আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদ থেকে বিদায়ের দিনে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। তার দাবি, চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে ‘টাকা কামানোর হাতিয়ার’ বানিয়েছে তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেট।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ফেসবুকের একটি আইডি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ-এর পোস্টে মন্তব্য করে সুলতান মাহমুদ অভিযোগ উত্থাপন করেন। পোস্টটির শিরোনাম ছিল: ‘ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ এতে তিনি তাজুল ইসলাম ছাড়াও প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন।
সুলতান মাহমুদ অভিযোগ করেন, আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হকের স্ত্রী একটি ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটর তামীমের কক্ষে প্রবেশ করেন। বিষয়টি তিনি তাজুল ইসলামকে জানান, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে উল্টো তাকে তিরস্কার করা হয়। পরে ওই এসআইকে রাজসাক্ষী হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং বিচারে তাকে খালাস দেওয়া হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, চানখাঁরপুলে ‘গুলি চালানোর নির্দেশ’ দেওয়া ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পরও একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়েছে। রংপুরের আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাজসাক্ষী করার বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
উল্লেখ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় ট্রাইব্যুনাল–১ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাজসাক্ষী হিসেবে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আরেক মন্তব্যে সুলতান মাহমুদ অভিযোগ করেন, শুধু সাবেক আইজিপি নয়, আশুলিয়ার মামলাতেও টাকার বিনিময়ে রাজসাক্ষী করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তিন-চারজনের একটি সিন্ডিকেট শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার তাজুল ও তামীমের
চিফ প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ বাতিলের পর সোমবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তাজুল ইসলাম। তখন তাকে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের করা অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। সে সময় তাজুল ইসলামের পাশেই ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। তবে তামীম কোনো কথা বলেননি। পরে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। যেগুলো উনি (প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ) আগে কখনো করেননি, শেষ মুহূর্তে তিনি অভিযোগ আনছেন। এগুলোকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন।
এর জবাবে বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে হচ্ছে কে কী অভিযোগ করছে, এগুলো আমরা আমলে নিচ্ছি না। ব্যক্তিগতভাবে ক্ষোভ থেকে কে কী বলছে, সে ব্যাপারে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই।’
তারপর আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ উনি স্পষ্টভাবে একটি অভিযোগ এনেছেন। এই তামীম সাহেবকে উদ্ধৃত করে যে ওনার (তামীম) রুমে এসআই আবজালুলের ওয়াইফ ভারী একটা ব্যাগ নিয়ে এসেছে। সেটা আপনাকে জানিয়েছে।’
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘না, এটা আমার জানা নেই।’
ওই সাংবাদিক আবার বলেন, ‘আপনাকে জানিয়েছে, সেটাও বলেছে।’
তখন তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এই জাতীয় অভিযোগ আমরা তদন্ত করে দেখেছি, এগুলো সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা। ব্যক্তিগত হিংসা চরিতার্থ করার জন্য যদি কেউ এই ধরনের কথা বলেন, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ, এইখানে ট্রাইবুনালে বিচারপ্রক্রিয়াতে যা কিছু হয়েছে ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ) এবং সেটা আদালতের মাধ্যমে কিন্তু প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং আজকে এই মুহূর্তে যদি কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো মিথ্যা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের গোটা জনগণ সাক্ষী, মিডিয়া সাক্ষী। আপনারা জানেন যে কী ধরনের ট্রান্সপারেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। কারণ, দু–একজনের ব্যক্তিগত ক্ষোভের থেকে সে বুঝে হোক, না–বুঝে হোক যদি বলে, সেগুলোকে আমরা ধর্তব্যের মধ্যে মনে করি না।’
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর