ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আল-উদেইদ থেকে কিছু কর্মীকে নিরাপত্তাজনিত কারণে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলা এবং ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।
অর্থনৈতিক আন্দোলন থেকে শাসন পতনের দাবি
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ইরানের এই আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ধর্মীয় নেতৃত্বের সরাসরি পতনের দাবিতে। সরকারবিরোধী স্লোগান ও সহিংস দমন-পীড়নের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে শুরু করে।
ট্রাম্পের বার্তা: ‘সাহায্য আসছে’
মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে লেখেন,
“ইরানি দেশপ্রেমিকরা, বিক্ষোভ চালিয়ে যান। আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নিন। হত্যাকারী ও অত্যাচারীদের নাম মনে রাখুন—তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে। বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচার হত্যা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল করেছি। সাহায্য আসছে। MIGA!!!”
এখানে ‘MIGA’ বলতে তিনি বোঝান—Make Iran Great Again।
এর আগে, ২ জানুয়ারি ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘উদ্ধারে এগিয়ে আসতে পুরোপুরি প্রস্তুত’।
ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট ফক্স নিউজকে জানান, কূটনীতি ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ হলেও প্রয়োজন হলে তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর “প্রাণঘাতী শক্তি” ব্যবহার করতে দ্বিধা করবেন না। তার ভাষায়, কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে বিমান হামলা ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান বিকল্প।
আগের হামলার নজির, কিন্তু ভিন্ন বাস্তবতা
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল-ইরান ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি তখনকার মতো নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখন তুলনামূলকভাবে কম।
কেন কমেছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি
বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বরং ক্যারিবীয় সাগরে ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’-এ মোতায়েন। লাতিন আমেরিকায় ‘নারকো-টেররিস্ট’ বা মাদক-সন্ত্রাস দমনে এই অভিযানের অংশ হিসেবেই গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসে বলে দাবি করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জেরাল্ড ফোর্ড যদি ঘণ্টায় গড়ে ২০ নট গতিতে যাত্রা করে, তবে ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে পারস্য উপসাগরে পৌঁছাতে অন্তত দুই সপ্তাহের বেশি সময় লাগবে। পাশাপাশি, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি ইউনিটও গত অক্টোবরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কী কী সামরিক বিকল্প
মধ্যপ্রাচ্যে নৌবহর কম থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ১৯টি সামরিক স্থাপনা রয়েছে, যার মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো পূর্ণাঙ্গ স্থলযুদ্ধে জড়াবে না। ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বা ‘নেশন বিল্ডিং’-এর ঘোর বিরোধী।
১. শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা
ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অবস্থান জানেন এবং তাকে ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, কাসেম সোলাইমানির মতো শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা বা বিশেষ অভিযান চালানো হতে পারে। তবে এতে বিপ্লবী গার্ড সরাসরি ক্ষমতা দখল করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
২. নির্দিষ্ট লক্ষ্যে বিমান হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টিলথ বোম্বার দিয়ে ইরানের পারমাণবিক বা সামরিক স্থাপনায় নির্দিষ্ট হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে। জুনের হামলায় তারা ১৪টি বাঙ্কার বাস্টার বোমা ব্যবহার করেছিল।
জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ালি নাসরের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হয়তো শাসন পরিবর্তন নয়; বরং ইরানকে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে নমনীয় হতে বাধ্য করা। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড যে কোনো সম্ভাব্য মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিশোধের প্রস্তুতিতে রয়েছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর