প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

একটি গ্রামকে ভোগাচ্ছে আর্সেনিক

   
প্রকাশিত: ১২:০২ পূর্বাহ্ণ, ২৬ জুলাই ২০২২

আব্দুল বাশির, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে: পুরো গ্রামের প্রায় সবগুলো টিউবওয়েলে লাল রং দেয়া চিহ্ন। গ্রামের বাসিন্দারা সবাই জানেন, এই পানি তাদের জন্য নিরাপদ নয়। এদিকে, নিরাপদ পানি পেতে যেতে হয় প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। তাই উপায় না থাকায় বাধ্য হয়েই পান করেন আর্সেনিকযুক্ত লাল চিহ্ন দেয়া টিউবওয়েলের পানি। আর এতেই দীর্ঘদিন ধরে এই পানি পানে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বেতাবাড়ি গ্রামটিতে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি গ্রামের প্রায় ৫৫টি পরিবার এখন আর্সেনিক আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নের বেতবাড়িয়া গ্রামের মানুষকে ভোগাচ্ছে আর্সেনিক। গত কয়েকদিন থেকে এলাকার বাসিন্দাদের দেহে আর্সেনিক আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গ্রামের কয়েকজনের শরীরে ইতোমধ্যে ভয়াবহ আর্সেনিকের প্রভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অনেকেই। নিজেদের স্থাপিত সাবমার্সেবল পাম্প ও টিউবওয়েলের পানি ব্যবহারে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়েছেন।

আর্সেনিকযুক্ত সেই পানি ব্যবহার করা গ্রামের মানুষের হাতে ও পায়ে গুটিসহ সারা শরীরে কালো তিল দাগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শরীরে কালো কালো দাগ, হাতে পায়ে ঘা দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, শুধুমাত্র হাতেপায়ে ঘা নয়, সর্দি, জ্বর, শ্বাসকষ্টে ভুগছেন আর্সেনিকের কারনে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ওই গ্রামের এরই মধ্যে ৪০ জন আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়েছে।

বেতবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর ও তার স্ত্রী আলেপনূর, আকলিমা, আঁখি, নজরুল, মাসুদ, সাইদুল, আশরাফুলসহ আরো অনেকের শরীরে বেশ কিছুদিন ধরে তাদের হাতে-পায়ে কালো কালো দাগ হচ্ছে। আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেকটা নিরুপায় হয়ে জেনে শুনেই আর্সেনিকের মত বিষপান করতে হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছে।

গ্রামের সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা মো. জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী আলেপনুর বেগম বলেন, প্রায় দুই মাস থেকে হাত, পা ও শরীরে ফোটা ফোটা দাগ হতে শুরু করে। পরে ঘা হয়ে গেছে। এখন নিজে নিজে হাঁটা চলাফেরা কিছুই করতে পারি না। সুয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। ডাক্তারের কাছে গেলেও তারা বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে বলছেন। কিন্তু কীভাবে তা করব? কারন স্বামীও অসুস্থ। চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারছি না।

জিয়ারুল ইসলামের স্ত্রী শাহনাজ বেগমের হাতে পায়ে ঘা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে টিউবওয়েলে আছে। কিন্তু একটি টিউবওয়েলেও নিরাপদ পানি নেই। তাই বাধ্য হয়েই সবাই আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করি।

খাদেমুল ইসলামের স্ত্রী শিউলী বেগম বলেন, ভোটের সময় সবাই আসে আর প্রতিশ্রুতি দেয় আর্সেনিকমুক্ত পানি দেয়ার কিন্তু তা আর দেয় না। এভাবেই গত ১৬ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। আমাদেরকে কেউ দেখে না। সরকার দেশের নাগরিকদের জন্য এতোকিছু করছে। তাহলে এতোদিন ধরে ৫০-৫৫টি পরিবারের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা কেন হয় না। বেতবাড়িয়া গ্রামে আমরা দ্রুত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা চাই।

সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জন পলাশ হাঁসদা বলেন, সদর উপজেলার বেতবাড়িয়া গ্রামের বেশকিছু মানুষের মধ্যে আর্সেনিকের নমুনা ব্যাপকভাবে পাওয়া গেছে। আমরা সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে প্রতিবছর ২৬টি জলমটর দিয়ে থাকি, যাতে মানুষরা বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারে। টিউবয়েল বা মটরের পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ০.০৫ মি.গ্রাম পার লিটার। এর বেশি হলে পানি খাওয়া বন্ধ করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার সরকার জানান, সম্প্রতি ওই গ্রামের ২৯টি টিউবওয়েলের পানি পরীক্ষা করা হয়েছে। এরমধ্যে ২৮টিতেই আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যা ভয়াবহ মাত্রায় পৌছে গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়ার অংশ হিসেবে দুটি নিরাপদ পানির উৎসের ব্যবস্থা করা হবে। এরমধ্যে একটি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মধ্যমেয়াদী ব্যবস্থা হিসেবে বেতবাড়িয়া গ্রাম থেকে প্রায় ৬০০ মিটার দুরে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করে পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এভাবে সেই গ্রামে ৬-৭ টি জায়গায় পুরো গ্রামের জন্য পানির সরবরাহ দেয়া সম্ভব হবে। এতেও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা না করা গেলে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কতৃপক্ষের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান বলেন, বেতবাড়িয়া গ্রামের অধিকাংশ মানুষের আর্সেনিক আক্রান্তের খবর শুনে নিজে সরজমিন পরিদর্শন করেছি এবং আক্রান্ত পরিবারগুলোর লোকজনের সাথে কথা বলেছি। তাৎক্ষণিকভাবে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এমনকি জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিএমডিএ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বেতবাড়িয়া গ্রামে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

শাকিল/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: