প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

মোঃ শাকিল শেখ

সাভার করেসপন্ডেন্ট

বিত্তশালীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করতেন তারা

   
প্রকাশিত: ২:৩৮ অপরাহ্ণ, ২৮ অক্টোবর ২০২২

অপহরণ করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে চার বছরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। চক্রটি নানা কৌশলে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব লুটে নিতো। ডিবি’র সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অর্গানাইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকার সাভার এলাকা থেকে চক্রটির দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।

অভিযুক্তরা হলেন, মো. খোকন আকন্দ ও বিলকিস। তাদের কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোনসেট, একটি সই করা চেকের পাতা, তিনটি ১০০ টাকা মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প জব্দ করা হয়েছে। জব্দ মোবাইল ফোনে চক্রের নারী সদস্যের সঙ্গে ভুক্তভোগীদের আপত্তিকর মুহূর্তের ভিডিও ও ছবি পেয়েছেন গোয়েন্দারা। ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা যায় , একজন ভুক্তভোগী রাজধানীর দারুসসালাম থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় বাদী উল্লেখ করেন, ব্ল্যাকমেইলিং চক্রের সদস্য নিজেকে বিলকিস আক্তার পরিচয় দিয়ে বাদীর কোম্পানিতে তিনিসহ তার কয়েকজন আত্মীয় ইন্সুরেন্স পলিসি করবেন বলে জানান। পরে ইন্সুরেন্স করার জন্য বিলকিস মামলার বাদীকে দারুসসালাম এলাকায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এরপর বিলকিস ভুক্তভোগীর অফিসের নিচে গিয়ে অপেক্ষা করেন।

পরবর্তীতে ভুক্তভোগী অফিস থেকে বের হলে তাকে নিয়ে সিএনজি অটোরিকশায় করে গাবতলীর দিকে রওয়ানা করেন। গাবতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে অজ্ঞাত আরও ২/৩ জন ব্যক্তি সিএনজিতে ওঠেন। পরে বিলকিস অজ্ঞাত ব্যক্তিদের সাহায্যে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে কালো ওড়না জাতীয় কাপড় বের করে ভুক্তভোগীর চোখ মুখ বেঁধে ফেলেন। সেইসঙ্গে ভুক্তভোগী যেন চিৎকার করতে না পারেন, সেজন্য তার মুখে সাদা রুমাল গুজে দেন। পরে ভুক্তভোগীকে অপহরণ করে একটি অজ্ঞাত স্থানে অন্ধকার কক্ষে নিয়ে যায় চক্রের সদস্যরা। সেখানে বাশের লাঠি দিয়ে তাকে বেধড়ক মারপিট করে গুরুতর জখম করে বিবস্ত্র করে মোবাইল ফোনে ভুক্তভোগীর বেশকিছু আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। ভুক্তভোগীকে মারধর করে তার কাছ থেকে নগদ ৩৫ হাজার টাকা নিয়ে নেয় চক্রের সদস্যরা। এছাড়া তারা ভুক্তভোগীর কাছে থাকা ব্যাংকের এটিএম কার্ডের পিন নম্বর জেনে সেখান থেকে এক লাখ টাকা তুলে নেয়। পাশাপাশি চেক বইয়ের একটি পাতায় ৪ লাখ টাকা লিখে ভুক্তভোগীর স্বাক্ষর নেয়। এছাড়া একটি খালি স্ট্যাম্পেও স্বাক্ষর নেয়া হয়। পরে ভুক্তভোগীকে ছেড়ে দেয়া হয়।

এছাড়া এর কিছুদিন পরে অন্য একটি নম্বর থেকে ফোন দিয়ে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীর কাছে আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করে হুমকিমূলক ভয়েস বার্তা পাঠায় চক্রটি।ডিবি জানায়, ওই মামলার তদন্ত করে এই চক্রটিকে শনাক্ত করা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে চক্রের মূলহোতাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার খোকন প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে টার্গেট করে বিভিন্ন বিত্তশালী ব্যক্তির নম্বর সংগ্রহ করতো। এরপর বিলকিস বিভিন্ন পরিচয়ে সংগৃহীত নম্বরে ফোন করে বা এসএমএস দিয়ে ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। পরে চক্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভুক্তভোগীকে সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে কৌশলে প্রলুব্ধ করে দেখা করার প্রস্তাব দিতেন বিলকিস।

পরে কেউ প্রস্তাবে সাড়া দিলে তাকে ফুসলিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপ ও অন্তরঙ্গ মুহূর্তে নিয়ে যেতেন। অন্তরঙ্গ থাকা অবস্থায় চক্রের মূলহোতা খোকন সেখানে প্রবেশ করে নিজেকে কখনও ডিবি, কখনও সিআইডি, কখনও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতেন। কেউ অন্তরঙ্গ মুহূর্তে যেতে না চাইলে তাকে মারধর করে বিবস্ত্র করে ভিডিও করে রাখতো। এরপর ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠানো এবং ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতো। পাশাপাশি কোনো ভুক্তভোগীর কাছে এটিএম কার্ড থাকলে তার পিন নম্বর নিয়ে অ্যাকাউন্ট খলি করে ফেলতো। জিজ্ঞাসাবাদের গ্রেপ্তারকৃতরা ডিবিকে আরও জানিয়েছেন, যারা চক্রের ফাঁদে পা দিতেন না, তাদের পেশার সাথে সম্পৃক্ত কাজের কথা বলে রেস্টুরেন্ট বা অন্য কোথাও দেখা করতেন চক্রের সদস্যরা। পরে সিএনজি বা প্রাইভেটকারে তুলে চোখ-মুখ বেঁধে অপহরণ করে নির্জন স্থানে নিয়ে আটকে রেখে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নগদ টাকা হাতিয়ে নিতো। পরে চক্রের সংরক্ষণে থাকা ছবি ও ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতো চক্রটি। ভুক্তভোগীরা সামাজিক অবস্থান ও মান-সম্মানের কথা ভেবে চক্রের দাবি অনুযায়ী টাকা দিয়ে দিতেন।

গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অর্গানাইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের এডিসি নাজমুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চেয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তিনি বলেন, চক্রটি ২০১৮ সাল থেকে ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণা করে শতাধিক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বিস্তারিত জানতে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

রেজানুল/সা.এ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: