প ব্যয়বহুল হয়েছে।

জাজিরায় যে স্থানে পদ্মা সেতু হয়েছে, সেখানে একমুখী নদীর স্রোত ও বেগ বেশি। তবে শত প্রতিক‚লতা অতিক্রম করে অবশেষে বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে মানুষের সুদীর্ঘ দিনের স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ লাভ করছে। পদ্মা সেতুর মাওয়া থেকে যমুনা নদীর ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতুর দূরত্ব ১১০ কিলোমিটার। এর মধ্যবর্তী আরিচা উভয় সেতু থেকে কমবেশি ৫০-৫৫ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে। এখানে মিলিত হয়েছে পদ্মা ও যমুনা নদী।

এ স্থলে একটি ত্রিমুখী সেতু নির্মাণ করতে পারলে তা দেশের তিনটি ভূখন্ডকে একত্র করে যোগাযোগ ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করতে পারে। যেহেতু পদ্মা ও যমুনা সেতুতে রেল যোগাযোগের সুযোগ আছে, তাই আরিচায় প্রস্তাবিত পদ্মা-যমুনা ত্রিমুখী সেতুটি কেবল বাস-ট্রাক, প্রাইভেট কারসহ হালকা যানবাহন ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনসম্পন্ন চলাচল উপযোগী করে স্টিল কম্পোজিট সেতু নির্মাণে ব্যয় অনেক কম হবে। এটা অনেকটা সাসপেনশন টাইপের করা যেতে পারে।

এ সেতুর নির্মাণে এমন একটি কল্পিত চিত্র সামনে নেয়া যায় তা হলো, আরিচা থেকে পদ্মা-যমুনার মিলিত প্রশস্ত অংশের সোজা তিন বা চার কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে সেখান থেকে বাঁয়ে চার কিলোমিটার রাজবাড়ীর অংশে এবং একইভাবে মধ্যভাগ থেকে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার ডানে ঈশ্বরদীর রাখালগাছি চরের অংশে গিয়ে শেষ হবে। তাহলে সেতুটি হবে ওয়াই প্রকৃতির। মাঝখানে ত্রিভুজ আকৃতির অংশ দিয়ে যেকোনো দিকে যানবাহনের গতি পরিবর্তন করা যাবে।

ধরা যাক, কোনো যানবাহন আরিচা থেকে রাজবাড়ীর পারে যাবে, সেখান থেকে যাবে ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, নড়াইল, বাগেরহাট, মোংলার দিকে। এক্ষেত্রে আরিচা হয়ে নদীর মাঝ বরাবর তিন-চার কিলোমিটার গিয়ে গাড়িটি বামে ঘুরে রাজবাড়ীর অংশে যেতে পারবে। আবার রাজবাড়ী থেকে কোনো যানবাহন ঈশ্বরদীর পারে গিয়ে তা বামে টার্ন নিয়ে রাখালগাছি অংশে যেতে পারবে। একইভাবে রাখালগাছি থেকে আরিচা অথবা রাজবাড়ী যেকোনো অভিমুখে টার্ন নেয়ার সুযোগ থাকছে। অবশ্য সেটা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরের কথা।

তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, সাগরের মধ্য দিয়ে চীন ২০-৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ধরনের সেতু নির্মাণ করে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপের মধ্যে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশ এ ধরনের সাসপেনশন টাইপের/ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত মনোবল ও দৃঢ় প্রত্যয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এটিই এখন বাঙালি জাতির যেকোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণের বড় প্রেরণার উৎস। ধরা যায়, এ প্রকল্পে সম্ভাব্য ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হলে তার পুরোটাই অথবা অর্ধেকটা দেশীয় শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সংস্থান সম্ভব। এছাড়া কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলে এখান থেকে আসতে পারে বিনিয়োগের একটি বড় অংশ। এছাড়া বিদেশে যারা কর্মরত, তাদের কাছেও অর্থলগ্নির আহ্বান করা যেতে পারে। এ সেতু দিয়ে দিন-রাতে কমপক্ষে ৮-১০ হাজার যানবাহন পারাপার হতে পারবে। আশা করা যায়, জাইকা এ ধরনের প্রকল্পে সহায়তা দিতে পারে এ কারণে যে এখানে কেবল হালকা যানবাহন চলবে।

দ্বিতীয় প্রস্তাব: পদ্মা-যমুনা করিডর উন্নয়ন প্রকল্প। এমন একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। পদ্মা সেতুর পূর্ব তীর মাওয়া থেকে পদ্মা নদীর পূর্ব তীর হয়ে আরিচা এবং একইভাবে আরিচা থেকে যমুনা নদীর দক্ষিণ তীর হয়ে যমুনা সেতু পর্যন্ত মোট কমবেশি ১১০ কিলোমিটার তীরবর্তী যোগাযোগ অবকাঠামো তথা মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ। এটা দুটি ভাগে ভাগ করে করা সম্ভব। একটি মাওয়া থেকে আরিচা ৪৫-৫০ কিলোমিটার এবং আরিচা থেকে যমুনা সেতু ৫৫-৬০ কিলোমিটার। এ মহাসড়ক নির্মাণ করা হলে দেশের ইতিহাসে যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। অন্যদিকে এ দুটি বড় নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক প্রকল্পসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করে রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমানো সম্ভব।

কোনো ব্যক্তিকে যমুনা সেতুর এপার থেকে যশোর-খুলনা বা ফরিদপুরে আসতে হলে তাকে এখন সাভার বা ঢাকা ঘুরে আসতে হয়। এতে অতিরিক্ত ১৪০-১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু যমুনা সেতু থেকে যমুনা নদীর তীর হয়ে ৫৫ কিলোমিটার দূরত্বের আরিচা পর্যন্ত মহাসড়ক হলে ১০০ কিলোমিটার পথ কম হবে। আবার পদ্মা সেতুর মাওয়া থেকে উত্তরে আরিচা পর্যন্ত পদ্মা নদীর তীর দিয়ে একটি মহাসড়ক হলে তাও অনুরূপ বিকল্প যানবাহন পারাপার বা চলাচল করতে পারবে। পদ্মা নদীর তীরবর্তী এ এলাকায়ও নতুন শিল্প অবকাঠামো নির্মাণসহ যোগাযোগ সহজসাধ্য হতে পারে।

পদ্মা ও যমুনা করিডরের এ নদী-তীরবর্তী মহাসড়ক পাল্টে দিতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরা লের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। দেশের তিনটি ভূখন্ডের নিবিড় যোগাযোগ বন্ধনে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকার ওপর নানামুখী চাপ বহুলাংশে কমতে পারে। পদ্মা ও যমুনার তীর দিয়ে এ করিডর মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে এর আর্থসামাজিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনায় আশা করা যায় এ প্রকল্পে বিদেশী সহায়তা পাওয়া যাবে, বিশেষ করে জাইকা বা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের। প্রয়োজনে এটিও নিজস্ব অর্থে নির্মাণ সম্ভব। এই ১১০ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণে সর্বোচ্চ ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ হতে পারে, যা সরকারের পক্ষেই জোগান দেয়া সম্ভব এবং এ মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে বিদেশের মতো টোল আদায় করা হলে তা বিনিয়োগ রিটার্ন আসবে ২০-২৫ বছরের মধ্যেই। প্রস্তাবিত পদ্মা-যমুনা ত্রিমুখী সেতু ও পদ্মা-যমুনা করিডর মহাসড়ক নির্মিত হলে দেশের তিনটি ভূখন্ডকে তা নিবিড়ভাবে যুক্ত করে সারা দেশ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

একই সঙ্গে তা দেশের উত্তর-পশ্চিমা লের অর্থনীতিতে ৩-৪ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হতে পারে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়নে অত্যন্ত দূরদর্শী ও বৃহত্তর পরিসরে চিন্তাভাবনা করছেন। দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় এ দুটি প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। এ নিয়ে চিন্তাভাবনা বা উদ্যোগ গ্রহণের এখনই সময়।

লেখক : সাংবাদিক,কলাম লেখক।

তুহিন/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: