সুন্দরবনে দস্যুদের হাতে অপহরণের ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি ২০ জেলের। মুক্তিপণের দাবিতে জিম্মি করে রাখা এসব জেলেকে ঘিরে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন স্বজনরা। মাছ ধরা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় উপকূলের অন্তত ১০ সহস্রাধিক জেলে ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী পরিবার মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।
মহাজনদের অভিযোগ, দস্যুরা জেলে প্রতি সাড়ে তিন লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করেছে। নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ না করলে জেলেদের প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার গভীর রাতে বঙ্গোপসাগরের নারিকেলবাড়িয়া ও আমবাড়িয়া এলাকায় মাছ ধরার সময় ২০টি ট্রলার থেকে জেলেদের অপহরণ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, অস্ত্র সজ্জিত সুমন ও জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা ট্রলারগুলো ঘিরে ফেলে জেলেদের তুলে নিয়ে যায়।
অপহৃতরা পূর্ব সুন্দরবনের দুবলার চরের আলোরকোল ও নারিকেলবাড়িয়া শুঁটকিপল্লির বাসিন্দা। তাদের বাড়ি খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও আশাশুনি উপজেলায়। অপহৃত জেলেদের মধ্যে রয়েছেন—হরিদাস বিশ্বাস, গোপাল বিশ্বাস, রমেশ বিশ্বাস, প্রশান্ত বিশ্বাস, শংকর বিশ্বাস, তুষার বিশ্বাস, মনিরুল ইসলাম, উজ্জ্বল বিশ্বাস, কালীদাস বিশ্বাস, কাশেম মোড়ল, সাধন বিশ্বাস, শিবপদ বিশ্বাস, রশিদ সরদার, প্রকাশ বিশ্বাস, ইয়াসিন মোড়ল, শিমুল, রূপকুমার বিশ্বাস, গণেশ বিশ্বাস, উত্তম বিশ্বাস ও বাটু বিশ্বাস।
অপহরণের ঘটনার পর থেকে সুন্দরবন ও সাগরে মাছ ধরা কার্যক্রম প্রায় স্থগিত হয়ে পড়েছে। জীবনের ঝুঁকি এড়াতে অনেক জেলে কেবল দিনের আলোতে সীমিতভাবে নদীতে নামছেন, আবার অনেকেই পুরোপুরি বন্ধ রেখেছেন মাছ ধরা। ফলে শুঁটকি উৎপাদন, মাছ সরবরাহ ও স্থানীয় অর্থনীতি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে।
দুবলার চরের শুঁটকি পল্লির মহাজন মোতাসিম ফরাজী, জাকির শেখ, আব্দুর রউফ মেম্বর ও পঙ্কজ বিশ্বাস বলেন, মৌসুমের শেষ সময়ে এসে এমন অপহরণে তারা বিপর্যস্ত। জেলেরা অলস বসে আছেন, কী নিয়ে বাড়ি ফিরবেন—সেই চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
দুবলার ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সুন্দরবন এখন কার্যত দস্যুদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে মাছ ধরা স্বাভাবিক হবে না। তিনি জানান, জাহাঙ্গীর, সুমন, শরীফ ও করিম বাহিনী নামে চারটি দস্যু গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। মুক্তিপণ আদায় ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে।
দস্যু দমনে ২৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। এতে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে নৌবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ অংশ নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুন্দরবন সম্পূর্ণ দস্যু মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের দুবলা টহল ফাঁড়ির ফরেস্ট রেঞ্জার মিলটন রায় বলেন, মাছ ধরা বন্ধ থাকায় রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শরণখোলা ফরেস্ট স্টেশনের ফরেস্ট রেঞ্জার মো. খলিলুর রহমান জানান, দস্যু আতঙ্কে নতুন করে কেউ মাছ ধরার পাস নিচ্ছেন না। এতে মাসিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নূর আলম শেখ বলেন, শুধু প্রকাশ্য মহড়া নয়, গোপন ছদ্মবেশে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়ে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, যেকোনো মূল্যে সুন্দরবনকে দস্যু মুক্ত করা হবে। জেলে ও বনজীবীদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর। সুন্দরবনকে দস্যু মুক্ত করতে ইতিমধ্যে যৌথ অভিযান শুরু করা হয়েছে।
অপহৃতদের পরিবারের একটাই দাবি—দ্রুত উদ্ধার করে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হোক তাদের প্রিয়জনদের। সুন্দরবনের নদী-খাল আবার কবে নিরাপদ হবে, সেই অপেক্ষায় এখন উপকূলের হাজারো পরিবার।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর