প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

জুলফিকার আলী ভূট্টো

নীলফামারী প্রতিনিধি

নীলফামারীতে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় নবজাতকের মৃত্যু

   
প্রকাশিত: ৬:১১ অপরাহ্ণ, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

ছবি - প্রতিনিধি

নীলফামারীর ডিমলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে গোপনে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া লাইফ কেয়ার হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় এক নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। আকতারুজ্জামান বাবু নামের নন বিসিএস এমবিবিএস এক চিকিৎসক সিজারিয়ানে নিজেই সার্জারি ও এনেসথেসিয়া করে রেজিস্টার খাতায় নন বিসিএস-এমবিবিএস চিকিৎসক স্ত্রীর নামে স্বাক্ষর করেছেন।

এ ব্যাপারে শনিবার(২৪ সেপ্টেম্বর)দুপুরে নীলফামারী সিভিল সার্জন ডা.জাহাঙ্গীর কবির বলেন, আমরা অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়েছিলাম। একাই এক চিকিৎসকের সার্জারি ও এনেসথেসিয়া করার কোনো সুযোগ নেই। অবৈধ ক্লিনিক বন্ধের বিষয় গুলো আসলেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের(ইউএনও)দেখার কথা। কারন তারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।তারপরও বিষয়টি আমি দেখব।

জানা গেছে, বুধবার বিকেল তিনটায় উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ খড়িবাড়ি মসজিদ পাড়ার বাসিন্দা আতাউর রহমানের স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তানের জননী রহিমা বেগম উপজেলা সদরের নাম সর্বস্ব লাইফ কেয়ার হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজার করতে এসে সেখানে ভর্তি হন। পরে বিকেল পাঁচটার দিকে চিকিৎসক আকতারুজ্জামান বাবু সেখানে হাজির হওয়া মাত্রই অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই প্রসূতিকে জোর পূর্বক অপারেশন রুমে নিয়ে যাওয়া হয় সিজারের জন্য। এসময় প্রসূতি তার স্বামী ক্লিনিকের বাইরে আছেন বলে তাকে ফোনে ডেকে আনতে চাইলেও ওই চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাতে কোনো কর্ণপাত না করেই প্রসূতিকে অপারেশন রুমে নিয়ে গিয়ে তার সিজার সম্পন্ন করেন।

সিজারের আগে এনেসথেসিয়ায় প্রসূতি পুরোপুরি অবস্ নাহলেও ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম হলে সব অভিযোগ নিমিষেই ভুলে যান প্রসূতি ও তার পরিবার। কিন্তু নবজাতক পৃথিবীর মুখ দেখার পর স্বাভাবিক ভাবে কেঁদে ওঠার পরও অহেতুক অনভিজ্ঞ আয়া নবজাতক শিশুটির দু-পা ধরে মাথা নিচু করে অধিক সময় শিশুটিকে দোলাতে থাকেন।এতে শিশুটির নাক ও মুখ দিয়ে ফেনার মত পানি বের হতে থাকলে শিশুটির মারাত্মক শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।এসময় ওই ক্লিনিকের রেজিস্টার খাতায় চিকিৎসকের স্বাক্ষরের স্থানে নিজ স্ত্রী নন বিসিএস-এমবিবিএস চিকিৎসক ডা.মারজিয়া শবনমের নাম লিখে ডা.আকতারুজ্জামান বাবু দ্রুত সটকে পড়েন।শিশুটির শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়ার দীর্ঘ আধা ঘন্টারও বেশি সময় ধরে শিশুটিকে কোনো রকম অক্সিজেন না দিয়ে ও চিকিৎসক না দেখিয়ে ক্নিনিক কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় কালক্ষেপন করেন।

এক পর্যায়ে নবজাতক শিশুটির অবস্থা আরো খারাপ হলে দ্রুত শিশুটিকে অক্সিজেন ছাড়াই ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। ইতিপূর্বেও এই ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসা ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় একাধিক প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যু হলেও অদৃশ্য কারনেই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ঘটনার দিন ক্লিনিকটির রেজিস্টারে দেখা গেছে একই দিনে(বুধবার)ডা.আকতারুজ্জামান বাবু তিনটি সিজার করে তিনটিতেই স্বাক্ষর করেছেন তার চিকিৎসক ডা.মারজিয়া শবনমের নামেই!

বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে,সিজারে সার্জারি ও এনেসথিস্ট চিকিৎসক ভিন্ন ভিন্ন থাকার নিয়ম থাকলেও তাদের বেশি অর্থ দিতে হয়। আর ডা.আকতারুজ্জামান বাবু ও তার স্ত্রী ডা.মারজিয়া শবনম দুজনে পুরো সিজার করে তা বাবদ নিয়ে থাকেন দুই হাজার থেকে পঁচিশ শত টাকা।

এ ব্যাপারে নবজাতক শিশুটির মা রহিমা অভিযোগ করে বলেন, একজন ব্যক্তিই আমাকে ইনজেকশন(এনেসথেসিয়া)দিয়েছেন ও আমার পেট কেটে সিজার করেছেন তা আমি স্পস্ট দেখেছি।অনেক যন্ত্রনা সহ্য করার পর সন্তানের জন্ম হলে আমি সব ভুলে যাই। আমার সন্তান প্রথমদিকে ভালোই ছিলো। পরে আয়া তার পা উপর করে ধরে বেশকিছু সময় দোলালে তার নাক ও মুখ দিয়ে ফেনার মত পানি বের হতে থাকায় শ্বাস কষ্ট দেখা দেয়।কিন্তু ক্লিনিকের লোকজন অক্সিজেন না লাগিয়ে দীর্ঘ সময় কালক্ষেপন করে হাসপাতালে নিলে আমার সন্তান মারা যায়। লাইফ কেয়ার হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একাংশের মালিক মতিয়ার রহমান সিজার একাই ডা.আকতারুজ্জামান বাবু করেছেন স্বীকার করেন।

ডা.আকতারুজ্জামান বাবু বলেন, আমি একজন সার্জারি চিকিৎসক। আমি এমবিবিএস(আর ইউ)পি.জি.টি(সার্জারি)।নবজাতক শিশুটি মায়ের গর্ভের পানি খেয়ে মৃত্যু বরণ করেছে।

তার স্ত্রী ডা.মারজিয়া শবনম বলেন, ওইদিন আমি ওই ক্লিনিকে কোনো সিজার করিনি। কেউ আমার স্বাক্ষর করে থাকলে মোটেও তা ঠিক হয়নি।

ডিমলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদুজ্জামান বলেন, আমরা অভিযান চালালেই লাইফ কেয়ার হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি বন্ধ পাই। তারা যে গোপনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন এটা জানা ছিলনা। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ব্যাপারে নীলফামারী জেলা সিভিল সার্জন ডা.জাহাঙ্গীর কবির বলেন,আমরা অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়েছিলাম। বিষয় গুলো আসলেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের(ইউএনও)দেখার কথা। তারপরও বিষয়টি আমি দেখছি।

আশরাফুল/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: