বান্দরবানের লামা উপজেলায় ব্যাপক হারে তামাক চাষ শুরু হয়েছে। সমগ্র উপজেলার অধিকাংশ ফসলের মাঠ, নদীর চরে এখন তামাকের রাজত্ব। উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন স্থানে বিএটিবি, জাপান, আবুল খায়ের ও আকিজসহ ৮টি তামাক কোম্পানী প্রায় ৭ হাজার একর জমিতে তামাক চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তামাক চাষের পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে কোম্পানীগুলো ইতিমধ্যে তাদের রেজিষ্ট্রেশনভুক্ত প্রায় ৩ হাজার চাষীকে বীজ, পলিথিন, কীটনাশক, সার ও ঋণ প্রদান করেছে। এইমুহুর্তে মাঠে তামাক চারা ঊঁকি মারছে।
গত নভেম্বর মাস থেকে কৃষকরা বীজতলাও তৈরি করেন। পাশাপাশি ফসলি জমি, স্কুলের মাঠ ও আশপাশ, মাতামুহুরী নদীর চর ও দুই ধারসহ বিভিন্ন স্থানে তামাক চারা রোপন করছেন চাষীরা।
উপজেলা প্রশাসন, কৃষি অফিস ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক নদী খাল ও ঝিরির তলদেশ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত তামাক চাষ না করার জন্য ব্যাপক প্রচারনা চালানো হয়েছে। তা উপেক্ষা করে তামাক চাষ করেছে কৃষকরা।
ইতিমধ্যে লামা উপজেলা প্রশাসন সদর ইউনিয়নের মেরাখোলা এলাকায় নদীর চরে তামাক লাগানো কারণে প্রচুর তামাক চাষা ধ্বংস করেছে।
জানা যায়, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করলেও কোম্পানীগুলো কৃষকদেরকে তামাক চাষে উৎসাহিত করছে। ফলে উপজেলায় তামাক চাষ হলে জমির উর্বরতা নষ্ট, কৃষকদের স্বাস্থ্য, পরিবেশের ক্ষতিসাধনসহ খাদ্য নিরাপত্তা হুমকি মুখে পড়বে বলে জানান চিকিৎসক ও পরিবেশবাদীরা।
কৃষি অফিসের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে ৮টি তামাক কোম্পানী লামা উপজেলার ১ হাজার ৫৭৭ একর জমিতে তামাক চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে কৃষি অফিসের এ পরিসংখ্যান সঠিক নয় বরং কয়েকগুণ বেশি জমিতে তামাক চাষ করা হয়েছে বলে ধারণা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
কোম্পানীগুলো প্রায় ৭ হাজার একর জমিতে তামাক চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যদিও কোম্পানীগুলো তাদের রেজিষ্ট্রেশনকৃত চাষীর সংখ্যা ও জমির পরিমাণ কত তা কৌশলগত কারণে এড়িয়ে যাচ্ছেন। তামাক চাষের বিষয়ে কোম্পানীগুলো কৃষি অফিস ও গণমাধ্যমকেও কোন তথ্য প্রদান করেনা।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে আবুল খায়ের ট্যোবাকো কমপক্ষে ৫৭০ চাষীর মধ্যে ১১৭০ একর, নাসির ট্যোবাকো প্রায় ২০০ জন চাষীর মধ্যে ৩৫০ একর, জাপান টোব্যাকো প্রায় ৭৮২ হাজার চাষীর মধ্যে ১৭শ একর, বিএটিবি প্রায় ১০১২জন চাষীর মধ্যে কমপক্ষে ২০০০ একর, ভারগো ১৩০ চাষীর মধ্যে ২২০ একর, গ্লোবাল টোব্যাকো কোম্পানী ১৫০ চাষীর মধ্যে ৩০০ একর, বেঙ্গল টোব্যাকো কোম্পানীর ১১৫ চাষীর মধ্যে ২৮০ একর এবং আকিজ টোব্যাকো কোম্পানীর ৩১২ জন চাষীর মধ্যে ৯৫০ একর জমিতে তামাক চাষ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে।
এছাড়াও তামাক কোম্পানীগুলোর রেজিষ্ট্রেশন বহির্ভূত তামাক চাষীর সংখ্যাও প্রায় তিন শতাধিক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লামা পৌরসভা এলাকার লামামুখ, রাজবাড়ি, সাবেক বিলছড়ি, ছাগলখাইয়া, হরিণঝিরি, কলিঙ্গাবিল, সদর ইউনিয়নের মেরাখোলা, মেওলারচর, মাতামুহুরী নদীর রাজবাড়ী পয়েন্টসহ গজালিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থান সরজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, বাড়ি উঠান থেকে শুরু করে সর্বত্রই তামাক চাষ করা হয়েছে। বীজতলায় উৎপাদিত চারা একমাস ধরে জমিতে রোপন করছে চাষীরা।
এর আগে তামাক কোম্পানীর পক্ষ থেকে এসব চাষীদের আগে ভাগেই অর্থ, সার, বীজ, পলিথিন, কীটনাশকসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও প্রদান করা হয়েছে। তামাক চাষীরা চড়া মূল্যে ফসলি জমিগুলো অগ্রিম লাগিয়ত নেয়ায় সবজি চাষীরা জমি বর্গা নিয়ে বিপাকে পড়েন বলে জানান সবজি চাষীরা।
লামা সদর ইউনিয়নের মেরাখোলা গ্রামের সবজি চাষি আনোয়ার হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন, জিয়া উদ্দিন ও শামসুল ইসলাম সহ অনেকে জানায়, তামাক চাষীদের অগ্রিম লাগিয়তের কারণে সবজি চাষের জন্য জমি পাওয়া যায়না। আর পাওয়া গেলেও মূল্য বেশি হওয়ায় অনেক সময় জমি লাগিয়ত নেয়া সম্ভব হয়না। তাই উপজেলায় তামাক চাষ বেশি হয়।
লামা পরিবেশ রক্ষা পরিষদের সভাপতি ফরিদ উদ্দিন জানায়, জমিতে তামাক চাষের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মাটির উর্বরতা নষ্ট হবে। তামাক রোধ করা না গেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মোস্তফা নাদিম বলেন, তামাক চাষের কারণে কৃষকের শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ক্যান্সার সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (অ:দা:) মোঃ সোহেল রানা বলেন, তামাক চাষ বন্ধে সরকারীভাবে সুনির্দিষ্ট কোন আইন না থাকায় ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছেনা। তবে তামাক চাষে চাষীদের কোন ধরনের সহযোগীতা প্রদান করা হচ্ছেনা। বরং কৃষকদেরকে তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি বিকল্প আখ, সবজি, বাদাম, ড্রাগন ফল, সূর্যমুখী, খেসারি ডাল, পেঁপে, ভুট্টা, তুলা ও সরিষাসহ বিভিন্ন ফসল চাষে উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে।
মাতামুহুরী নদী ও লামা খালসহ বিভিন্ন পানির উৎসের ৫০ ফুটের মধ্যে তামাক চাষ না করার নির্দেশনা জারী করে তথ্য অফিসের মাধ্যমে মাইকিংসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মঈন উদ্দিন।
তিনি বলেন, প্রচারণার পরও চাষীরা নির্দেশনা অমান্য করে তামাক চাষ করলে অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর