অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অধিকাংশ যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২ এপ্রিল সংসদে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশেষ কমিটি। তবে গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশটির ব্যবহার ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়ায় সেটি বিল আকারে সংসদে না তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।
অন্যদিকে, সংসদে উত্থাপনের জন্য নির্ধারিত অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় সংক্রান্ত কয়েকটিতে সংশোধনী আনার সুপারিশ করেছে সরকারি দল। এসব সংশোধনের বিরোধিতা করেছেন কমিটিতে থাকা জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা। এ ধরনের ১৫টি অধ্যাদেশের বিষয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (আপত্তি) জমা দিয়েছেন।
রোববার (২৯ মার্চ) রাতে জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়। রাতে সাড়ে ৮টায় শুরু হয়ে বৈঠকটি চলে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী। তৃতীয় দিনের বৈঠকে শেষে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে যাচাই-বাছাই শেষ করে কমিটি। ২ এপ্রিল কমিটি সংসদে প্রতিবেদন পেশ করবে।
সংবিধানে গণভোটের বিধান রাখা না রাখা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা প্রসঙ্গে বিশেষ কমিটির সদস্য ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘গণভোটের সাথে গোটা জাতি জড়িত। ওনারা এটি বাতিল করার কথা বলছেন, যা আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। যদি গণভোট সংবিধানবহির্ভূত হয়, তবে একই দিনে হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন কীভাবে বৈধ হয়? জনগণ “হ্যাঁ” জয়যুক্ত করেছে, সুতরাং গণভোটের রায় কার্যকর করতে হবে—এটাই আমাদের মূল দাবি।’
গণভোটের অধ্যাদেশ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে। যেই কারণে এটি প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেই প্রয়োগ শেষ হয়ে গেছে এবং এর আওতায় ভবিষ্যতে আর কোনো গণভোট অনুষ্ঠিত হবে না। তাই এটিকে বিল আকারে এনে আইন হিসেবে প্রণয়ন করার কোনো প্রয়োজন নেই এবং এর রেটিফিকেশনও দরকার নেই।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। এতে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানসহ আরও অনেকে। এছাড়া মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান, মো. রফিকুল ইসলাম খান এবং জি এম নজরুল ইসলাম বৈঠকে অংশ নেন। বিশেষ কমিটির আমন্ত্রণে মোহাম্মদ নাজিবুর রহমানও এতে যোগ দেন।
১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, কিছু মৌলিক বিষয়ে তাদের সঙ্গে শুরু থেকেই মতভেদ ছিল, যা এখনো দূর হয়নি। তার অভিযোগ, সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ কারণে প্রায় ১৪-১৫টি বিষয়ে বিরোধী দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন ও গুম-খুন প্রতিরোধ কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের মতো দলীয় প্রভাবের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীন সচিবালয় এবং বিচারপতি নিয়োগের বাছাই কমিটি—যেগুলো সংস্কারের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছিল—সেগুলো বাতিল করে আগের অবস্থায় ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীনতা খর্বের চেষ্টার বিরুদ্ধেও তারা তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন।
কমিটির বৈঠকে যেসব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব হয়নি, সেগুলো চূড়ান্ত আলোচনার জন্য পুনরায় সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করা হবে বলে জানান রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১০-১৫টি বিষয়ে আমরা কিছু সংশোধনীসহ একমত হয়েছি। বাকি যেগুলোতে জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে, সেগুলোতে আমরা ছাড় দেব না। সংসদে এসব নিয়ে ভোটাভুটি বা বিস্তারিত আলোচনা হবে।’
এ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘১৩৩টি অধ্যাদেশের প্রতিটির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেকগুলো যেভাবে আছে, সেভাবে পাস করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিছু কিছু সংশোধিত আকারে বিল আনা হবে। আর কিছু হয়তো বিল আনার সময় পাওয়া যাবে না। সেগুলো নিয়ে চিন্তা হলো, পরবর্তী অধিবেশনে যেগুলো পাস করতে চাইবে, বিল আকারে আনব।’
তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় ও সরকারি দলের সদস্যরা কিছু কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। সেগুলো যথাযথভাবে রিপোর্টে প্রতিফলিত হবে। বিল আকারে যখন উত্থাপিত হবে, তখন আইন প্রণয়নের সময় যার যার বক্তব্য দিতে পারবেন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর