শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্সটি যখন টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় ঢোকে, তখন পুরো গ্রাম যেন নিঃশব্দ হয়ে যায়। যে শিশু ২৮ দিন আগে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা নেওয়া হয়েছিল বাঁচার আশায়, সে ফিরল সাদা কাফনে মোড়া নিথর দেহ হয়ে। বাড়ির আঙিনায় নামানোর সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে স্বজনদের কান্না। শৈশবের হাসি থেমে যাওয়ার সেই শব্দে ভারী হয়ে ওঠে রাতের বাতাস।
শিশু হুজাইফা আফনান (৯) শনিবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ১১ জানুয়ারি সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া গুলিতে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর থেকে টানা ২৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছে সে।
পরিবার জানায়, ঘটনার দিন বাড়ির পাশেই খেলছিল হুজাইফা। ঠিক সেই সময় মিয়ানমারের বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ) ও একটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। গোলাগুলির একপর্যায়ে একটি গুলি এসে লাগে তার মাথায়। রক্তাক্ত অবস্থায় প্রথমে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
শিশুটির বাবা জসিম উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মেয়েকে বাঁচানোর আশায় ছিলাম। প্রতিদিন ফোনে ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছি। ভেবেছি, হয়তো একদিন সুস্থ হয়ে আবার দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু সেই দিন আর এলো না। তার কোনো দোষ ছিল না, কোনো শত্রুও ছিল না। সে শুধু খেলছিল।
মায়ের আহাজারিতে বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল সন্তানের নাম। প্রতিবেশীরা জানালেন, আফনান ছিল সবার প্রিয়। স্কুলে যাওয়ার পথে হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলত। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলাই ছিল তার সবচেয়ে বড় আনন্দ।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল আলম বলেন, হুজাইফা শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো তেচ্ছিব্রিজ এলাকার সন্তান ছিল। সীমান্তে গোলাগুলির রেশ এসে যদি আমাদের ঘরেই প্রাণ কাড়ে, তাহলে আমরা কোথায় নিরাপদ?
আরেক প্রতিবেশী ইলিয়াস হোসেনের কণ্ঠেও আতঙ্ক, সীমান্তের মানুষ আমরা সব সময় ভয়ে থাকি। আজ আফনান, কাল হয়তো আরেকজন। আমরা নিরাপত্তা চাই, যেন আর কোনো পরিবারকে এভাবে সন্তানের লাশ নিতে না হয়।
গ্রামজুড়ে এখন শোকের ছায়া। জানাজা শেষে আফনানকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছে পরিবার। ছোট্ট কবরের পাশে হয়তো খেলনার জায়গা থাকবে না, কিন্তু থাকবে অকালেই থেমে যাওয়া এক শৈশবের গল্প।
২৮ দিন ধরে হাসপাতালের বিছানায় যে শিশুটি মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছে, তার বাড়ি ফেরা হলো নীরবতায়। সীমান্তের গুলির শব্দ থেমে গেছে অনেক আগেই, কিন্তু তেচ্ছিব্রিজ গ্রামের মানুষের বুকের ভেতর সেই শব্দ এখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর