প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

আবদুল কাদির

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

অক্ষত তসলিমা নাসরিনের বাড়ির অংশ, ভাঙা হচ্ছে তার ভাইয়ের অংশ

   
প্রকাশিত: ২:২৪ অপরাহ্ণ, ১০ নভেম্বর ২০২২

দীর্ঘদিন যাবত নির্বাসিত প্রখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির দায়ে ১৯৯৪ সালে তোপের মুখে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি বর্তমানে ভারতে বসবাস করছেন। তবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তসলিমা নাসরিন বেশ সরব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।

নির্বাসিত এই লেখিকার জন্মস্থান ময়মনসিংহের নান্দাইলে। তবে, বাবা মায়ের সাথে ময়মনসিংহ নগরীর আমলা-পাড়ার বাড়িতে বসবাস করতেন। সেই বাড়িটির নাম ছিল অবকাশ। এই বাড়িতেই কেটেছে তসলিমা নাসরিনের শৈশব-কৈশোর আর যৌবন। সম্প্রতি তসলিমা নাসরিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক) একটি ভিডিও শেয়ার দিয়ে তার ময়মনসিংহের অবকাশ নামক বাড়িটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে বলে দাবি করেন।

ওই পোষ্টে তিনি লিখেন, কেউ কেউ ফেসবুকে ‘অবকাশ’ ভাঙার ছবি পোস্ট করছে, দুঃখ করছে, স্মৃতিচারণ করছে। আমার শৈশব, কৈশোর, যৌবনের সেই ‘অবকাশ’। ময়মনসিংহ শহরের টি এন রায় রোডে আমার বাবার কেনা সুন্দর বাড়িটি অবকাশ। এই অবকাশ ভেঙে গুঁড়ো করার সিদ্ধান্ত যারা নিয়েছে তাদের সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ নেই, আমার কোনও সম্পর্ক নেই। শুধু এইটুকু জানি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ খুব লোভী, স্বার্থপর, ধুরন্ধর, কেউ কেউ কট্টর মৌলবাদি। সকলেরই আমি চক্ষুশূল।

এককালে শহরের সাহিত্য সংস্কৃতি, জ্ঞান বিজ্ঞান আর প্রগতিশীলতার একটি কেন্দ্র ছিল যে বাড়িটি, আজ সেটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ধন দৌলতের কাঙালদের কাছে প্রগতিশীলতা, উদারতা সহমর্মিতা, স্মৃতি ও সৌন্দর্যের কোনও মূল্য নেই। শুনেছি বাড়িটিতে আমার মায়ের হাতের লাগানো সব ফল ফুল গাছ শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলে একটি আধুনিক বহুতলসবিল্ডিং বানানো হচ্ছে। আমার কর্মঠ বাবার অকর্মণ্য উত্তরসুরিরা সেই বিল্ডিং-এ পায়ের ওপর পা তুলে বংশ পরম্পরায় খাবে।ও বাড়ির এখন আমি কেউ নই। আমি তো তিরিশ বছর ব্রাত্যই।

ইট পাথরে, চুন সুরকিতে, কাঠে কংক্রিটে স্মৃতি থাকে না, স্মৃতি থাকে মনে। অবকাশ রইলো আমার মনে। যে বাড়িটিতে বসে আমি প্রথম কবিতা লিখেছি, প্রথম কবিতা-পত্রিকা ছাপিয়েছি, প্রথম কবিতার বই লিখেছি, নির্বাচিত কলাম লিখেছি, যে বাড়িটির মাঠে প্রথম গোল্লাছুট খেলেছি, যে বাড়িটির ছাদে প্রথম পুতুল খেলেছি, যে বাড়িটির ভেতর প্রথম রবীন্দ্রনাথ আওড়েছি, উঠোন জুড়ে নেচে চিত্রাঙ্গদা মঞ্চস্থ করেছি, যে বাড়িটিতে দাদা বেহালা বাজাতো, ছোটদা গিটার বাজাতো, বোন গান গাইতো, মা আবৃত্তি করতো, বাবা মানুষের মতো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখাতো, যে বাড়িটিতে বসে প্রথম প্রেমের চিঠি লিখেছি, যে বাড়িটিতে আমি একই সঙ্গে সংবেদনশীল এবং সচেতন মানুষ হয়ে উঠেছি, সে বাড়িটি রইলো আমার মনে। কোনও হাতুড়ি শাবল কুড়োলের শক্তি নেই সে বাড়িটি ভাঙে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তসলিমা নাসরিনের শৈশব-কৈশোর কাটা বাড়িটির নাম অবকাশ। তার বাবার নাম রজব আলী। তিনি পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক। তসলিমা নাসরিনের ছিল এক বোন ও দুই ভাই। তারা নগরীর আমলাপাড়ার ওই অবকাশ বাড়িটিতেই বসবাস করতেন। বাবা রজব আলীর মৃত্যুর পর দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ওই অবকাশ বাড়িটি চারটি ভাগ হয়। সম্প্রতি তসলিমা নাসরিনের এক ভাই তার ভাগের প্রায় ৯ শতাংশ ‘বিএসআই’ ডেভেলপার’র কাছে বিক্রি করে দেন। কেনার পর গত ১০ থেকে ১২ দিন বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য ওই বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু করেন। বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হওয়ার পরেই মূলত বিষয়টি আলোচনায় আসে।

বিএসআই’ ডেভেলপার’র পার্টনার রাসেল মিয়া বিডি২৪লাইভকে বলেন, আমরা যে জায়গা নিয়েছি, ওই জায়গার সাথে তসলিমা নাসরিনের কোন সম্পৃক্ততা নেই। কারণ, আমরা তার ভাইয়ের কাছ থেকে তার ভাইয়ের অংশ রেজিস্ট্রি করে কিনে নিয়েছি। আমরা বৈধ কাগজপত্র দেখেই জমি কিনেছি।

এবিষয়ে জানতে তসলিমা নাসরিনের ভাইয়ের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে করা হলে তবে, পরিবারের কারোর কোন নাম না প্রকাশ করার শর্তে একজন গণমাধ্যমকে বলেন, আমার বাবা-চাচা দুই ভাই ও দুই বোন ছিলেন। বাবা-চাচা দু’জনই মারা গেছেন। আমার দাদার মৃত্যুর পর বাড়িটি দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দুই ভাই ও দুই বোনের নামে ভাগ হয়। আমার বাবার ভাগের ৯ শতাংশের চাইতে কিছু কম অংশ আমরা বিক্রি করেছি। বাড়ির সেই অংশটুকু ভেঙে বহুতল ভবন হচ্ছে। অন্য তিন জনের বাড়ি ও জমি অক্ষত অবস্থাতেই আছে। তসলিমা নাসরিনের বাড়ির অংশের একটি ইট পর্যন্ত আমরা কেউ ধরিনি, কোন দিন ধরবও না।

সালাউদ্দিন/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: