মাত্র এক মাস বয়সী ছোট্ট আল আকসার জীবন শুরু হয়েছে এক কঠিন বাস্তবতার মুখে। মা-বাবার বিরোধের শিকার হয়ে সে আজ বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মোছাম্মদ নিহার খাতুনের সঙ্গে পাংশার আখতারুল ইসলামের বিয়ে হয়েছিল ২০২৪ সালে। শুরুতে তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হলেও, দ্রুতই সেই সুখ ম্লান হয়।
নিহার খাতুনের অভিযোগ, যৌতুকের টাকার জন্য তাকে প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। গর্ভে সন্তান থাকা অবস্থাতেও থামেনি নির্যাতন। অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বামী আখতারুল তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে রাজি হননি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে পাংশার একটি ক্লিনিকে নেওয়া হলেও, সেখান থেকে আর স্বামীর বাড়িতে ফেরা হয়নি। যৌতুকের দাবিতে তাকে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে হয়।
দীর্ঘ নয় মাস পর জন্ম নেয় ছোট্ট আল আকসা। নিহারের দাবি, এই পুরো সময়ে আখতারুল স্ত্রী বা সন্তানের কোনো খোঁজ নেননি। বহুবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে জানা যায়, আখতারুল আরেকটি বিয়ে করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ জানুয়ারি রাজবাড়ী আদালতে যৌতুক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন নিহার খাতুন।
নিহারের আরও দাবি, আখতারুলের আগেও একটি বিয়ে ছিল, যা তিনি বিয়ের সময় জানতেন না। নিহারের ভাই রাজীব জানান, আখতারুল নিহারের সঙ্গে বিয়ের সময় একটি ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে দেখা যায়, তিনি তৃতীয় বিয়ের সময় যে আইডি কার্ড ব্যবহার করেন, সেখানে বয়সের ক্ষেত্রে প্রায় ১৩ বছরের গরমিল রয়েছে। এসব তথ্য গোপন করে এবং ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে আখতারুল তার বোনের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন বলে রাজীব অভিযোগ করেন।
রাজীব আরও জানান, আখতারুল ব্যাংকের মাধ্যমে মোটরসাইকেল কেনার জন্য ২ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা নেন। পরে নিহারের ২.৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার আটকে রেখে আরও টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন এবং ৫ লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করেন। টাকা না দিলে স্ত্রী ও সন্তানকে গ্রহণ করবেন না বলেও হুমকি দেন। এই চাপের পরিপ্রেক্ষিতেই ২৮/০১/২০২৬ তারিখে যৌতুকের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
তবে আখতারুল ইসলামের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি নিহারের সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নিহার তাকে বাবার বাড়িতে গিয়ে থাকতে বলেছিলেন। তিনি রাজি না হওয়ায় নিহার অশান্তি শুরু করেন এবং নিজেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এমনকি তিনি দাবি করেন, নিহারের সন্তানের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং ওই সন্তান তার নয়।
এদিকে জানা যায়, গত অক্টোবর মাসে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার মো. বিশারত শেখের মেয়ে জান্নাতুল খাতুনকে বিয়ে করেছেন আখতারুল। যদিও তিনি এই বিয়ের কথাও অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, নিহারকে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি তিনটি উকিল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু নিহার ফিরে আসেননি। বরং বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় তিনি ছয় লাখ টাকা নিয়ে গেছেন বলেও অভিযোগ করেন আখতারুল এবং এ বিষয়ে তিনি মামলাও করেছেন।
স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবি, আখতারুলের স্ত্রী নিহার চলে যাওয়ার পর তিনি সংসার দেখাশোনার জন্য সত্যিই আরেকটি বিয়ে করেছেন। সংশ্লিষ্ট কাজী জানান, ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী আখতারুল ও জান্নাতুলের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে, তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় রাষ্ট্রীয়ভাবে বিয়েটি নিবন্ধন করা সম্ভব হয়নি।
সব অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মাঝে আজও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে এক মাস বয়সী নিষ্পাপ আল আকসার ভবিষ্যৎ, যে মা-বাবার দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর