ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে দিন দিন দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। হাসপাতালে প্রবেশ করতেই রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দালালদের উৎপাতের মুখে পড়তে হয়।
বিশেষ করে গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল মানুষদের টার্গেট করে দালালরা। তাঁরা রোগীদের বোঝানোর চেষ্টা করে যে সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় না। এভাবে নানা প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে রোগীদের করানো হয় অপ্রয়োজনীয় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দেওয়া হয় ব্যয়বহুল ওষুধ। ফলে রোগীদের গুনতে হয় অতিরিক্ত হাসপাতাল বিল।
অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে ওষুধের বিল থেকে ১০ থেকে ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা করা হয়। বাস্তবে দেখা যায়, মূল বিলের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি দাম যোগ করে পরে বলা হয়, ছাড় দেওয়া হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ইউনিয়ন এবং গ্রামের ঔষধের দোকান, ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি, অ্যাম্বুলেন্স গাড়ি চালক, হাসপাতাল মালিক কর্মী এই সিন্ডিকেটের অংশ। দালাল সিন্ডিকেটের কার্যক্রমে অসহায় রোগীরা শিকার হচ্ছে অপচিকিৎসায় এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, সদর হাসপাতালে কর্মরত অনেক চিকিৎসক সরকারি অফিস সময়ের বাইরে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন। হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে গেলে অনেক সময় তাঁরা রোগীদের বলেন, "বিকেলে আমি প্রাইভেটে বসি, সেখানে এসে দেখা করবেন।" ডাক্তার এবং দালালদের রেফারেন্সে অনেক রোগীকে ঢাকা এবং দেশের বাইরেও পাঠানো হয়।
অন্যদিকে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির সাথে কিছু চিকিৎসকের চুক্তি থাকার অভিযোগও রয়েছে। এর ফলে তাঁরা প্রেসক্রিপশনে নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধই লিখে দেন। এমনকি রোগীরা ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়ার পর ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা প্রেসক্রিপশন পরীক্ষা করে দেখেন, তাঁদের কোম্পানির ওষুধ লেখা হয়েছে কিনা।
এ বিষয়ে তরী বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সদস্য সোহেল রানা ভূইয়া বলেন, "ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থাটা দালালদের কাছে জিম্মি। পাশাপাশি ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রেসক্রিপশন দেখা ও ছবি তোলার বিষয়টিতে রোগীদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে চরমভাবে। শহরের রিকশা-সিএনজি চালক থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এই চিকিৎসাকেন্দ্রিক দালালি প্রবণতা। বিশেষ করে জেলা সদর হাসপাতালের রোগীরা হাসপাতাল চত্বরেই দালালের খপ্পরে পড়ে অপচিকিৎসার শিকার হয় প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিকে গিয়ে। বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালের নিয়োগকৃত মার্কেটিং টিমের সদস্যের পরিচয়ে সদর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এসে রোগীদের টার্গেট করে প্রলোভন দেখিয়ে এখান থেকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়।"
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী বলেন, "এসপি এবং ডিসি স্যারকে জানিয়েছি হাসপাতালে মহিলা পুলিশ লাগবে কারণ দালাল অধিকাংশ মহিলা। আমরা নিয়মিত দালালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছি, একটি দালাল নির্মূল কমিটি করা হয়েছে আরেকটি কমিটি করা হবে, ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সপ্তাহে শুধু বুধবারে ভিজিট করবে, কোনো রোগীর প্রেসক্রিপশন চেক করতে পারবে না এবং ডাক্তাররা কোনো রোগীকে বলতে পারবে না আমি বিকালে প্রাইভেট হাসপাতালে বসি সেখানে দেখা করেন, এমন প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
উল্লেখ্য, সদর উপজেলায় বর্তমানে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল ও ডেন্টাল ক্লিনিক মিলিয়ে মোট ১৪৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়াও জেলার অন্যান্য উপজেলায় ১০০টিরও বেশি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল ও ডেন্টাল ক্লিনিক আছে।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর