কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার উপকূলে ভেসে আসা প্রায় দেড় টন ওজনের একটি মৃত তিমি নিয়ে স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েক দিন আগে সৈকতে ভেসে আসা তিমিটি বালুচরে পুঁতে রাখা হলেও জোয়ারের পানিতে বালু সরে গিয়ে এর কিছু অংশ আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। পচে যাওয়া তিমি থেকে ছড়িয়ে পড়া তীব্র দুর্গন্ধে আশপাশের এলাকায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা ও সৈকতে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা দুর্ভোগে পড়ছেন।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার রাতে উপজেলার দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নের পশ্চিম উপকূলে মৃত তিমিটি ভেসে আসে। খবর ছড়িয়ে পড়লে কৌতূহলী মানুষ তিমিটি দেখতে সৈকতে ভিড় করেন। অনেকেই ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন। পরদিন রোববার রাতে দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে খননযন্ত্র দিয়ে বালুচরে গর্ত খুঁড়ে তিমিটি পুঁতে ফেলা হয়। স্থানীয়দের ধারণা, তিমিটির ওজন অন্তত দেড় টন।
দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আল আজাদ জানান, জোয়ারের তীব্র স্রোতে বালু সরে যাওয়ায় সোমবার সকাল থেকে তিমিটির কিছু অংশ আবার দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বৃহস্পতিবার সকালে আরও বড় অংশ ভেসে ওঠে। এরই মধ্যে পচে যাওয়া তিমি থেকে অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, দ্রুত তিমিটি আবার পুঁতে ফেলার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, উপকূলে এত বড় তিমি ভেসে আসা বিরল ঘটনা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুতুবদিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম বলেন, তিমিটি কী কারণে মারা গেছে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানা প্রয়োজন। কারণ নির্ধারণ করা গেলে সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টিও স্পষ্ট হবে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর বা উপজেলা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাননি। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদোন্নতি পেয়ে অন্যত্র বদলি হয়েছেন এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছুটিতে রয়েছেন। দ্বীপ উপজেলা হওয়ায় এখানে পরিবেশ অধিদপ্তর বা বন বিভাগের স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা নেই। উপকূলীয় বন বিভাগের কয়েকজন কর্মী প্যারাবন সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকলেও মৃত তিমির বিষয়ে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, কুতুবদিয়ার সৈকতে একটি মৃত তিমি ভেসে আসার তথ্য তারা পেয়েছেন। তবে তিমিটির মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তিনি জানান, দুর্গম এলাকা হওয়ায় সেখানে তাদের স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা নেই, তবু বিষয়টি সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
এদিকে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা বলছেন, পচন ধরলে তিমির দেহ থেকে তীব্র দুর্গন্ধের পাশাপাশি জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
কুতুবদিয়া উপজেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বলেন, দ্রুত তিমিটি কেটে টুকরো করে গভীরভাবে পুঁতে ফেলতে না পারলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
উপকূলীয় এলাকাগুলোতে মাঝে মাঝে বড় সামুদ্রিক প্রাণী ভেসে আসার ঘটনা ঘটে। প্রায় দেড় বছর আগে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের দরিয়ানগর ও হিমছড়ি এলাকায় প্রায় তিন মেট্রিক টন ওজনের দুটি মৃত তিমি ভেসে এসেছিল। তখন জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে খননযন্ত্র দিয়ে গভীর গর্ত খুঁড়ে তিমি দুটি পুঁতে ফেলা হয়। তবে কুতুবদিয়ার মতো দ্বীপাঞ্চলে ভারী যন্ত্রপাতি নেওয়া কঠিন হওয়ায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে মৃত তিমিটি ঘিরে একদিকে যেমন দুর্গন্ধ ও জনদুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে সামুদ্রিক প্রাণীটির মৃত্যুর কারণও অজানাই থেকে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করে তিমিটির মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং যথাযথভাবে দাফনের ব্যবস্থা করা হোক।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর